আমরা সবাই আজও এক পাড়াতেই থাকি…

‘চলে যেতে যেতে’ আসলে স্মৃতি নির্ভর রচনা। একটা শহরের ভাঙ্গা ভাঙ্গা গল্প। সেই একটি শহর যেখানে আমার জন্ম, বেড়ে ওঠা। শহর ঢাকার প্রেমে পড়ে আছি একটা জীবন। পেছন ফিরে তাকালে দেখি কতকিছু যে হারিয়ে গেছে জীবন থেকে, স্মৃতি থেকেও। ছোট চায়ের দোকান, বইপাড়া, আড্ডা, অদ্ভূত সব মানুষ, রাস্তা, গলি। মনে হয় সবকিছুর এবার পাট উঠলো বোধ হয়। যাবার সময় হলো আমারও। তাই চলে যেতে যেতে লিখে রাখি সেই হারানো গল্পের খানিকটা। এখন থেকে প্রাণের বাংলায় ধারাবাহিক ছাপা হবে এই ঢাকা শহরের নানা গল্প। আর সেসব গল্পের আড়ালে একজন মানুষের বেড়ে ওঠার কাহিনি।

ছাদের তারে শুকাতে দেয়া নানা রঙে ঝলমল কাপড়ের মতো একটা পাড়া।তাতে কত রকমারী মানুষের বাস। গোটা কয়েক দোতলা, তিনতলা বাড়ি, বাকীসব গুটিসুটি একতলা, ছুটির দিনের সকালে গলি বেয়ে ডেকে যায় পুরনো কাগজওয়ালা। আমাদের পাড়ায় শীত আসে, আসে বসন্ত। আমরা বেড়ে উঠি মাথায় মাথায় টোকা দিয়ে। সেই ১৯৭১ সালের কথা। তখনও সে পাড়ায় বসবাস। এলাকার নাম সিদ্ধেশ্বরী, এই শহর ঢাকার প্রায় কেন্দ্রে মধ্যবিত্ত পাড়া। আমি যে সময়ের কথা লিখতে চাচ্ছি তখন সেরকমই ছিল গোটা এলাকাটা। খুব নির্জন ছিল সে পাড়ার আশপাশ। এলাকার ভূগোলটা ছিল এরকম-একদিকে শান্তিনগর, চামেলীবাগ, অন্যপাশে বেইলি রোড। মাঝখানে সবুজ গাছপালায় ঘেরা সিদ্ধেশ্বরী। ঢুকতেই গলির মুখে একটা ব্যাংক, উল্টোদিকে হক কনফেকশনারী, বেইলি রোডের শান্ত রাস্তার ধার ছুঁয়ে লাকি ব্রেড, মহিলা সমিতি মঞ্চ। কী এক আন্তরিকতার হাওয়া ভেসে বেড়াতো তখন আমাদের বাড়িগুলোকে ঘিরে। কাছে থাকা মানুষের গন্ধ টের পেতাম নিঃশ্বাস টানলেই। এখন কখনো গেলে দেখি নির্মমভাবে বদলে গেছে সিদ্ধেশ্বরী- আমার শৈশব, কৈশোরের আশ্রয়।

আমরা যে বাড়িতে ভাড়া থাকতাম সেটা ছিল দোতলা। ওপরের তলায় বাম পাশে সাজ্জাদ ভাইদের বাসা। পাশেই অর্ধেন্দেুশেখর রায়ের পরিবার। ছোট্ট্ সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেলে ডান দিকে শান্তি ভাইদের বসবাস।
তখন আমাদের এই চারটা বাড়ির (তখনও কেউ ফ্ল্যাট বলতাম না) দরজা রাতের আগে কখনো বন্ধ হতো না। আমরা যে কজন বালক, বালিকা আর যুবক সেখানে থাকতাম তাদের জন্য সব বাসার দরজা ছিল অবারিত। কখন কে-কার বাড়িতে ঢুকে পড়ছি তার খেয়াল থাকতো না। তারপর চলতো খাওয়া আর আড্ডা। বাসার সামনের গলিটাকে মনে হতো রাজপথ আর বাড়িগুলোকে রাজপ্রাসাদ। ভালো লাগা তো সব ভালো অনুভূতিগুলোকে একজায়গায় করতে পারে।

সিদ্ধেশ্বরীর কথা লিখতে বসে প্রায় হাবুডুবু খাবার যোগাড়। কোথা থেকে শুরু করবো ভাবতে ভাবতে একবেলা পার হয়ে যাচ্ছে। লিখছি আর ভাবছি। ফিরে যাচ্ছি সেই অদ্ভূত সময়ে ভেতরে। ওই পাড়ায় আমাদের অনেক আত্নীয়রাও থাকতেন। বিকেলে সামনের ছোট্ট্ গলিটা হয়ে উঠতো আমাদের খেলার মাঠ।কখনো ক্রিকেট, কখনো ফুটবল। বয়সে বড়রাও সেই খেলায় অংশ নিত আমাদের সঙ্গে। আমরা খেলছি ক্রিকেট, হয়তো তখন অফিস অথবা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাচ্ছে কোন ভাই। ঘর থেকে বের হয়ে এক ওভার বল করে চলে গেলেন। আমাদের বন্ধুদের সম্মিলিত গলার চীৎকার এখনো কানে ভেসে আসে।
আমাদের পরিবারগুলোর সম্পর্ক ছিল খুব অদ্ভূত। ওপরতলায় সাজ্জাদ ভাইদের মায়ের কথা দিয়েই শুরু করি। উনার নাম জানা হয়ি নি কোনদিন। আমরা সবাই ডাকতাম খালাম্মা বলে।হাসিখুসি মানুষ বসে থাকতেন  দোতলার বারান্দায় ।কোনদিন সন্ধ্যার পর বাড়ি ফিরলে অথবা একটু রাতে কোথাও বের হলে ওপর থেকে ডেকে জানতে চাইতেন দেরি করে ফেরার কারণ। বাড়িতে বাবা-মা‘র বাইরে এই শাসনগুলো তখনও এই শহর থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় নি। পরীক্ষার আগে রাস্তায় দাঁড়িয়ে বন্ধুদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে আড্ডা দিতে দেখলে আরেক বন্ধু, বড় ভাই মঈন ভাইয়ের মা রীতিমত ধমক দিতেন। উনি ছিলেন সিদ্ধেশ্বরী গার্লস স্কুলের প্রধান শিক্ষক। খালাম্মার ভয়ে আমরা তটস্থ থাকতাম।
পাশের বাড়ির মানুষগুলোর কথাও আমাকে বলে যেতে হবে। রায় পরিবারের সব থেকে ছোট ছেলে তাপস ছিল আমার খেলার সঙ্গী। আশিষ আর মনিশ ভাই ছিল বয়সে বড়ো। কিন্তু আমাদের খেলা আর আড্ডায় তারা ছিল বন্ধু। জীবনে কখনো মনে হয় নি তারা আমাদের আপন ভাই নয়। যেমন কখনো মনে হয় নি সাজ্জাদ ভাই অথবা তার বোন বেবি আপা আমার কেউ হয় না, আমরা প্রতিবেশী।আসলে তখন এভাবে ভাবতেই শিখি নি আমরা। এখন অবাক হয়ে ভাবি পাশের ফ্ল্যাটে বাস করা সবগুলো মানুষের নামও ভালো করে জানা হয় নি আমার। আমরা কিছু প্রাণী এখন একটি বিশাল বাড়ির ফ্ল্যাট নামের কুঠুরিতে দিনের পর দিন কাটাই।
ছুটির দিনগুলো সিদ্ধেশ্বরীকে মনে হতো স্বর্গ। সকাল থেকে সামনের বাসার বারান্দায় চাদর পেতে আমাদের কয়েক বন্ধুর বাবারা বসতেন তাস নিয়ে। এখনো মনে পড়ে ব্যাট অথবা বল হাতে আমরা রওনা হতাম বয়েজ স্কুলের মাঠের দিকে। সেই খেলার আসর থেকে শাসনের গলায় কেউ বলে উঠতেন ‘তাড়াতাড়ি ফিরিস’।ছুটির দিনে এক বাড়ির রান্না অন্য বাড়িতে চলে যাওয়াটা ছিল রেওয়াজের মতো। অনেক সময় কোন বাড়ির রান্নার গন্ধ ভালো লাগলে ঢুকে খেয়েও নিতাম।
প্রথম ধূমপান করতে শিখি ওই পাড়াতেই। সেটা আবার বড় ভাইদের হাত ধরে শেখা। সিদ্ধেশ্বরীতে একটা বিশাল কালী মন্দির আছে। এখন সে মন্দির ভীষণ জমজমাট হলেও আমার শৈশবে ছিল ভীষণ নীরব জায়গা।মন্দিরের গা ঘেঁষে ছিল পরেশ দাদার দোকান। দোকানের ভেতরে ঢুকে চলতো আমাদের অবৈধ ধূম উদগীরণ।
ওই পাড়ায় প্রথম প্রেমে পড়েছিলাম, প্রথম মারামারি করেছিলাম, প্রথম মাসুদ রানা পড়েছিলাম, প্রথম জুয়া খেলেছিলাম। তখন কাজগুলোকে কী ভীষণ অপরাধমূলক মনে হতো। অথচ এখন চারপাশের কান্ডকারখানা দেখে সেসব কাজগুলোকে হাস্যকর বলে মনে হয়, শিশুতোষ মনে হয়।আজও মনে আছে দুপুরবেলা পাড়ার সবুজ লাইব্রেরীতে ঘন্টা প্রতি আট আনা দিয়ে মাসুদ রানা পড়তাম। পড়ার জায়গা ছিল দোকানের বিশাল বইয়ের আলমারির পেছনে। তখন তো বই কেনার টাকা হাতে থাকতো না।
বৃষ্টির দিনে পাড়ার রাস্তা পানিতে ভাসতো, ভাসতো খেলার মাঠ। সেখানে খেলতে গিয়ে কাদায় মাখামাখি হয়ে বয়েজ স্কুলের কলে সব বন্ধুরা মিলে গোসল করে বাড়ি ফিরতাম। আতিক, কোক, জাবেদ, প্রিন্স, রয়েল, অমর, তাপস, রুমী আরও কত মুখ।আজো স্মৃতির পাতা উল্টে গেলে সেইসব মুখ সারিবদ্ধ হয়ে এসে দাঁড়ায় সমুখে। আমি অবাক হয়ে বিস্মৃতির পর্দা সরিয়ে তাকিয়ে থাকি অপলক।
একটা পাড়া, তার মধ্যে অনেক বাড়ি। কিন্তু তখন মনে হতো সবই যেন একটাই বাড়ি, একটাই আশ্রয়। ভালোবাসা আর ভালোলাগা মানুষের সম্পর্ককে অন্য কোন নাম দিতে পারতো একটা সময়ে। সেই সম্পর্কের মাঝে বেড়ে ওঠা আমার। এই আত্নীয়দের ছেড়ে আজ খুব অবলীলায় বেঁচে আছি। বেঁচে থাকতে হয় আমাদের। তবু গভীর দীর্ঘশ্বাস যেন সেই সিদ্ধেশ্বরী লেনের বাঁক ছুঁয়ে কোথায় নিয়ে যায় আমাকে। এখন মানুষের বিচ্ছিন্নতা আর লন্ডভন্ড দেখে ভাবি, আমি তো সৌভাগ্যবান, মনে করার মতো কত মানুষ আর আশ্রয় রয়ে গেল মনের মধ্যে। (চলবে)

ইরাজ আহমেদ 

পড়ুন
সাকুরা, বলছি তোমাকে…
ম্যারিয়েটা ম্যারিয়েটা