আমাদের বিছনাকান্দি

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

জহিরুল চৌধুরী

(নিউ ইয়র্ক থেকে): এক সময় পুরো বাংলাদেশটাই ছিলো আনন্দাশ্রম। যেখানে যাওয়া যেতো, দেখা মিলতো প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের। প্রকৃতিকে তখনো আমরা বিষাক্ত করে তুলিনি। ঢাকা নগরী তখনও সাবালক হয়ে উঠেনি। ছোট ছোট শহরগুলো ছিলো আনন্দ-বেদনা আর স্বপ্ন-সংগ্রামের চারণভূমি।

দেশে এখন আর স্বপ্ন নেই, সংগ্রামও নেই। যে তরুণ সমাজ পরিবর্তনের মোহে ব্রতচারী হতো, আজ তার কিছুই ভালো লাগে না। সমাজের কোনো কিছুর সঙ্গে সে আর নিজের সংশ্লিষ্টতা খুঁজে পায় না। তাই কাউকে সে উপদেশ দেয় না। কারো উপদেশ শোনার প্রয়োজনীয়তাও সে উপলব্ধি করে না।

তবে সে বেড়ায়। শহর থেকে দূরে কোনো গ্রামে। কাঁদামাটি আর জলডাঙ্গায় এখনো সে নিজের অস্তিত্ব খুঁজে পাবার চেষ্টা করে। হাজার হউক, পরিচয় তার বাঙালী। সংগ্রাম নেই, স্বপ্ন নেই, তেজ নেই, বীর্য নেই। তাই বলে আনন্দ থাকবে না কেন?

বিছনাকান্দি গিয়ে এই তারুণ্যের স্রোতে আমিও ভেসে বেড়িয়ে ছিলাম। দু’বার পাথরে পিছলা খেয়ে পড়েছি। পকেটের মোবাইল ফোন দু’টি রোদে শুকিয়ে পাথরের উপর হেঁটে চলে গেছি ভারত সীমান্তের কাছাকাছি। শত শত মানুষ। এদের নিরানব্বই ভাগ তরুণ। শরতের রোদের আভা খেলা করছিলো তরুণ-তরুণীর চোখেমুখে!

যাওয়াটা ছিলো হঠাৎ করে। সকালে নাস্তা সেরে আজকের দিনটি নিয়ে ভাবছিলাম। হঠাৎ বড় দামান্দ আলমগীর কল দিলো- মামা রেডি আছেন? আমরা আসছি। বললাম- আমি রেডি হচ্ছি। আসো।

আজ অনেক কাজ ছিলো। যেমন- ছোট’পার জন্য মাটি ভর্তি দুটো ফুলের টব কিনে একটিতে বেলী ফুল, আরেকটিতে পুঁই শাকের গাছ লাগিয়ে তিন তলার বারান্দায় টেনে তুলবো। সূর্যের দিকে মুখ করে ডালগুলো বাইয়ে দেব। পানি দিয়ে নিত্যদিন যত্ন নেয়ার অনুরোধ করবো।

একদিন পুঁই শাকে বারান্দা ছেয়ে যাবে। বেলী ফুলের গন্ধে রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে যাবে। মনে ভাব আসবে। যান্ত্রিক দুনিয়ার কষ্ট ভুলে প্রকৃতির অপার দানকে প্রাণ-মনে উপভোগ করবে। কিন্তু আজ ওদের সঙ্গে বিছনাকান্দি গেলে কাজগুলো তুলে রাখতে হবে আগামীকালের জন্য!

সিলেট শহরে নার্সারি কোথায় আছে তা জানা ছিলো না। আজ ভোরবেলায় হাটতে যেয়ে দু’এক জনকে জিজ্ঞেস করে জেনে নিয়েছি দু’টো নার্সারি পাশাপাশি। একটির নাম “বাংলাদেশ নার্সারি”। সেটি আগের মেডিকেল কলেজের শহীদ শামসুদ্দিন হোস্টেলের পাশে। সকাল ১০টার দিকে নার্সারি খুললে যাবো।

কিন্তু “বিছনাকান্দি”- এত শুনেছি যার নাম প্রবাসে বসেই, তার হাতছানি অবজ্ঞা করি কোন আক্কেলে? তার উপর এতগুলো তারুণ্ প্রাণের সমাবেশ, পুত্রকন্যাসহ জনীনের পরিবার, নতুন জামাইসহ জুলি, আমার প্রিয় বড় আপা। এদের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি না করে নিজেকে আড়াল করে রাখা হবে অন্যায়।

ওরা এলো বাড়ির দরজায়। সামনের আসনে জায়গা হলো আমার। বাংলাদেশের অন্যান্য শহরের তুলনায় সিলেট কিছুটা ব্যতিক্রম। এখনো এই শহরে মানুষ প্রাণের স্পন্দন খুঁজে নিতে পারে। সালুটিকরের চা বাগান পেরিয়ে বিছনা কান্দির দিকে এগিয়ে চললাম। বাঁ পাশে সিলেট ওসমানি বিমানবন্দর পেছনে ফেলে আমরা ছুটে চললাম।

বিছনা কান্দিতে এতগুলো খাবার হোটেল দেখে আমার চক্ষু ছানাবড়া। কী চমৎকার তাদের ডীল! পেটপুরে খান- এক’শ টাকা! ডিমের তরকারি নিলে বাড়তি ১৫ টাকা, বাহ। ভর্তা, ভাজি আর ডিমের এমন চমৎকার তরকারি বহুদিন খাইনি!

ফেরার সময় ওরা ধরলো গান গাইতে হবে। হ্যাঁ এমন পরিবেশে গান তো গাইতেই হয়- ‘এই কথাটি মনে রেখো, তোমাদের এই হাঁসিখেলায় আমি যে গান গেয়েছিলাম, জ্বীর্ণ পাতা ঝড়ার বেলায়।’ একটা প্রার্থনা সঙ্গীতও গাইলাম- ‘নিত্য তোমার যে ফুল ফোটে ফুলবনে। তার মধু কেন মন মধুপে খাওয়াও না।’

গান গাইতে গাইতে এক সময় আমরা চলে এলাম পাড়া গাঁয়ের একটি মসজিদের সামনে। সেখানেও আমরা প্রার্থণায় সামিল হলাম। পৃথিবীটা সুন্দর। তারচেয়ে বেশি সুন্দর বাংলাদেশ। বাংলাদেশের মানুষের মনে ভালবাসার যে ফল্গুধারা বয়, বিছনা কান্দির শীতল ধারায় তা বহমান থাকুক হাজার বছর।

ছবি: লেখক

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]