আমাদের ছোটবেলা

কাকলী আহমেদ

‘স্মৃতির পাখিরা’ এক ধরণের স্মৃতিগদ্য। যেন ফেলে আসা জীবনের সুখদুঃখময় বসবার ঘর। কত চরিত্র এসে বসে সেখানে, কত চরিত্র বিদায় নেয়। মাঝখানে জেগে থাকে হারিয়ে ফেলা শহরের ঘ্রাণ হয়তো। কাকলি আহমেদ সেই বসবারঘরের গল্প বলতে চেয়েছেন প্রাণের বাংলার পাতায় তার ‘স্মৃতির পাখিরা’ কলামে।

আমরা দুই বোন এক স্কুলে পড়ি। আমি ক্লাস সেভেনে আর আলো ক্লাস এইটে। মুনিয়া আমার চেয়ে সাড়ে চার বছরের ছোট। ভিকারুননিসা নূন স্কুলে ভর্তি হবার আগে আমাদের তিন বোনের স্কুল জীবন শুরু পুরানা পল্টনের লিটল জুয়েলস স্কুলে। পুরানা পল্টনে অনেক আগের পুরনো একটি স্কুল। স্কুলটি ছিল পুরনো দোতলা একটি বিল্ডিং। ভিতরে ভালোই বড় একটা মাঠ। স্বাধীনতা পুর্ব সময়ে পুরোই ইংরেজি মিডিয়াম ছিল বোধ করি। দেশ স্বাধীন হবার পর আম্মা অনেক খুঁজে পেতে নয়া পল্টনের বাসার কাছাকাছি এই স্কুলে আমাদের তিন বোনকে ভর্তি করে দেন। আমি সরাসরি ক্লাস থ্রি -তে ভর্তি হই৷ আলো ক্লাস ফাইভে। আর মুনিয়া নার্সারি-তে। এই স্কুলে মন্টেসরি পদ্ধতি -তে লেখাপড়া হতো। আমার মায়ের কর্মজীবন শুরু হয়েছিল শিক্ষকতা দিয়ে।
আম্মার বিয়ের আগে তিনি খুলনায় ইস্পানীদের পরিচালিত  `পোর্ট কিন্ডাগার্টেন’ নামের একটি স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। আম্মা এম,এ পাশ করবার পর ময়মনসিংহ -এর টিচার্স ট্রেনিং কলেজ থেকে বি,এড ডিগ্রীও অর্জন করেন। মন্টেসরী পদ্ধতি এক ধরণের বিশেষ শিক্ষা পদ্ধতি। আম্মার এই বিষয়ে জ্ঞান থাকায় অনেকটা অভিভূত হয়েই এই স্কুলে আমাদের ভর্তি করে দেন।স্কুলের প্রিন্সিপাল আনোয়ারা কবীরের সঙ্গে কথা বলে আম্মা মুগ্ধ হয়ে যান। কঠিন ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে আমি ও আলো ভর্তি হই৷ বলতে দ্বিধা নেই ভর্তি পরীক্ষায় আমার নাম ছিল একেবারে লিস্টের নীচের দিকে। আম্মার হাতে ক্লাস টু পর্যন্ত বাসায় পড়ার কারণেই হয়ত এমন যবুথবু অবস্থা ছিলো। ছোট বোন মুনিয়ার কোন পরীক্ষা লাগেনি। একবারেই সে নার্সারি-তে ভর্তি হয়েছে। এই স্কুলটিতে ক্লাস সেভেন পর্যন্ত ছিলো কেবল। খুব ভাল স্কুল হওয়া সত্ত্বেও আম্মা আবার আমাকে আর আলোকে ভিকারুননিসা নূন স্কুলে ভর্তি করে দিলেন।কাকরাইলের এই বাসা থেকে আমি আর আলো রিক্সায় করে ভিকারুননিসা নূন স্কুলে যাই। মুনিয়া তখনও সেই পুরনো স্কুলে। আব্বু ওকে সকালে নামিয়ে দিয়ে আসে আবার দুপুরে নিয়ে আসে।
মুনির ভাইয়া আমাদের বাসায় বেড়াতে আসাতে বেশ সুবিধে হলো। মুনিয়াকে সকালে স্কুলে নিয়ে যাওয়া আর দুপুরে নিয়ে আসার দায়িত্ব পড়লো মুনির ভাইয়ার উপর। মুনিয়া তখন কেবল ক্লাস টু-তে পড়ে। প্রায় দিন স্কুল ছুটি শেষে বাড়ি ফেরে হাতে চকবার নিয়ে। ভাইয়ের আদর কাকে বলে আমরা জানি না।মুনির ভাইয়া আসার পর তাঁর অপত্য স্নেহে আমরা যেন সুখ সুখ এক সময় পার করতে লাগলাম। যদিও প্রায় দিন মুনিয়াকে আইস্ক্রীম কিনে দেয়ার জন্যে মুনির ভাইয়া আম্মার বকাও খেতেন।আম্মা মুনির ভাইয়াকে কষে বকা দিতেন আর বলতেন, তুমি স্টুডেন্ট মানুষ কেন অহেতুক ওর পেছনে টাকা খরচ করো। মুনির ভাইয়া কেবল হাসতেন। আহমেদ বংশের সর্ব কনিষ্ঠ ছোট বোন মুনিয়া যাকে আমার দাদা বাড়িতে সবাই মুনমুন বলেই ডাকতো, সকলের অপত্য স্নেহভাজন ছিলো সে। মুনির ভাইয়া যেন খুব অল্প সময়ে আমাদের আপন বড় ভাইয়ের জায়গাটা দখল করে নিলো।
আশির ঢাকা ছিল পুরোই ফাঁকা। ছিল রিক্সার শহর। রাস্তাঘাট ছিল নীরব৷ রাত আটটার গাড়ির হর্ণ শোনা যেতো না বললেই চলে। ফাঁকা এই ঢাকা শহরের মানুষের প্রতি মানুষের অনেক বেশি দরদ ছিল। সন্ধ্যের পর হঠাৎ ইলেক্ট্রিসিটি চলে যাওয়া ছিল নৈমিত্তিক ঘটনা।রান্নার কাজে, ছাত্র ছাত্রীদের পড়ার কাজে ব্যবহারের জন্যে প্রতি বাড়িতেই দুই তিনটি করে হারিকেন থাকতো। কেরোসিন ভরে সলতে পাকিয়ে সব সময় সচল রাখা হতো হারিকেনগুলোকে৷ সন্ধ্যের আগে হারিকেন ঝাঁকিয়ে কতটুকু তেল আছে তা পরখ করে নেয়া হতো। আশে পাশের বাড়ির লোকজনের মাঝে সৌহার্দ্য এত বেশি ছিল যে কারো হারিকেনে তেল না থাকলে অকপটে এক বাসা আরেক বাসায় প্রয়োজনীতাকে প্রাধান্য দিয়ে নিজের কাজকে পাশে ঠেলে ঘরের হারিকেন পড়শিকে দিয়ে আসতো৷ এ ব্যাপারে আমার মায়ের ছিল দরাজ দিল। কার ঘরে চাল নেই,নুন নেই, পাশের বাড়ির আখতার চাচার ছেলেদের পরীক্ষা কবে। সব ছিল তার মুখস্থ।
বহুদিন পর হারিকেনের ঝুল কালিমাখা চিমনির প্রতিও কেমন যেন বুক মুচড়ে এক ভালবাসা কেঁদে ওঠে।
সন্ধ্যেবেলায় আমরা সবাই একসঙ্গে পড়তে বসে যেতাম। তিনবোন মাদুরের উপর লাইন দিয়ে। সামনে রান্না ঘরে আম্মা রাতের রান্না করতেন আর আমরা লেখাপড়ার কিছু না পারলে ডাকলে আম্মা বুঝিয়ে দিয়ে যেতেন।আক্তার চাচার ছেলে আবীর আশিকের লেখাপড়ার ব্যাপারেও আম্মার ছিল বেশ খেয়াল।চাচার কোনদিন শুটিং সেরে ফিরতে দেরি হয়ে গেলে আমাকে লাগিয়ে দিতেন ওদের পড়াশুনা শেষ করাবার জন্যে। আবীর খুব ছোট ছিল বলে লেখাপড়ার প্রতি ঠিক মনোযোগ দিতো না। আর আশিক ছিল মহা ফাঁকিবাজ। ওকে দিয়ে লেখাপড়া করানো ছিল ভীষণ কঠিন এক কাজ।
টিনের বারান্দার পরে যে বিশাল খালি জায়গা সেখানে বিকালে আশেপাশের বাচ্চারা খেলাধুলা করে। জায়গাটার অর্ধেকটাই আগাছায় পূর্ণ। খেলতে খেলতে খোলা মাঠের শেষের দিকটায় ভুলে ভালে চলে গেলে আম্মা চিৎকার দিয়ে উঠতেন। সাপ খোপের বসবাস থাকতে পারে এমনটাই তাঁর সন্দেহ। বহুবার বলেও বাড়িওয়ালেকে দিয়ে ঝোঁপঝাড় পরিস্কার করাতে না পেরে এক বন্ধের দিনে গোটা দুই মানুষ ডেকে পয়সা দিয়ে পুরো জংগল কেটে সাফ করে ফেলা হলো। বাড়ির পিছনের জায়গাটা যে এত বিশাল ছিল ঝোঁপ জংগলের আড়ালে তা কেবল অনেক খানিই লোক চক্ষুর আড়ালে লুকিয়ে ছিল। মাঠের শেষের ভাঙ্গাচোরা দেয়ালের সীমানার ওপাড়ের বাড়িঘর ও যেন অনেকটাই কাছে চলে এলো।সন্ধ্যের আগে আগেই সব পরিস্কার হয়ে বিশাল এক প্রান্তর আবিস্কার হলো।
মুনিয়া ছোট ছোট ফুলের ছাপা ওয়ালা ফ্রক পরে এ প্রান্ত থেকে দেয়াল পর্যন্ত বারকয়েক ছোটাছুটি করে বেড়ালো। তার সঙ্গে আবির,আশিক,ইদি আমিন, সারোয়ার, সোহানী তো আছেই। আমি পেছনের বারান্দার সঙ্গে দুই পাশের সিঁড়ির কিনারায় বসে কেবল দর্শক হয়ে রইলাম। ক্লাস সেভেন এইটের মেয়ে মানেই উঠতি বয়সের কিশোরী। আর এ বয়সেই যত রকম না এর অনুপ্রবেশ। ‘পাছে লোকে কিছু বলে’এর গলা জাপটে ধরা বই আর কিছু নয়।

ছবি: গুগল