আমাদের ডাকসুর নির্বাচন -৮৯

ইরা শিমুল

গত কয়েক দিন ধরে সংবসদ পএে ডাকসুর নির্বাচন নিয়ে হইচই হচ্ছে। ২৮ বছর পরে ডাকসুর নির্বাচন হবে। আমারও সাধ জাগছে আমাদের সময়ে ৮৯ সালের ডাকসুর নির্বাচন নিয়ে একটি লেখার। আমরা যারা আশির দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করেছি, বিশেষ করে ৮২ তে আমরা যারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে অনার্স প্রথম বর্ষে ক্লাশ শুরু করি তারা সবাই জানি ৯০ পর্যন্ত কি ভয়ংকর সময়ের মধ্যে দিয়ে আমাদের ছাত্র জীবন অতিবাহিত হয়েছে।

মূলত স্বৈরাচারী এরশাদের শাসন আমলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাএ ছাএীদের এক দূর্বিষহ কষ্ট এবং সংগ্রামের মাধ্যমে ছাএ জীবন শেষ করতে হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের সময়ের এক ইতিহাস হয়ে থাকা দিনের কথা স্মৃতির থেকে লেখার চেষ্টা করছি। আশির দশকে আমাদের ছাত্র জীবন শেষ হয়েও হয় না শেষ।

 আমাদের ছাত্র জীবনের শেষ পর্যায়ে ডাকসুর নির্বাচন হয় ৮৯ তে। কোন মাস ঠিক মনে নেই, স্মৃতি ঝাপসা হয়ে গেছে। সম্ভবত নভেম্বরে শেষে। ডাকসুর নির্বাচন। চারিদিকে সাজ সাজ রব। নির্বাচনী হাওয়া বইছে। সব ছাএ সংগঠন মিলে ছাএ সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে।

 এক দিকে ছাএ সংগ্রাম পরিষদ অন্য দিকে ছাএ দল নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। অধিকাংশ ছাএ ছাএী ছাএ সংগ্রাম পরিষদকে সমর্থন দেয়। সবাই জানতো ছাএ সংগ্রাম পরিষদ ডাকসুর নির্বাচনে জয়ী হবে। নির্বাচন শেষে রাতেই ফলাফল ঘোষণা হয়। ছাএ সংগ্রাম পরিষদ একক ভাবে জয় লাভ করে। রাতেই শামসুন্নাহার হলের এবং রোকেয়া হলের ছাএীরা মিটিং করে সিদ্ধান্ত নেয় পরের দিন ভোরে ছাএীরা বিজয় মিছিল বের করবে। কথা মত দুই হলের ছাএীরা রঙিন কাগজ কেটে ফুল দিয়ে মুকুট বানিয়ে মাথায় পড়ে, চারুকলার মেয়েরা মুখে আলপনা একে দিয়ে সবাইকে সাজিয়ে দেয়। সবাই মিলে TSC তে মিলিত হই। আমরা TSC থেকে বিজয় মিছিল বের করি। মিছিল নিয়ে কলা ভবন ঘুরে ফুলার রোডের কাছাকাছি চলে এসেছি। সামনে সব সাংবাদিক ভাইরা, ক্যামেরার ক্লিক ক্লিক ফ্ল্যাশের শব্দ। আমরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই চারপাশ থেকে পরাজিত দলের ছেলেরা হামলা করে। মুহূর্তেই এলাকাটি রণ ক্ষেএে পরিনত হয়।

 ছাএীরা যে যার মতো জীবন বাঁচাতে চারিদিকে ছুটতে শুরু করে। ছুটতে যেয়ে অনেক মেয়ে রাস্তার উপর পড়ে যায়। হামলাকারীরা অনেক ছাএীদের নির্মমভাবে ক্ষত বিক্ষত করে। অনেক ছাএী আহত হয়। এ খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই বন্ধুরা সহপাঠীরা অন্যান্য ছেলেরা ছুটে আসে ছাত্রীদের Resque করতে। আমি ছিলাম মিছিলের সামনের সারিতে মাঝখানে। কি করবো বুঝতে পারছিলাম না। এদিক ওদিক ছুটাছুটি করছিলাম। শিমুল ( প্রয়াত কবি শিমুল মহাম্মদ) এবং ওর ক’জন বন্ধু ঝড়ের বেগে ছুটে আসে ঘটনাস্হলে। আহত মেয়েদের সাহায্য করছে আর পাগলের মত আমার নাম ধরে চিৎকার করে আমাকে ডাকছে। খুজতে খুজতে আমাকে পেয়ে, আমার সঙ্গে যেকজন ছাএী ছিলো তাদেরকে নিয়ে অতি তাড়াতাড়ি নিরাপদে রোকেয়া হলের ভিতর ঢুকে পড়ে।

 রোকেয়া হল এবং শামসুন্নাহার হলের মাঝ বরাবর দেয়াল। শিমুল দেয়ালের উপর উঠে দাড়িয়ে আমাকে এবং আমার হলের যে  ক’জন ছাএী ছিলো এক এক করে সবাইকে দেয়ালে টেনে ওঠায়। শিমুল সহ আমরা লাফ দিয়ে শামসুন্নাহার হলের ভিতরে ঢুকে পড়ি। শিমুল আমাদেরকে হলে দিয়ে সব ছাএরা মিলে আহত ছাএীদের ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে যায়। এই ঘটনা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিবাদের ঝড় উঠে। পরের দিন সকালে সংবাদ পএে শিরোনাম হয় সেই বিজয় মিছিল এবং বিজয় মিছিলে হামলার ছবি সহ ছাপানো হয়। শিমুল আমাকে কয়েকটা সংবাদ পএে ছাপানো ছবি সংগ্রহ করে দিয়েছিল। তার একটা ছবি এখনও আমার কাছে আছে যা আমি এতটা বছর যত্ন করে আমার কাছে আগলে রেখেছি।

অনেকেই হয়তবা ভুলে গেছে সেই ইতিহাস। আমি তাদেরকে মনে করিয়ে দেয়ার জন্য এই ঘটনা একটু লিখলাম এবং সেই ইতিহাস হয়ে থাকা সেই স্মৃতি জাগানিয়া ছবিটা post করলাম। ছবির সামনের সারির মাঝখানে আমি, আমার দুপাশে আমার হলের কজন ছাএী এবং ডানে বাদিকে রোকেয়া হলের ছাএীরা। আশির দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাকিছু ইতিহাস, যাকিছু সৃষ্টি, যাকিছু ঘটনা, দুর্ঘটনা এর সব কিছুই আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি জেনেছি মূলত আমার প্রয়াত স্বামী শিমুলের অসীম সাহসীকতা এবং অফুরান প্রানচঞ্চলতার কারনে।