আমাদের সবই আছে, কেবল আমরা ছাড়া

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

জহিরুল চৌধুরী

(নিউইয়র্ক থেকে): এক সময় আমরা বলতাম বিজন প্রবাসে! প্রবাস মানেই পরদেশে স্বজনহীন পরিবেশে বসবাস। আজ আর সে অবস্থা নেই। বাঙালী এখন প্রবাস জীবনে অভ্যস্থ। প্রবাসে জন্ম, প্রবাসেই মৃত্যু। বাঙালী জীবনে প্রবাসের সংস্কৃতি, আচার অনুষ্ঠান যেমন হুহু করে ঢুকছে, তেমনি বাঙালীও নিজের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে নানাভাবে।

১৩ জুলাই সন্ধ্যায় এমনি এক প্রবাসী অনুষ্ঠানে দেখা হয় রকিব ভাইয়ের সঙ্গে বহুদিন পর। রকিব ভাই একসময় ছাত্র ইউনিয়ন করতেন, ঢাকায় লেখাপড়া করার সময়। ‘৮০-র দশকে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের সময় রাস্তায় মিছিলে, হরতালে পিকেটিং-এ সরব ছিলেন। ‘৯০-এর গোড়াতে আমি চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় এলে রকিব ভাইয়ের সঙ্গে ছাত্র ইউনিয়ন অফিসে দেখা হতো।

রকিব ভাই ২২ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রে। আমার চেয়েও পাঁচ বছর আগে এসেছিলেন। আমরা আজ এসেছি আমাদেরই এক প্রতিবেশি স্বপন ভাইয়ের কন্যা নাইশা-র হাইস্কুল গ্র্যাজুয়েশন পার্টিতে।

পার্টিতে আমাদের কন্যারা যখন হিন্দি গানের ধমকে নেচে সবাইকে আমোদিত করছিলো, তখনই খবর পেলাম আলবেনিতে মাহতাব ভাইয়ের জননী, আমাদের সবার প্রিয় খালাম্মা হঠাৎ মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণে মৃত্যু বরণ করেছেন।

ভদ্রমহিলা নিজ হাতে রান্না করে খাইয়েছেন আমাদের বহুদিন। আমরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত সবাই মরহুমার রূহের মাগফিরাত কামনা করে দোয়া করলাম। কিছুক্ষনের জন্য অনুষ্ঠান ছিলো স্তব্ধ!

রকিব ভাইকে বলছিলাম- আমি যেন এই দেশে মৃত্যুবরণ না করি। যে দেশের, সমাজের মানুষ আমাকে পরম মমতায় ভালবাসে, মৃত্যু সেখানে হলে সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ জানাবো। জানতে চেয়েছিলাম- রকিব ভাইও এমনটা কামনা করেন কি-না? মুখটা কঠিন করে জবাব দিলেন- ‘অবশ্যই’!

এবার একটু মুখামুখি বসে একটি অভিজ্ঞতার কথা বললাম। আমার আরেক ঘনিষ্ঠ বন্ধু শামীমের বদৌলতে আমি এসে শিকড় গেড়েছি এই হাডসন ভ্যালিতে। একবার শামীম খুব হতাশা প্রকাশ করছিলো এই প্রবাস জীবন সম্পর্কে। বছর দশেক আগে।

তখনও তাদের সন্তান হয়নি। আমি তাকে তখন বলেছিলাম- বন্ধু হতাশার কোনো অর্থ নেই। মানুষ তোমাকে যেখানে ভালবাসবে, তুমি সেখানেই তাদের প্রয়োজন মেটাবে। তুমি যদি মনে করো বাংলাদেশের মানুষ এখনো তোমাকে ভালবাসে, তবে তোমার এই প্রবাসে থাকা অর্থহীন।

মানুষের জীবন মাত্র একটাই, এবং খুবই সংক্ষিপ্ত। যতদিন মানুষের ভালবাসায় বেঁচে থাকতে পার, ততদিনই লাভের। শুধুমাত্র অর্থ আর প্রতিপত্তির জন্য বেঁচে থাকার কোনোই প্রয়োজন নেই! আর সমাজ-সংসার, কিছুই তোমার নয়!

এই কথাগুলো বলার বছর খানেকের মধ্যে শামীম তার উচ্চশিক্ষিতা স্ত্রীকে নিয়ে বাংলাদেশে পাড়ি জমিয়েছে। এখনো আছে ঢাকা শহরে। কয়েক বছর আগে ঢাকার মহাখালীতে তার সফটওয়ার কোম্পানি অফিসে সর্বশেষ দেখা।

রকিব ভাইয়ের কাছে প্রশ্ন ছিলো- আচ্ছা আপনি ছাত্র জীবনে যে স্বপ্ন দেখতেন, এরসঙ্গে বর্তমানের কোনো ব্যবধান লক্ষ্য করেন কি-না? তার উত্তর- আমরা সে সময় স্বৈরাচারের পতন ঘটিয়েছিলাম বলেই আজ দেশের মানুষ ভাগ্যেন্নয়নের সুযোগ পেয়েছে। দেশ উন্নত হচ্ছে, সেটা আমাদের নিরন্তর আন্দোলন সংগ্রামর ফসল।

আমরা সবাই দেশে ফিরে যেতে চাই। প্রবাস জীবন ক্লান্তি ও বিচ্ছেদের। এখানে আমরা নিজের চিরচেনা পরিবেশ ছেড়ে পরন্মুখ, ভিখেরির বেশে। আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব নেই। কিন্তু জন্মভূমি তার সন্তানদের আদৌ বুকে টেনে নিতে চায় কি? নিশ্চয়ই চায়! জননী জন্মভূমি স্বর্গদপী গরিয়সী!

আমাদের দেশটা এখন চিরমলিন বেশ ছেড়ে মাথাতুলে দাঁড়াবার অপেক্ষায়। রকিব ভাই ময়মনসিংহে একটি জমি মাদ্রাসায় দান করার জন্য রেখেছিলেন। কিন্তু এখন মত পাল্টেছেন। মাদ্রাসায় আর জমি দেবেন না। সে জমিতে এখন গড়ে তুলতে চান শিশুতোষ পাঠাগার আর খেলার মাঠ।

দেশে ফিরে যাবার জন্যও আন্দোলনের প্রয়োজন আছে। যার সামর্থ, সুযোগ আর শারিরীক সক্ষমতা আছে সে-ই ফিরে যাবে। দেশকে দেয়ার মত অনেক কিছু আছে। গলির মুখে দাঁড়িয়ে দুষ্ট কিশোর-তরুণকে পরম মমতায় দু’টি ভালোমন্দ কথা শোনানোও অনেক বড় কাজ।

এটাই উপলব্ধিতে আনা প্রয়োজন- তুমি অনেক বড় পাশ দিয়ে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার-ডক্টরেট বনেছো, কিন্তু যে মানুষটির করের পয়সায় বড় হয়ে তুমি এই আরামের নিরানন্দ জীবনটাকে বেছে নিলে, তার জীবনের প্রয়োজনে কোনোই কাজে লাগলে না, তাহলে তোমার জীবনের অর্থ কোথায়?

বাংলাদেশে নীরবে এক সামাজিক অস্থিরতা গ্রাস করে ফেলছে সমগ্র সমাজ জীবনকে। এর পেছনে আছে সমাজের সব সম্পর্ক, বন্ধন, মূল্যবোধ বিসর্জন দিয়ে কেবল শিকড় ছেড়ার প্রবণতা। অর্থাৎ বিদেশে পাড়ি জমানো। যে অর্থ আর শক্তি খরচ করে আমরা বিদেশ থেকে রেমিটেন্স আয় করছি, সেই অর্থ আর শক্তি কি আমরা দেশের মানুষের জন্য ব্যয় করতে পারি না?

আমাদের বিদেশ মুখীনতা আমাদের সমাজে অনেক নেতিবাচক বাজে উপসর্গের জন্ম দিয়েছে। একটা বড় উপসর্গ হলো- পাশের লন্ডনী, অথবা সৌদি বাড়িকে টেক্কা দেয়া, বিদেশি জাঁকজমকের জন্য যত দ্রুত পয়সাকড়ির মালিক হওয়া যায়।

যে কোনো সমাজে ভালো-মন্দের একটি কাম্য ভারসাম্য থাকতে হয়। যখন কিছু মানুষ সমাজকে ত্যাগ করে কেবল বেঁচে থাকার জন্য বিদেশ বিভুঁইয়ে উন্মুখ হয়, তখন বাকিরাও হয়ে যায় নির্লিপ্ত ও অসহায়। সবচেয় বিপদে পড়ে সমাজে থেকে যাওয়া ভালো লোকগুলো। তারা তখন হয়ে পড়ে সংখ্যালঘু।

দাপট চলতে থাকে উচ্ছৃঙ্খল, মূঢ় এবং মেধাহীনদের! সমাজ পুরোপুরি ভালো মানুষদের হাতছাড়া হবার আগেই সিদ্ধান্তে পৌঁছতে হবে- আমরা আসলে কী চাই! আমরা কি অন্যায়কারীর দাপট পয়সা দিয়ে কিনে নেব, নাকি তা পাল্টে দিতে উৎসাহী হবো?

নিজের মেধা ও কর্মশক্তি এবং সামর্থকে বাড়াতে চাই না। অপেক্ষায় আছি সুযোগের। মেরে-ধরে, অন্যায় পথে, যে করেই হউক একটা সুযোগ চাই! এ থেকে পরিত্রাণ সম্ভব, যদি আমরা আবার মায়ের টানে, মায়ের কোলে ফিরে যাবার জন্য ব্যাকুল হই।

আমি ও রকিব ভাই যখন কথা বলছিলাম- তখনও উচ্চস্বরে বাজছিল হিন্দি গান। কখনো ইংলিশ। আর তাতেই অভ্যস্থ হয়ে উঠছে আমাদের সন্তানরা। কী দেশে, কী প্রবাসে? সর্বত্রই এখন আমরা আমাদের ছাড়িয়ে যাবার চেস্টা করছি। কেবল নিজেরটাকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে। একদিন হয়তো দেখবো- আমাদের সবই আছে, কেবল আমরা ছাড়া।

ছবি: লেখকের ফেইসবুক থেকে

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]