আমাদের জন্য সুস্থ দেহের দেড়’শ নারী তৈরি রাখুন

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

“আমাদের ঘুম পাড়ানোর জন্য যে নতুন ওষুধ বেরিয়েছে তার পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য যদি আপনারা কিছু সংখ্যক বন্দী সরবরাহ করতে পারেন আমরা সেটা বিশেষভাবে করে মনে রাখব।”

“আমরা আপনাদের উত্তরে ইতিবাচক অবস্থান জানাচ্ছি। কিন্তু এক একজন মহিলা বন্দীর জন্য ২০০ মার্ক আমাদের কাছে অতি বেশি মনে হচ্ছে। আমরা প্রস্তাব রাখছি মহিলাদের দাম ১৭০ মার্কের বেশি করা সম্ভব নয়। যদি এটা আপনাদের কাছে গ্রহণযোগ্য হয় তাহলে মহিলাদের আমাদের কাছে পাঠিয়ে দিন। আমাদের মোটামুটি ১৫০ জন মহিলা প্রয়োজন।”

“আমাদের মধ্যে যে চুক্তি হল সেটা আমরা নিশ্চিত করছি। আমাদের জন্য যতটা সম্ভব সুস্থ দেহের ১৫০ জন মহিলা তৈরি রাখুন।”

“১৫০ জন মহিলাকে আমরা পেয়েছি। তাদের ক্ষতবিক্ষত (macerated) অবস্থা সত্ত্বেও এদেরকে পরীক্ষার জন্য সন্তোষ জনক বলেই মনে হচ্ছে।”

“পরীক্ষা-নিরীক্ষাগুলো করা হয়েছে। যাদের ওপরে পরীক্ষা করা হয়েছে তারা সবাই মারা গেছে। আমরা আপনাদের সঙ্গে শিগগিরই নতুন সাপ্লাই-এর জন্য যোগাযোগ করব।”

সংলাপগুলো পড়লে যে কোনো সচেতন পাঠকের শরীর শিহরিত হবার কথা। এসব সংলাপ আদানপ্রদান হয়েছিলো এখন থেকে ৭৮ বছর আগে তখনকার জার্মানীর বিখ্যাত ওষুধ কোম্পানী আইজি ফারবেনের ম্যানেজার অটো অ্যামব্রস ও ইতিহাসে কুখ্যাত আউৎশভিস বন্দীশালার কমান্ডারের মধ্যে। এই কারাগারেই পৃথিবীর নির্মমতম নানা পদ্ধতি প্রয়োগ করে হিটলারের নাজি বাহিনী খুন করেছিলো লক্ষ লক্ষ ইহুদীকে।

১৯৪১ সালে পৃথিবীর বৃহত্তম ওষুধ কোম্পানিগুলোর একটি ছিলো জার্মানির আইজি ফারবেন। এখন যে ওষুধ কোম্পানিগুলোর নাম বিশ্বসুদ্ধ প্রায় সব শিক্ষিত মানুষই জানে – যেমন, বেয়ার, হেক্সট ইত্যাদি – এরকম ৬টি কোম্পানি নিয়ে তৈরি হয়েছিলো বহুজাতিক আইজি ফারবেন – একইসঙ্গে ওষুধ এবং রাসায়নিক তৈরির সংস্থা। ১৯৩০-এর দশকের প্রথম দিকে যখন ধীরে ধীরে জার্মানির ভাগ্য ও ইতিহাসের নিয়ন্ত্রক হিসেবে হিটলারের উত্থান ঘটছে, সেসময়ে হিটলারের নির্বাচনী প্রচারে অর্থের সবচেয়ে বড়  জোগানদার ছিলো এই কোম্পানি। যে বছর হিটলার জার্মানির চ্যান্সেলর হলেন অর্থাৎ ১৯৩৩-এ আইজি ফারবেন ব্যক্তিগতভাবে হিটলারকে এবং তাঁর নাৎসি পার্টিকে ৪০০,০০০ মার্ক অর্থ সাহায্য করে। পরের বছর ১৯৩৪-এ হিটলার ফুয়েরার হবার পরে অর্থের পরিমাণ আরও বেড়ে যায়।

আউশভিৎস ছিলো জার্মানির সবচেয়ে বড়, কুখ্যাত এবং আতঙ্কজনক কন্সেন্ট্রেশন ক্যাম্প। আইজি ফারবেন-স্থির করেছিলো ওখানে একটি বিশাল আইজি ফারবেন কমপ্লেক্স তৈরি করার। তারা হিটলারকে বুঝিয়েছিলো, সেখানে তারা সিন্থেটিক পেট্রল এবং রবারের উৎপাদন করবে। এতে যুদ্ধকালীন অবস্থায় হিটলারের বাহিনী বিশেষ সুবিধা পাবে। কোম্পানিটির গুরুত্ব এতটাই ছিলো যে শুধুমাত্র এজন্যই আইজি ফারবেন-আউশভিৎস শাখাও তৈরি হয়।

ঘুমের নতুন ওষুধ ছাড়াও আউশভিৎসের সঙ্গে আইজি ফারবেনের আরেকটি যুক্ত হয়েছিলো তখন। সেসময়ে কীটনাশক হিসেবে জাইক্লোন বি অথবা সাইক্লোন বি নামে সায়ানাইডযুক্ত অতি বিষাক্ত এক রাসায়নিক যৌগের পরীক্ষা করেছিলো তারা। এটাই পরে গ্যাস চেম্বারে ব্যবহার করা হয়। ১৯৪৪ সালে আবিষ্কৃত আর একটি মারাত্মক গ্যাস ফসজিন (কার্বোনিল ডাইক্লোরাইড) ৪০ জন বন্দীর ওপরে প্রয়োগ করে দেখা হয়। সেই হতভাগ্য বন্দীদের মধ্যে অন্তত ৪ জন বন্দী ফুসফুসে পানি জমে মারা যান। সেই ভয়ানক নিষ্ঠুর মৃত্যুর বিবরণ পাওয়া যায় পরবর্তী সময়ে এক ক্যাম্প কমান্ডারের জবানীতে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, বন্দীদেরকে বাধ্য করা হয়েছিল ৩০ মিনিট গ্যাস চেম্বারে থাকতে। দশ মিনিট পরে ক্যাম্পের কমান্ডার দুজন বন্দীদের ফুসফুস ফেটে যাওয়ার শব্দ শুনতে পায়। তাদের তখন মনে হয়েছিলো মানুষের হাততালি দেয়ার মতো শব্দ হচ্ছে। তখন বন্দীদের মুখ, নাক এবং কান দিয়ে দিয়ে গলগল করে বাদামি ফেনা বেরিয়ে আসছিলো।

১৯৪৫ সালে জার্মানির পরাজয়ের পর জঘন্যতম যুদ্ধপরাধীদের বিচারের জন্য নাৎসী সদর দপ্তর নুরেমবার্গ শহরেই বিচার শুরু হয়। মোট ১২টি ট্রায়াল বা বিচার হয়েছিলো। এর মধ্যে প্রথমটিই ছিল “নুরেমবার্গ মেডিক্যাল ট্রায়াল” যা শুরু হয়েছিলো ৯ই ডিসেম্বর, ১৯৪৬ এবং শেষ হয় ২০শে আগস্ট, ১৯৪৭।সেই ট্রায়ালেই এসব তথ্য পাওয়া যায়। নুরেমবার্গ ট্রায়ালে একজন ডাক্তারের নাম আলাদা ভাবে উঠে এসেছিলো। তার নাম ডঃ জোসেফ মেঙ্গেল। ‘নাৎসি রেসিয়াল হাইজিন’ বা জাতিগত পরিচ্ছন্নতার হিংস্রতম কার্যকলাপ এবং পরীক্ষা চালানোর জন্য এই ডাক্তার কুখ্যাতি অর্জিন করে।

রাভেন্সব্রুক কন্সেন্ট্রেশন ক্যাম্পে আর একধরনের পরীক্ষা চলত যার নাম দেয়া হয়েছিলো ‘হেটেরোপ্লাস্টিক ট্রান্সপ্ল্যান্টেশন’। গোটা গোটা অঙ্গ, যেমন কাঁধ বা হাত বা পা, জীবন্ত বন্দীদের দেহ থেকে কেটে নেওয়া হতো এবং হোহেনলাইচেন-এর নাজি হাসপাতালে এসব ছিন্ন অঙ্গ পাঠিয়ে দেওয়া হতো অন্য বন্দীর শরীরে ট্রান্সপ্ল্যান্টেশনের চেষ্টার জন্য। তারপরে সাধারণত অঙ্গহীন হতভাগ্য বন্দীটিকে বিষাক্ত ইঞ্জেকশন দিয়ে মেরে ফেলা হতো।

প্রাণের বাংলা ডেস্ক
তথ্যসূত্রঃ নুরেমবার্গ মেডিকাল ট্রায়াল নথি থেকে
ছবিঃ গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]