আমাদের বিয়ের রিসেপশন

উর্মি রহমান

লেখক, সাংবাদিক উর্মি রহমান প্রাণের বাংলার জন্য লিখছেন দূরের হাওয়া বিভাগে জীবনস্মৃতি; ‘মনে পড়ে’। তার শৈশব, কৈশোর জীবনের বয়ে চলা পথের গল্পগুলো এই ধারাবাহিক জুড়ে থাকব। উর্মি রহমান দীর্ঘ সময় বাংলাদেশে সাংবাদিকতা করেছেন। কাজ করেছেন বিবিসি বাংলা বিভাগেও। এখন বসবাস করেন কলকাতায়

আমাদের বিয়ে ঠিক হবার পর বিবিসিতে বেশ আলোড়ন পড়ে গিয়েছিলো। শুধু বাংলা বিভাগে নয়, অন্য কিছু বিভাগের বন্ধুদের মধ্যেও। আমাদের যেদিন রেজিস্ট্রেশন হলো, সেদিন আমার ছোট বাসায় শুধু বাংলা বিভাগের বন্ধুরা নয়, অন্য বিভাগেরও অনেকে এসেছিলো, যাদের আমরা আমাদের বিয়ের খবর বলিনি। তারা শুনে চলে এসেছিলো আর সেটা আমাদের ভালো লেগেছিলো। এখানে একটা কথা বলতেই হয়- বাংলা বিভাগে দুই বাংলার মানুষরা কাজ করে এবং তাদের রিত্রুুটও করা হয় একটা অনুপাত মেনে। সামান্য রেষারেষি যে ছিলো না, তা বলবো না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেটা সিনিয়র সহকর্মীদের কথায় প্রকাশ পায়। আমরা সুযোগ পেলে জবাব দিই। একটা ঘটনা বলি, একবার বাংলাদেশের উরির চরের ঘূর্ণিঝড়ের সময় আমাদের বাংলাদেশ সংবাদদাতা আতাউস সামাদ, আমাদের সামাদ ভাই অক্সফ্যামের বাংলাদেশের প্রধানের সাক্ষাৎকার নেন, যিনি একজন বাংলাদেশী। সেটা স্টুডিওতে বসে আমরা শুনছিলাম, এমন সময় আমাদের এক সহকর্মী (যাঁর সম্পর্কে বলা হয়েছিলো তিনি একজন ‘স্টার’), তিনি হঠাৎ বলে উঠলেন, ‘কি আশ্চর্য্য! ভদ্রলোক তো চমৎকার বাংলা বলছেন।’ আমার খুব রাগ হলো।

বিয়ের রিসেপশনে অতিথিদের একাংশ।

ট্রান্সমিশন শেষ হবার পর আমি সেই সহকর্মীকে বললাম, ‘আপনি কি বলতে চাইছেন। বাংলাদেশের মানুষ ভাল বাংলা বলতে পারে না? আমরা যা বলি সেটা কি?’ তিনি মিন মিন করে বললেন, ‘আমি তা বলতে চাইনি।’ আমি বলেছিলাম, ‘তাহলে আপনি কি বলতে চেয়েছিলেন? আর আপনি যে একটু আগে বললেন ‘জর্দানের বাদশা হুশেন’, তাঁর নাম হুশেন নয়, হুসেন।’ পরে দীপঙ্করদা বললেন, ‘তুই বড় মুখরা।’ আমি বললাম, ‘তুমি আমার সঙ্গে যেমন, আমিও তোমার সঙ্গে তেমন।’ আমাদের বিয়ে ঠিক হবার পর একদিন আমাদের বিবিসি ভবন, বুশ হাউজের সামনে কয়েকজন দাঁড়িয়ে কথা বলছিলাম, তখন পশ্চিমবঙ্গের এক সহকর্মী ঠাট্টা করে বললেন, ‘সেই তো আমাদের দিকেই আসতে হলো।’ নাজির ভাই আমাকে একটু কাছে টেনে নিয়ে বললেন, ‘তা-ও তো গোয়ালার ঘরে মেয়ে দিইনি।’ সেটা ছিলো হাসিঠাট্টার মধ্যে বল। কেউ কিছু মনে করতো না। আমরা মোটামুটি মিলেমিশে থাকতাম। আমাদের বিয়ে উপলক্ষ্যে ইস্টার্ন সার্ভিসে একদিন কাজের ফাঁকে পার্টি হলো।

বিয়ে রেজিস্ট্রেশনের দিন আমাকে সবাই বললো, আমি যেন রান্নাঘরে না ঢুকি। ওরা সবাই কিছু না কিছু রান্না করে নিয়ে এলো। কিন্তু আগেই বলেছি, বিবিসির অন্য সেকশন থেকে অনেকে এসেছিলো। যার ফলে শেষ পর্যন্ত আমার আর সাগরের জন্য খাবার ছিলো না। একজন দৌঁড়ে গিয়ে রেস্টুরেন্ট থেকে আমাদের জন্য খাবার কিনে এনেছিলো। কিন্তু সব মিলিয়ে খুব আনন্দঘন

মঞ্জু ব্যানার্জি, অজিত ব্যানার্জি, পঙ্কজ সাহা ও নাজির আহমেদ।

অনুষ্ঠান হয়েছিলো। বন্ধুরা গান গেয়েছিলো, নেচেছিলো। নাজির ভাই বলে রেখেছিলেন, তাঁকে না জানিয়ে আমরা যেন বিয়ের রিসেপশনের ব্যবস্থা না করি। আমরা ধরে নিয়েছিলাম, তিনি ব্যবস্থা করার ব্যাপারে সাহায্য করবেন। তিনি আমাদের বিয়ের সাক্ষীও ছিলেন আর ছিলো সৈয়দ মাহমুদ আলি। যাহোক। একদিন নাজির ভাইর কাছে শুনলাম, তিনি অনেকগুলো রেস্টুরেন্ট দেখে ও তাদের খাবার খেয়ে শেষ পর্যন্ত রাসেল স্কোয়ারের একটি রেস্টুরেন্ট বুক করেছেন। তারপর তিনি সাগরকে ডেকে একটা চেক তার হাতে দিয়ে বললেন, ‘এটা তোমার ব্যাঙ্কে জমা দিয়ে দাও। কারণ এটা তোমার শো। রেস্টুরেন্টকে তুমিই টাকাটা দেবে।’ বিস্মিত আমরা, আমাদের আপত্তিও তিনি শুনলেন না।

এমনকি বিবিসিতে তাঁর কিছু বন্ধুকে তিনি আমন্ত্রণ জানতে চেয়েছিলেন, সেটাও আমাদেরই বললেন তাদের জানাতে। আমরা শুধু বিস্মিত হইনি, অভিভূত হয়েছিলা। আমাদের দু’জনকে তিনি ¯েœহ করেন, জানতাম। তবু এটা আশা করিনি। তিনি পূর্ব লন্ডনে গিয়ে খুঁজে পেতে পান কিনে এনেছিলেন। অতিথিদের সবার জন্য একটি করে লাল গোলাপ আনা হয়েছিলো। তিনি লিসার কাছে খোর্মা-খেজুর-মিছরিসহ তবারুকের জন্য আরো কিসব পৌঁছে দিয়েছিলেন, লিসা সেসব সেলোফেনে মুড়ে লাল ফিতা দিয়ে বেঁধে দিয়েছিলো। সেসবও অতিথিদের দেওয়া হয়েছিলো। বিবিসির অনেকে এসেছিলো সেদিন। কিছু কর্মকর্তা, আমাদের ঘনিষ্ঠ সহকর্মী-বন্ধুরা এবং দৈনন্দিন কাজে যাঁদের সঙ্গে প্রতিনিয়ত দেখা হতো। কিন্তু নাজির ভাই কেন এটা করেছিলেন, আজও জানি না। তবে আমাদের জন্য দিনটিকে বিশেষভাবে সফল করার জন্য তিনি সবই করেছিলেন। আজও তাঁর সেই স্নেহের প্রকাশ মনটা ভরে দেয়। তাঁর অভাব অনুভব করি।

ছবি:লেখক


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box