আমাকে মনে পড়ে?

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

মেয়েটির নাম হেনরিয়েটা ফ্লোরেন্স কেলি। ইংল্যান্ডের ব্রিস্টলে জন্ম।তার যখন পনেরো বছর বয়স তখন তার মা তাকে শিল্পী বানানোর জন্য নিয়ে এসেছিলেন লন্ডন শহরে।সেই কিশোরীর জন্য মায়ের কাজ যোগাড় করতে সমস্যা হয়নি। তখন ফ্রেড কার্নো নামে এক বিখ্যাত নাটকের দলে কেলি ভর্তি হয়ে যায়। আর সেখানেই এক তরুণের সঙ্গে কেলির প্রথম দৃষ্টি বিনিময়। উইংসের পাশে দাঁড়িয়ে একদিন কেলিকে অবাক বিষ্ময়ের সঙ্গে দেখেছিলেন তরুণটি। যার তখনও চালচুলোর কোনো ঠিক নেই।এই যুবকটি ১৯১০ থেকে ১৯১৩ সাল পর্যন্ত ছিলেন ফ্রেড কার্নো দলের একজন সদস্য। ভাগ্যের অন্বেষণ তাকে নিয়ে এসেছিলো সেই দলে। সেখানেই অভিনয় করে তিনি এতটাই নজর কেড়েছিলেন যে কিস্টোন নামে এক ফিল্ম কোম্পানীর মালিক তার ব্যাপারে উৎসাহী হয়ে ওঠেন। ম্যানেজারকে টেলিগ্রাম করে ছেলেটিকে নিয়ে আসার কথা বলেন। সেটাই ছিলো তার চলচ্চিত্র জীবনের সূচনাপর্ব। যদিও তাঁর আকাশচুম্বি সাফল্য লাভের তখনও কয়েক বছর বাকী আছে। সেই তরুণটিই ছিলেন চার্লস চ্যাপলিন, যিনি বলতে পারতেন অনায়াশে, ‘আমি অপমানকে জেনেছি। আর অপমান এমন এক জিনিস যা ভোলা যায় না।’

তিন বছরের মধ্যে একটির পর একটি কোম্পানী বদল করে চ্যাপলিন তৈরি করলেন ইতিহাস। হয়ে উঠলেন ‘আইকন’। কিন্তু কেলি? সেই কিশোরী যে চার্লি চ্যাপলিনের সব মনযোগ কেড়ে নিয়েছিলো। উইংসের পাশে দাঁড়িয়ে যাকে দেখে চ্যাপলিনের মনে হয়েছিলো, ‘পানপাতার আকৃতির মতো মুখের মেয়েটির ধারালো হাসি আছে। আর আছে অপূর্ব সুন্দর দন্তরাজি।’

আজ প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজনে কিংবদন্তী অভিনেতা চার্লি চ্যাপলিনের প্রেম নিয়ে রইলো ‘আমাকে মনে পড়ে?’

হেনরিয়েটা ফ্লোরেন্স কেলি

চার্লস চ্যাপলিনের জীবন নিয়ে গবেষণা করেছেন বিশিষ্ট সাংবাদিক ও লেখক ডেভিড রবিনসন। তার লেখা বই ‘চ্যাপলিন-হিজ লাইফ অ্যান্ড আর্ট। সেখানে চ্যাপলিনের প্রণয়োপাখ্যানের বিশদ বিবরণ আছে। তিনি লিখেছেন, ‘অন্য কারো ক্ষেত্রে এটা হতে পারতো যৌবনের মোহ, এক সপ্তাহের মধ্যে ভুলে যাওয়া তাৎক্ষণিক হৃদয়ভঙ্গ। কিন্তু চ্যাপলিন তো ঠিক অন্য কারো মতো নন। তাঁর অনুভুতির মধ্যে বিশেষ একটা কিছু ছিলো যার শিকড় ছিলো ছেলেবেলাকার বঞ্চনার মাঝে প্রোথিত, ফলে ঘটনাটি তার মনে গভীরভাবে রেখাপাত করে।’ হেনরিয়েটা কেলিকে ভুলতে পারেননি চ্যাপলিন।

চ্যাপলিন যখন উইংসের আড়াল থেকে কেলিকে দেখেছিলেন কেলি তাকে লক্ষ্যই করেননি। কিন্তু সেদিন একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছিলো। মঞ্চ থেকে নেমে আসার পর কেলি হঠাৎ চ্যাপলিনকে অনুরোধ করেছিলেন একটা আয়না তার সামনে ধরতে। চ্যাপলিন তাই করেছিলেন। হেটি হয়তো নিজের সাজ দেখেছিলেন। কিন্তু চ্যাপলিন বিমুগ্ধ দৃষ্টিতে দেখছিলেন হেটিকেই।সেটা ছিলো এক মঙ্গলবার রাত। পরের দিন চ্যাপলিন হেটিকে বলেছিলেন পরের রোববার তার সঙ্গে দেখা করতে। রাজি হয়েছিলেন হেটি।ডেভিড রবিনসন তার বইতে লিখেছেন, সেই দেখা হওয়ার দিনটির জন্য চ্যাপলিন ব্যাংক থেকে তিন পাউন্ড তুলেছিলেন। কিন্তু রোববার সন্ধ্যায় সে টাকা আর খরচ হয়নি। কারণ হেটি বাড়ি থেকে খেয়ে এসেছিলেন। আর চ্যাপলিনের আর খেতে ইচ্ছে করেনি। দু’জন সেদিন শুধু হেঁটে গিয়েছিলেন হেটির বাড়ি  ক্যাম্বারওয়েল পর্যন্ত। সেই স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে চ্যাপলিনের মনে হয়েছিলো তিনি স্বর্গের মধ্যে হাঁটছেন।

এরপর দু’জনের অল্প সময়ের জন্য আবারও দেখা হয়। চ্যাপলিন হেটিকে শো শেষ হলে নিতে আসতেন। কিন্তু কোথায় যেন বোঝাপড়ার অভাব হলো। পরের রোববার তাদের পার্কে দেখা হলে চ্যাপলিন হেটির হাত ধরতে চাইলেন। কিন্তু খানিকটা নার্ভাস এবং শীতল হেটি চ্যাপলিনকে হাত ধরতে দিলেন না। জানিয়ে দিলেন, তার বয়স খুব কম। চ্যাপলিন একটু বেশি বেশি আশা করছেন তার কাছে। গবেষকের মত অনুযায়ী ভালোবাসার কথা শুনে ঘাবড়ে গিয়েছিলো হেটি।

সে রাতে অস্থির সময় পার করেন চ্যাপলিন। সকালে উঠে সোজা চলে যান ক্যাম্বারওয়েল রোডে। কিন্তু সেখানে গিয়ে চ্যাপলিনের সঙ্গে দেখা হয় হেটির মায়ের। মা চ্যাপলিনকে জানান, আগের দিন মেয়ে তার কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ফিরেছে।কথাটা শুনে উতলা চ্যাপলিন দেখা করতে চাইলেন হেটির সঙ্গে। বেশ অনেকটা অনিচ্ছা নিয়েই চ্যাপলিনকে বাড়িতে নিয়ে যান হেটির মা। কিন্তু হেটিও সেদিন ভালো ব্যবহার করেননি চ্যাপলিনের সঙ্গে। ভাঙা মন নিয়ে নিজের ঠিকানায় ফেরেন চ্যাপলিন। তারপর? সেই প্রেমকাহিনিটির অপমৃত্যু। দেখা হওয়া থেকে শেষ বিদায় মাত্র এগারো দিনের গল্প। হেটির মা-ই সম্ভবত চাননি তার সুন্দরী কন্যা জীবন একজন চালচুলোহীন ভাঁড়ের সঙ্গে জুড়ে গিয়ে নষ্ট হোক। হেটিরও সায় ছিলো তাতে। চ্যাপলিন কিন্তু ভোলেননি। নিজের জীবন ও শিল্পে তিনি হেটির জন্য সেই ভালোবাসাটুকু প্রকাশিত করার চেষ্টা করে গেছেন।

এগারো দিনের প্রেম ভেঙে গেলো। বহুদিন ধরে যোগাযোগহীন কাটান চ্যাপলিন। কিন্তু অদ্ভুত ভাবে দশ বছর পর অর্থাৎ ১৯১৮ সালের জুলাই মাসে আবার পর্দা উঠলো সেই প্রেমের গল্পের। তখন চ্যাপলিন ‘শোল্ডার আর্মস’ নামে একটি ছবির কাজ নিয়ে ব্যস্ত। হঠাৎ আমেরিকা থেকে তাঁর ডেস্কে একটা চিঠি উড়ে এলো। চ্যাপলিন অবাক হয়ে দেখলেন চিঠিতে হেটির নাম লেখা। চিঠির প্রথম লাইনে লেখা ছিলো, ‘আমাকে মনে পড়ে? আমি সেই কিশোরী মেয়েটি…’

হেটির সেই চিঠি কিন্তু চ্যাপলিন হারিয়ে ফেলেন। কিন্তু হারায় না ঠিকানা লেখা সেই খামটি। চিঠি না-পাওয়া গেলেও কয়েকদিন পর চ্যাপলিন উত্তর লেখেন, ‘প্রিয় হেটি, অপ্রত্যাশিত সব ঘটনা ঘটে যায় যেমন ছবিতে, তেমন জীবনেও। আজ সকালে তোমার চিঠি পেয়ে কী আনন্দ হলো তা তুমি কল্পনাই করতে পারবে না। প্রথম যখন খামটা দেখলাম বুকের মধ্যে কেমন করে উঠলো…তাড়াতাড়ি খামটা খুলে ফেললাম-আরে, এ তো তোমারই চিঠি। অন্য কেউ নয়, এত দিন পরে এ তো তুমি, অন্য কেউ নয়! আমি আনন্দে কাঁপছিলাম। কখনো আমার মনে হয়েছে যে তুমি আমায় যদি কিছু লেখো, কারণ আমার জীবনে কতকিছু ঘটে গিয়েছে। আর তা ছাড়া পুরনো বন্ধুর চিঠির মতো চমৎকার আর কী হতে পারে!

তুমি জানতে চেয়েছো আমি কেমন আছি? বলতে পারো শারীরিকভাবে ঠিকই আছি। আর মানিসিক ভাবে একজন উনত্রিশ বছর বয়সি লোকের যেমন থাকার কথা তেমনই আছি। এখনো বিয়ে করিনি, সেটা অবশ্য তোমার দোষ নয়।…

মনে আছে হেটি, তোমায় একদিন বলেছিলাম টাকা আর সাফল্যই শেষ কথা নয়? সেই সময়ে ও-দুটোর কোনটারই অভিজ্ঞতা ছিলো না আমার। আজ জানি, সুখের অন্বেষণ শুধু নিজের উপলব্ধির মাঝেই সম্ভব।

চিঠির শেষে এসে চ্যাপলিন উল্লেখ করেছিলেন হেটির শরীর খারাপের কথা। লিখেছিলেন এভাবে, তুমি নিজের দিকে একটু নজর দিও…আমি দিন গুনবো তোমার চিঠির। চিঠি লিখো, ভালো আছ কি না জানিও। জানিও মুখের হাসিটির কথা। তোমার চার্লি।’

তারপর কেটে গেল অনেকটা সময়। হেটির কাছ থেকে আর কোনো উত্তর আসেনি।

চ্যাপলিন ১৯২১ সালে লন্ডনে ফিরে আসেন। তখনই শুনতে পান হেটি পৃথিবীকে চিরবিদায় বলেছেন ৪ নভেম্বর ১৯১৮।

চ্যাপলিন আরেকবার গিয়েছিলেন সেই পার্কটিতে। সেখানেই দেখা করেছিলেন তারা দুজনে। ডায়েরিতে লিখলেন, ‘তোমার মনে আছে আমি একটা আঁটোসাঁটো ফ্রক কোট পড়েছিলাম, সঙ্গে টুপি আর ছড়ি। বেশ বোকা ছিলাম। চারটা পর্যন্ত চলে যাওয়া সব গাড়ির দিকে তাকিয়ে ভাবছিলাম, এই বুঝি হেটি হাসিমুখে আমার দিকে এগিয়ে আসবে গাড়ি থেকে নেমে। সেই রাস্তা হাতছানি দিয়ে ডাকে। ডাকে আরেকবার হাঁটার জন্য, আর আমি শুনতে পাই সেই গাড়ির আওয়াজ। আমি উৎসুকভাবে ঘুরে দাঁড়াই, যেন এখনই তন্বী হেটি নেমে আসবে হাসতে হাসতে।

গাড়ি একটা এসে থামে। দুটি লোক নেমে যায়। কিন্তু না, হেটি নেই। হেটি চলে গিয়েছে। আর সেই সঙ্গে হারিয়ে গেছে ফ্রক-কোট পড়া ছড়ি হাতে কিশোর।’

ইরাজ আহমেদ
তথ্যসূত্রঃ ঘুমের দরজা খুলে-চিন্ময় গুহ, চ্যাপলিনের জীবন।
ছবিঃ গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]