আমাদের ঈদের জামা…

‘স্মৃতির পাখিরা’ এক ধরণের স্মৃতিগদ্য। যেন ফেলে আসা জীবনের সুখদুঃখময় বসবার ঘর। কত চরিত্র এসে বসে সেখানে, কত চরিত্র বিদায় নেয়। মাঝখানে জেগে থাকে হারিয়ে ফেলা শহরের ঘ্রাণ হয়তো। কাকলি আহমেদ সেই বসবারঘরের গল্প বলতে চেয়েছেন প্রাণের বাংলার পাতায় তার ‘স্মৃতির পাখিরা’ কলামে।

কাকলী আহমেদ

জীবনের উঠানটা অনেকটাই বড়, খোলামেলা। সে উঠান থাকে রোদ ঝলমলে,আবার ছায়া ছায়া। কত মানুষ সে উঠানে হেঁটে বেড়ায়। আজ এত বছর পর মনে করতে গেলে, কত স্মৃতিই আমাদের মন ভিজিয়ে দেয়। কখনো সেই সব মানুষের কথা মনে হলে চিত্ত দুলে উঠে। মনের মেঘলা আকাশ মুহুর্তেই ঝকঝকে হয়ে ওঠে।
এ বাড়িতে এক ঈদের কথা মনে আছে। সে যুগেও ঘুরে ঘুরে ফ্যাশন আসতো। নিত্য নতুন ডিজাইন আসতো। যেমন যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে বেল বটম প্যান্টের কথা নিশ্চয়ই এখনো অনেক সিনেমাতেই দেখা যায়। সে সময়ে এক ধরণের সালোয়ার কামিজ বাজারে এসেছে।সালোয়ার কামিজ একই রকম ছাপা। ওড়নাটি জর্জেটের। ঠিক কামিজ আর সালোয়ারের ছাপাটাই হুবহু ওড়নাতে। সব কালেই ফ্যাশানের দোলা থাকে। ঈদে আমরা দুই বোন মনে মনে স্বপ্ন দেখছি এই সালোয়ার কামিজ ওড়না কিনবো।ঠিক এই কাপড়টিকে ঘিরেই আমাদের ঈদের জামার স্বপ্ন ঘুরে ফিরে বেড়াচ্ছে। স্কুলে গেলে প্রথম রোজা থেকেই কে রোজা রেখেছে। ঈদে কে কি জামা নেবে তাই ছিলো তখনকার সময়ে আলাপের বিষয়। আমাদের স্কুলের মেয়েরা পাঁচ ছয়জন ইতোমধ্যেই এই এক রঙের ছাপার সালোয়ার কামিজ ওড়না পড়েও ফেলেছে। মূলতঃ ঈদের সময়েই নতুন ফ্যাশনটি অনুপ্রবেশ করতো। ঈদের জামা তখন ছিল এক স্বপ্ন। ঈদ মানে অন্যরকম এক আনন্দ। ঈদে কে কেমন জামা নেবে তা নিয়ে চলতো মনে মনে এক প্রতিযোগিতা। আমার মা আমাদের সংসারের শত কষ্ট ঠেলেও খুব সুন্দর জামা কিনে দিতেন ঈদে। জামা কেনার ব্যাপারে আম্মার ছিল এক নিয়ম জামাটি হতে হবে সুতি এবং ঢিলেঢালা। সে বছর কি এক কারণে অর্থের সংস্থান হচ্ছে না। আমরা জামা পাবো কি পাবো না তাই নিয়ে ভীষণ মনের কষ্টে আছি। দর্জি ছিলো তখন অনেক কম। এত এত মার্কেট তখন ঢাকায় ছিল না। ঈদের কাপড় কিনতে মানুষ যেতো নিউমার্কেটে। দর্জিও সেখানেই। ঈদের জামা বানাতো হতো নাম করা দর্জির দোকানে। দশ কি বারো রোজার পর জামার অর্ডার নেয়াই বন্ধ করে দিতো। মুনিয়া তখন ছোট। ফ্রক পরে। তার জন্যে আম্মাই গজ কাপড় কিনে ফ্রক তৈরি করে দিতো। আমাদের দুই বোনের মন খুব খারাপ। সেবার ঈদে জামা নিতে পারবো কি না দেখা দিয়েছে দারুণ শংকা।স্কুলে গিয়ে অন্যান্যদের জামার গল্প শুনছি। কিন্তু নিজের জামা সম্পর্কে কিছুই বলতে পারছি না। অবশেষে বোনাস পাবার পর আমাদের জন্যে কেনা হলো সালোয়ার কামিজ। আব্বু সেবার আমাদের জামা কিনতে নিয়ে গিয়েছিলেন নিউমার্কেটে। কত দোকান ঘুরে জামা কেনা হলো। দর্জির দোকানে সালোয়ার আর কামিজ দিয়ে এলাম। ওড়না এলো আমাদের সঙ্গে। সকাল দুপুর বিকেল সেই ওড়না বের করে দেখি আর গন্ধ শুঁকি। জামাটা ঘিরে যেনো এক রঙিন স্বপ্ন তৈরি হতো। দর্জির বাড়ি থেকে আসার পর আমি সেই জামাটা বের করে কতবার যে দেখতাম। ঘিয়ে রঙের উপর হলুদ সবুজ আর কালো কেমন ছিটানো ছিটানো প্রিন্ট। আলোরটা ছিলো অন্য রকম। যার জামা তাকে পছন্দ করতে দেয়া হয়েছিলো সেবার। ঈদে এই স্বাধীনতাটাও মনে হয় জামার উপর এক ধরণের অতিরিক্ত অধিকার স্থাপন করতো। আমাদের জামা হলো কিন্তু আম্মার জন্যে কিছুই কেনা হচ্ছে না। ঈদের এক কি দুই দিন আগে আব্বু হাতে করে একটা প্যাকেট নিয়ে এলো। আমার বাবা যে কোন ছোট জিনিষও কেনাকাটা করলে খুব সোরগোল করে দেখাতে পছন্দ করতেন। সবাইকে ডেকে শাড়িটা খুলে ধরলেন। অদ্ভুত সুন্দর একটা সুতির শাড়ি। পুরো শাড়িটা অর্ধেক হাল্কা হলুদ থেকে চাপা ফুলের রঙ বাকি অর্ধেক খয়েরী। অনেকটা বাটিকের মত। এখনো চোখ বন্ধ করলে দেখতে পাই আমরা সবাই ঈদের কাপড় পরে আছি। আমার সেই জামার গন্ধটা যেনো এখনো পাই। নাকে ভেসে আসে পোলাওয়ের গন্ধ। আম্মাকে শাড়িটায় এত মানিয়েছিল। চোখ বন্ধ করলেই দেখতে পাই আম্মা রান্না ঘরে কড়াইয়ে অনেক দুধ জ্বাল দিয়ে ঈদের সেমাই রাঁধছে। আমরা সবাই নতুন সেই জামাগুলো পরে আম্মা আব্বুকে ঈদের সালাম করছি। সারা পাড়ায় আমাদের বয়সী সব ছেলেমেয়েরা প্রতি ঘরে ঢুকে ঢুকে ঈদের আনন্দে বিভোর হচ্ছি। চলবে…………..।

ছবি: ওবায়দুল ফাত্তাহ তানভীর