আমাদের বাড়ি…

‘স্মৃতির পাখিরা’ এক ধরণের স্মৃতিগদ্য। যেন ফেলে আসা জীবনের সুখদুঃখময় বসবার ঘর। কত চরিত্র এসে বসে সেখানে, কত চরিত্র বিদায় নেয়। মাঝখানে জেগে থাকে হারিয়ে ফেলা শহরের ঘ্রাণ হয়তো। কাকলি আহমেদ সেই বসবারঘরের গল্প বলতে চেয়েছেন প্রাণের বাংলার পাতায় তার ‘স্মৃতির পাখিরা’ কলামে।

কাকলী আহমেদ

কাকরাইলের এই এলাকাটা ছিলো নানা শ্রেণীর লোকের বসবাস। আমাদের আশে পাশেই ছিল অনেকটা জায়গা জূড়ে বস্তি। একেবারে বস্তি বলা যাবে কি? জমির একপাশে মালিকের বসবাস, অন্যদিকে অনেকখানি জায়গা জুড়ে তাদের বাড়িতে কাজ করা মানুষের জ্ঞাতি গুষ্টিসহ সবার আবাসন ব্যবস্থা। আসলে ওই এলাকায় তখন কয়েকটি নামিদামী পরিবারের জমি জায়গা ছিল। ছোট্ট এক চিলতে জায়গায় বাড়ি, আর সঙ্গে বিঘার উপর বিঘা জমি।
আমার বড় বোনের ক্লাসের সহপাঠী নাবিলা আপার নানার অনেক জায়গা ছিলো এখানে । যে বাড়িতে উনারা থাকতেন সেটি উনার নানা বাড়ি। একপাশে ছোট্ট একতলা হলুদ রঙের বাড়ি। পেছনে বিস্তর খোলা জায়গায় তাদের ঘরে কাজ করতো এমন মানুষদের আবাসন ব্যবস্থা এবং তাদের কয়েক ঘর আত্মীয় স্বজন এখানে বসবাস করতো। রিকসা ওয়ালা, মুচি এমনতর নিম্ন জীবিকার মানুষের বসবাস ছিলো এসব জায়গায়।
বিকেলে মাঠে দাঁড়িবান্ধা, বৌচি খেলার সময় পাশের বস্তির অনেকেই আমাদের খেলার সঙ্গী হতো।

 পুতুলখেলার বয়স পার করে কেবল কৈশোরে পদার্পণ করেছি। বেড়ে ওঠার সময় বিশেষ করে এধরণের খেলার সময় শ্রেণী ভেদাভেদের বৈষম্য থাকতো না। খেলার সময় তাদের ডেকে একাত্ম হয়ে  খেলতাম।বন্ধুর মতই ছিল যেন অনেকটা সম্পর্ক।
এখন আর এমন দেখা যায় না। কোথায় আজ মাঠ, শিউলি ফুল,ভোরের শিশির, ভাদ্রের চড়া রোদ। মন যেনো আমাদের ক্রমেই ছোট হয়ে আসছে কেবল প্রকৃতির সঙ্গে দারুণ দূরত্বে ও বিচ্ছেদে।

শীত আসি আসি করছে কেবল। মুনির ভাইয়া বিদায় নিয়েছেন। ভাইয়ের আদর আর এতদিনের সাহচর্যে আমরা তিন বোন যেন কাতর হয়ে পড়লাম। শহরে আপন মানুষের বড্ডো অভাব। মুনীর ভাইয়া যাবার সময় আমরা তিন বোন ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কাঁদলাম। মুনিয়া ছিল খুব ছোট। সে যে কোন মানুষের যাবার সময়ই অস্থির হয়ে যেতো। এমন কি আমাদের বাসায় আরো আগে আমীর ভাই নামে একজন কাজের ছেলে ছিলো। আমীর ভাইয়ের দেশ ছিল বরিশালে। প্রতি বার দেশে যাবার সময় মুনিয়া কেঁদে কেটে তার সঙ্গে চলে যেতে চাইতো। মুনিয়া খানিক বড় হয়েছে তখন। মুনীর ভাইয়ার সঙ্গে না যেতে চাইলেও ভীষণ কান্নাকাটি করছিলো। মুনীর ভাইয়াও অশ্রুসজল চোখে বিদায় নিলো। খুলনায় গিয়ে প্রায় নিয়মিত উনি আমাদের চিঠিও লিখতেন। আমরাও নিয়ম করে উত্তর দিতাম। চিঠি লেখার মাধ্যমেও অনেক সম্পর্কে টিকে থাকতো। শব্দের পর শব্দ সাজিয়ে মানুষ ভালবাসা,দুঃখ, কষ্টের প্রকাশ ঘটাতে।
এ বাড়িটা ছিল খোলামেলা। সামনের দিকের দরজা বন্ধ করেই আমরা রাতে ঘুমাতাম।দুটি বেডরুমের একটিতে আমরা তিনবোন আর আকলিমা। অন্য ঘরটিতে আব্বু আম্মা ঘুমাতো। আব্বু আম্মার ঘরের দরজা সারা রাত গরম কালে খোলা থাকতো। ডান দিকেই বিরাট খোলা জায়গায়, কুকুর ঘরে ঢুকে যাবার ভয় মাঝে সাঝে আতংকিত করলেও চোর, ডাকাত, রাহাজানির কোন ভয় ছিলো না তখন। গরমকালে দরজা জানালা খুলে রাখলে দখিনের বাতাস হু হু করে ঘরে ঢুকতো। কিন্তু এক রাতে হঠাৎ আব্বুর চিৎকারে আমাদের সবার ঘুম ভেঙে গেলো। বারান্দায় বিরাট একটা কালো বাক্স রাখা ছিলো। অনেকটা সিন্দুকের আদলে অর্ডার দিয়ে আম্মা এই বাক্সটা বানিয়েছিলেন। শীতের,লেপ,কাঁথা সব তোলা থাকতো ওটাতে। দুটো মজবুত তালাও দেয়া থাকতো ঢাকনা বন্ধ করার পর। চোরের লোভ পড়েছে হয়তো এই বাক্সের উপর। আব্বু ভয়ে চোর চোর বলে আম্মাকে ডেকে তুলেছিলো। আম্মার সাহস বরাবর বেশি। আম্মা উঠে একাই হেঁটে বারান্দায় চলে গেলেন।‘ এই কে কে?’ বলে আম্মার গলা শোনে চোর পালালো। আমরা চোরের গল্প পরেছি বইয়ে । শুনেছি এ বাড়ি ও বাড়িতে চোর আসে। সেই প্রথম আমরা বাড়িতে চোর আসার অভিজ্ঞতায় পূর্ণ হলাম, কোন কিছু না খুইয়ে। খুব অল্প স্বল্প চুরি করতেই চোরের উপদ্রব ছিলো। বড় বড় চুরি, খুন, রাহাজানি  পত্রিকায় খুঁজে পাওয়া যেতো না। ঢাকার নিরাপত্তা, আইনের শাসন ছিল সুখময়, শান্তিপূর্ণ জীবন ধারণের আরেকটা কারণ। মানুষ আর মানুষের প্রতি মানুষের আন্তরিকতা যেন এক নিরাপত্তা বলয় তৈরি করে রাখতো।

ছবি: সজল