আমাদের চেতনায় মুক্তিযুদ্ধ

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আন্জুমান রোজী

(টরন্টো থেকে): মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যারা বলেন, “এটি একটি পুরনো বিষয়! একে নিয়ে এতো কথা বলার বা গবেষণার কী আছে? এখন শুধু কাজ করে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। শুধু মুক্তিযুদ্ধ মুক্তিযুদ্ধ করলে পেটে ভাত আসবে না!” এমন মানসিকতার মানুষের প্রতি করুণা নয়; শুধু ঘৃণা হয় আমার। মুক্তিযুদ্ধকে ভুলে যাওয়া বা এড়িয়ে যাওয়া কিংবা অস্বীকার করা; অর্থাৎ যা কিনা  নিজ অস্তিত্বকে অস্বীকার করার সমতুল্য। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারক বাহক হয়েই দেশের একজন সুনাগরিক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি হয়ে দেশকে উন্নয়নের শিখরে নিয়ে যাওয়া- দেশের প্রতিটি নাগরিকের কর্তব্য। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যত চর্চা হবে; ততোই আমার নিজ অস্তিত্বের শেকড় পোক্ত হবে। একজন বাঙালি হিসেবে আমার নিজেকে জানা; মানে মুক্তিযুদ্ধকে জানা। মুক্তিযুদ্ধকে জানা; মানে আমার দেশকে জানা। আর আমার দেশ মানেই স্বাধীন বাংলাদেশকে জানা। প্যালেস্টিনিয়নদের হয়ে এক কবি বলেছিলেন, ‘পাখিরও নীড় আছে, আমার তাও নেই!’  এখানেই আমি সদম্ভে বলি, আমার একটি দেশ আছে, আছে মাথাগোঁজার ঠিকানা। মুক্তিযুদ্ধ আমার অস্তিত্বের ঠিকানা, এটা বারবার বলতেই হবে।

২০১৮’র একুশের বইমেলায় প্রচুর মুক্তিযুদ্ধের বই এসেছিলো। প্রচুর তরুণ লেখক মুক্তিযুদ্ধের বিষয়কে প্রতিপাদ্য করে রচনা করেছেন ফিকশন এবং ননফিকশন কাহিনী। আমি ব্যক্তিগতভাবে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখা যেকোনো ননফিকশন কাহিনীর পক্ষে। মুক্তিযুদ্ধ স্বতঃস্ফূর্ত এবং সহজাত বিষয়।  একে মনের মাধুরী মিশিয়ে লেখার দরকার আছে বলে মনে করি না। এখনো বীরাঙ্গনারা বেঁচে আছেন। বেঁচে আছেন সম্মুখ যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী মুক্তিযোদ্ধারাও। তাদের পদভারে আজো বাংলার মাটি কেঁপে কেঁপে ওঠে।  তাঁদের সম্মুখে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ফিকশন কাহিনী বানানো মানেই বিষয়টাকে অতিরঞ্জিত করে তোলা।  মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে  যতবেশি গবেষণা হবে; যতবেশি লেখা হবে; ততোই মুক্তিযুদ্ধের সত্যরূপ উঠে আসবে। হয়তো দশটা বই পড়লে একটা সত্যচিত্র দেখতে পাবো; অবশ্য মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী যাদের জন্ম, তাদের জন্য বিষয়টা এমনই হবে। এক্ষেত্রে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কাজ করা মানুষগুলি যদি একে অপরের প্রতি ভ্রুকুটি দেখান বা ভ্রুক্ষেপের দৃষ্টি ছুড়ে দেন; তাহলে সেটা হবে আত্মঘাতীর একটি দিক।  নিজেই সঠিক ইতিহাস লিখছেন আর অন্যজন ভুল ইতিহাস লিখছেন বলে বিভ্রান্তি ছড়ানোর মানসিকতা দেখানোও ঠিক নয়, যদি মোটাদাগে ভুল না থাকে। ভুল ইতিহাস আস্তাকুঁড়ে চলে যাবে, এটা সময়ের দাবি। তাই যার যেখান থেকে যেটুকু সম্ভব; নিজ নিজ এলাকার যত কাহিনী; এমনকি নিজের দেখা যত স্মৃতি আছে; তার সবটাই লেখায় উঠে আসুক,  এটাই সর্বোপরি কাম্য।

একটা বিশেষ  বিষয় হলো- কীভাবে মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিলো এবং মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন কী ঘটেছিলো; এর ধারাবাহিক ইতিহাস তুলে আনতে গেলে; ঘটনার পরম্পরায় ঘটনা আসবে। এমন ঘটনার বিবৃতিতে ব্যক্তির চেয়ে কাহিনী গুরুত্ব পাবে বেশি। মানুষ প্রথমে মুক্তিযুদ্ধ বুঝতে চাইবে, তারপর আসবে  যুদ্ধ পরিচালনাকারীর কথা। ঘটনার ধারাবাহিকতায় কোনো  লিডারের কথা আসলেও মূখ্য বিষয় থাকে শুধু মুক্তিযুদ্ধ। কারণ, যুদ্ধের মূল উদ্দেশ্য ছিলো স্বাধীনতা অর্জন এবং নিজ দেশকে পরাশক্তি থেকে মুক্ত করা। তাই সকল মুক্তিযোদ্ধার ছিলো একই স্বপ্ন, ধ্যান এবং  আত্মবিশ্বাস। সেইসঙ্গে তারা ছিলো দৃঢ়  প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। একই উদ্দেশ্যে ধাবমান যে জাতির মানুষ; সেখানে ব্যক্তি পরিচয় মূখ্য হওয়ার চেয়ে জাতি, দেশ মুখ্য হয়ে যায়। হ্যাঁ, প্রতিটি ঘটনা  ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে বিশ্লেষণ করতে গেলে কোনো কোনো বিশিষ্ট ব্যক্তির কথা উঠে আসবে, অবশ্যই যারা লিডিং পজিশনে ছিলেন। সেক্ষেত্রে ব্যক্তিকে প্রাধান্য দিয়ে  মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক কোনো বই হতে পারে। এখন কথা হচ্ছে, কে কীভাবে মুক্তিযুদ্ধের বিষয়-আশয় তুলে ধরছেন বা গবেষণা করছেন। এখানে ব্যক্তিবিশেষে অনেককিছু নির্ভর করছে। যার যার দৃষ্টিকোন থেকে যেই কাজই হোক না কেনো;  তা সঠিকভাবে মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক হবে, এটাই আমরা আশা করি।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষ এককাতারে এসে দাঁড়িয়েছিলো, একমাত্র জামায়াতী ইসলামপন্থী ছাড়া। স্বাধীনতা অর্জনের জন্যেই জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকলে এক হয়ে গিয়েছিলো।’জয়বাংলা’ শ্লোগান  ছিলো সবার কণ্ঠে। এক্ষেত্রে কোনো রাজনৈতিক দল যদি দাবি করে তাদের দল থেকেও অনেকে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন; তাহলে সেই রাজনৈতিক দলের দায়, সেই বীরদের বীরত্বগাথা তুলে ধরা। বিশেষ করে বামপন্থীদের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের বিষয়টা বামপন্থী কারোর কলমে উঠা আসা উচিৎ। তাহলে বামপন্থীদের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ এবং ভূমিকাটাও পরিস্কার হয়ে আসে। কারণ, সেই বীরদের বিশেষ রাজনৈতিক দল বিশেষভাবে চিনবে এবং জানবে। যা একজন মুক্তিযুদ্ধের গবেষকের কষ্টসাধ্য ব্যাপার।কারণ, তাকে প্রচুর রিসার্চ করে সত্য তুলে আনতে হয়।  তাছাড়া, যারা শুধু মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানার জন্য কাহিনী তুলে আনছেন; তাদের কাছে কখনো কখনো ব্যক্তিবিশেষ গুরুত্ব নাও পেতে পারে। কাহিনীর ধারাবাহিকতায় বিশেষ ব্যক্তির নাম আসলেও, সেটা কাহিনীর স্বার্থে বা অন্যান্য সহযোদ্ধাদের অংশগ্রহণে সেই নামও অস্ফুট হয়ে ওঠে। সেক্ষেত্রে যার যার কাজের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ না করে নিজ নিজ কাজে মনোনিবেশ করাই শ্রেয়।  মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কাজ করার হাজারো দিক আছে। একজন মানুষের পক্ষে সবদিক নিয়ে কাজ করাও সম্ভব নয়। তাই যতভাবে এবং যে যেভাবে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে চর্চা করবে; ঠিক সেভাবেই মুক্তিযুদ্ধ বিষয়টি শাণিত হবে। 

পরিশেষে বলবো,  অসাম্প্রদায়িক, কল্যানমুখী,মানবিক ও প্রগতিশীল জনগণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এদেশের মানুষের মৌলিক ও ন্যায়সংগত অধিকার নিশ্চিত করা, জাতীয় পরিচয় প্রতিষ্ঠা, শোষণ -বঞ্চনা-অন্যায়ের অবসান ঘটানো ও সাধারণের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করাই ছিলো মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য ও  উদ্দেশ্য । এই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই মুক্তিযুদ্ধের আবির্ভাব।  শাশ্বত সত্য এবং চিরন্তন সত্যরূপে মুক্তিযুদ্ধ আমাদের কাছে ধরা দিয়েছে। আমরা তাকে ধারণ করেছি। স্বাধীন রাষ্ট্রের অধিকারী হয়েছি। একে ধারণ, বাহন এবং রক্ষণাবেক্ষণ প্রতিটি বাঙালির অবশ্যম্ভাবী একটি কাজ। মুক্তিযুদ্ধের কাহিনী যতদিন জীবন্ত থাকবে; ততদিন বাংলার আকাশে স্বাধীনতার সূর্যও জ্বলজ্বল করবে!

জয়বাংলা…

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]