আমাদের সবের জীবনে…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সালাহ্ উদ্দিন শৈবাল

(কানাডা থেকে): ঠান্ডা আছে। কিন্তু খুব বেশি না। হিম হিম ঠান্ডা। দিনে রোদও ছিলো। হাওয়া ছিলো। এখন রাত। খাওয়া-দাওয়া শেষ। মুভি দেখছিলাম। ভালো লাগছিলো না। চুপচাপ বাইরে চলে এসেছি। ছন্দ খেয়াল করেনি। ছেলেটা একা তার ঘরে। রাস্তায় লোক নেই। বাতাসে গাছের পাতারা নড়ছে। সারি সারি বাড়ীর সামনে আলো জ্বলছে। তারপরও বিস্তর ছায়া। গাছের পাতার মতো বাতাসে সেই ছায়ারাও নড়ছে।

বাসার পাশে এক ফালি খোলা মাঠ। রাতের বেলা নিরিবিলি আর অনেক বড় মনে হয়। রহস্যময় মনে হয়।

আকাশে তাকাতে চোখ আটকে গেলো। রাতের আকাশে কয়েকটা পাখি উড়ে যাচ্ছে। আকাশ অন্ধকার..আবার অন্ধকার না। চাঁদ আছে। বড়সড়ইতো মনে হচ্ছে। আজ জোছনা-টোছনা নাতো? এই শীতের রাতের জোছনাকেই কি হিম জোছনা বলে? জানি না। পাখিগুলোকে শুধু কয়েকটা ছায়া মনে হচ্ছে। বাতাসে সাঁতার কেটে কেটে যাচ্ছে। কোথায় যাচ্ছে? এই রাতে তাদের কাজ কি? হঠাৎ কি হলো…এমন পরিবেশে দাঁড়িয়ে নিজেকে কেমন একা মনে হতে লাগলো। কোথা থেকে প্রগাঢ় নিসঙ্গতা একেবারে মোটা চাদরের মতো আস্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরলো। কেন মনে হলো? আমিতো এখানে একা না। ফিজিক্যালীও না। মেন্টালীও না।

অজস্র মানুষের ভিতরে থেকেও একা হয়ে যাওয়া আসলে মানুষের নিয়তি। সব থাকবে। ঘর থাকবে। পরিবার থাকবে। চোখের উপর নতুন চশমা থাকবে। বাইরে বৃষ্টি দেখার মতো ব্যালকোনি থাকবে..জানালা থাকবে। তবু মানুষের দুম করে একা একা লাগবে।

মনে হবে কি নেই…কি নেই!?

মহাকাশ যান রোভার পারসি মঙ্গল গ্রহ থেকে সাউন্ড ক্লিপ পাঠিয়েছে। বাতাসের শব্দ।..হু হু…বাতাস। ঘরে ঘুরে আসছে। কখনো বাড়ছে। কখনো কমছে। মনোযোগ দিয়ে শুনতে গেলে গায়ে কাঁটা দেয়। মনে হয় এই বাতাসে কোনো মানুষের শ্বাস মিশে নেই। বাচ্চার হাসি মিশে নেই। কেমন পরিত্যাক্ত বাতাস…. একা বাতাস। বিষন্ন বাতাস।

এক সময় যখন বড় হতে থাকলাম..নতুন নতুন অনেক কাজ বাড়তে থাকলো। সেই কাজগুলো যে আমাদের করতে হবে তা আমাদের কেউ বলে না। পরিবারের কেউ না। স্কুলের কেউ না।

এইযে….হঠাৎ কাছের কেউ ভুল বুঝলে কি করতে হয়..কেউ অভিমান করলে…কেউ হাত ধরতে চাইলে…কেউ ঠকিয়ে দিলে…কেই আস্তে করে দূরে সরে গেলে…দূরে আরো দূরে…..একেবারে জীবনের বাইরে…কি করতে হয়…. কি ভেবে মানিয়ে নিতে হয়..। বলে না। বলা হয় না। মানুষ ঠেকে ঠেকে শিখে নেয়।

মাসুদ যে দিন এসে বললো তার বাবা-মার সংসার ভেঙ্গে গেছে। কিশোর আমি থমকে গেলাম। ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে ছিলাম। কি বলবো? কি বলতে হয়? আমি জানি না। কেউ বলে নি। মাথা নিচু করে ছিলাম। মাসুদ মনে হচ্ছিলো আমার দিকে তাকিয়ে ছিলো। মনে হচ্ছিলো আমি তাকে কিছু বলি। কি বলবো?

মল্লিকা আর আমি তখন বয়সে সমান। ক্লাস এইট-নাইন হবে। মল্লিকার ছোটো ভাইটা বাসার পাশের রাস্তায় ট্রাকে চাপা পড়ে সিরিয়াস এক্সিডেন্ট করলো। এম্বুলেন্স এলো। বুক ধরফর করা পো পো শব্দ করতে করতে ছেলেটাকে নিয়ে উর্ধ্ব শ্বাসে ছুটতে থাকলো। ছেলেটা আর বেঁচে ফিরলো না। আমার মল্লিকার সংগে দেখা হতো। আমার কিছু বলার দরকার ছিলো। বুঝতে পারছিলাম না কি বলবো।

এর অনেক অনেক দিন পরে…একদিন অফিসে বসে আছি একজন কলিগ এসে বললো তার ক্যান্সার ধরা পড়েছে! অনেক দেরীতে। সামনে ভয়ংকর পথ। ভেতরে ভেতরে চমকে উঠলাম। আবারো! আবারো..আমার সামনে এমন কিছু…যখন আমি বুঝি না..কি বলবো।

ততদিনে বড় হয়েছি। বুঝে গেছি সবাইকে এরকম পরিস্থিতিতে পড়তে হয়।নিজের মতো করে সামলাতে শিখতো হয়। সেই কলিগ সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছায় বেঁচে যান। সুস্থ হয়ে যান।

অনেক দিন পর আমাকে এসে বলেছিলেন…..আমার সঙ্গে কাটানো সেই সময় তাকে সহজ করেছিলো…সাহসী করেছিলো। সে আমার কাছে কৃতজ্ঞ।

আমি তার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলাম। কারন আমার স্পষ্ট মনে আছে আমি সেদিন কি করেছিলাম। কি বলেছিলাম।

সেদিন আমি কিছুই করিনি। যা করার উনিই করেছিলেন। আমার কলিগ টানা কথা বলেছিলেন। ঘন্টা খানেক। আমি খুব মনোযোগ দিয়ে শুনেছি। মাঝ মাঝে ছোট ছোট প্রশ্ন করেছি। আর কিছু না….কিচ্ছু না!

যাওয়ার সময় আস্তে করে বলেছি..‘আপনার কথা বলতে ইচ্ছে হলে আমাকে ফোন করবেন। ব্যাস্!

আমি বুঝে গেছি কখনো কখনো শুধু কথা বলতে দেয়া…কথা শুনতে চাওয়ার পাহাড়সম এক শক্তি আছে। মানুষ আসলে ঠিক সেই সময় ভয়ানক একা অনুভব করে বলেই আরেকজন মানুষকে নিজের কথা

খুলে বলতে পারাটাই তার জন্য এক ভয়ানক প্রতিষেধক হিসাবে কাজ করে।

আমার এক বন্ধু তার স্ত্রীকে হারিয়ে অনেক দিন রাতে মসজিদে গিয়ে ঘুমাতো। বাসায় তার কেউ ছিলো না। সেই মসজিদে সারারাত কেউ না কেউ দোয়া-দুরুদ পড়তো। কথা বলার কেউ জুটে যেতো। বা তার মনে হতো এটা আল্লাহ্’র ঘর। নিজেকে তার একা মনে হতো না।

এই বৈরী পৃথিবীতে মানুষ হিসাবে বেঁচে থাকা বা মরে যাওয়া কোনোটাই আসলে খুব সহজ না। কিন্তু একজন একা মানুষের কথা কিছুক্ষন মনোযোগ দিয়ে শোনা…আরেক জন সহমর্মী মানুষ হিসাবে, খুব কঠিন হবার কথা না।

যখন জানা আছে এমন সময় আমারও আসে। যখন তখনই আসে।

‘এই ব্যথা—এই প্রেম সব দিকে র’য়ে গেছে—

কোথাও ফড়িঙে-কীটে—মানুষের বুকের ভিতরে,

আমাদের সবের জীবনে।

বসন্তের জ্যোৎস্নায় ওই মৃত মৃগদের মতো

আমরা সবাই।’

– জীবনানন্দ দাশ

ছবি: লেখকের ফেইসবুক থেকে

 


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box