আমাদের সেই পাশের বাড়ির টেলিফোন

ইরাজ আহমেদ

একদা পাশের বাড়িতে ফোন বাজতো। অচেনা কন্ঠ অনুরোধ জানাতো অন্য বাড়ি থেকে কাউকে ডেকে দেয়ার জন্য। আদানপ্রদান হতো জরুরী খবর, কখনো কুশল সংবাদ। পাশের বাড়ির টেলিফোনটা খুব গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হয়ে উঠেছিলো সেই কতবছর আগে। তখন মোবাইল ফোন আসেনি।প্রতি মিনিটে একজন মানুষ আরেকজনের ফোনের মনিটরে আছড়ে পড়তো না। ভেসে উঠতো না ইমো অথবা স্কাইপে। তখন আমরা ফড়িংয়ের সাহেবী নাম যে ড্রাগনফ্লাই সেটাও জানতাম না। কত তথ্য না-জানা আমাদের বোকা বোকা মন একটা ল্যান্ডফোনেই মুগ্ধ ছিলো।  সেই শহরে রাতবিরাতে ডাক্তার ডাকা শুরু করে মৃত্যু সংবাদ জানাতে অথবা কোনো সুসংবাদ  দিতেও ব্যবহৃত হতো পাশের বাড়ির টেলিফোন।

টেলিফোন যোগাযোগের কাজে ব্যবহৃত যন্ত্র মাত্র। কিন্তু আমি যে সময়ের কথা বলছি তখন ফোন নামের যন্ত্রটিকে কেন্দ্র করে ব্যবহারকারীদের মাঝে মধুর অথবা অম্ল সম্পর্ক গড়ে উঠতো।সত্তর অথবা আশির দশকেও একটা পাড়ায় খুব বেশী বাড়িতে ল্যান্ডফোন ছিলো না।ছোটখাট থেকে গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগের বাহন বলতে ছিলো পাশের বাড়ির কোন একটি ঘরে যত্নে রাখা ওই ফোন। কোনো কোনো বাড়িতে দেখেছি ফোনটাকে একটা সুন্দর নকশাতোলা একখণ্ড কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা হতো।

ফোনের হাত ধরে তখন নিঃশব্দচরণে প্রেম আসতো। মাঝরাত পেরিয়ে আসতো দুঃসংবাদ। ফোনের রিং টোনটাও ছিলো মিষ্টি, শ্রুতিমধুর। ক্রিং ক্রিং করে বাজতো সেই ফোন। নানা ধরণের কলার টিউনের সমুদ্র আমাদের হাতছানি দিয়ে ডাকেনি তখনও।

মেয়েটি যায় একতলা থেকে দোতলায় ফোন ধরতে। কোনোদিন বন্ধুর ফোন, কোনোদিন কোনো জরুরী সংবাদ। সে বাড়ির ছেলেটি তাকে দেখে। দেখতে দেখতে একদিন ভালোলাগা তৈরী হয়ে যায় দুজনের মধ্যে। ভালোবাসার স্রোতস্বিনীর উপর শুরু হয়ে যায় সেতু বাঁধার কাজ। সেই সেতু তাদের নিয়ে যায় পরিণয়ের দিকে। এমন সম্পর্কে অণুঘটক সেই পাশের বাড়ির টেলিফোন। আবার সামান্য ফোন করা নিয়ে দুই প্রতিবেশীর মাঝে মুখ দেখাদেখি বন্ধ হয়ে গেছে। কখনও এই ল্যান্ডফোনে প্রচুর ভুল কল চলে আসতো। এ ধরণের কলকে বলতাম ‘রং কল’। এই ভুল কলের সূত্র ধরেও মানুষে-মানুষে সম্পর্ক গড়ে উঠতো ।

তখন এই ফোনের ব্যবহার কমাতে বহু বাড়িতে ডায়ালের এক কোণায় ছোট্ট সাইজের তালা লাগানোর প্রচলন শুরু হয়েছিলো। আমাদের পাশের বাড়ির এক বড় ভাই আমাদের বাসা থেকে ফোনে তার প্রেমালাপ চালাতো একটি মেয়ের সঙ্গে। আমার বাবা-মা চাকরির সূত্রে অেফিসে যেতেন। ওই প্রতিবেশী যুবক তখন বাসায় এসে ফোন করতো। শেষে ফোন বিলের ক্রমশ উর্ধগতি দেখে ফোনে তালা লাগানো হলো।অভিবাবকরাও জানতে পারলেন সেই প্রেমকাণ্ডের কথা। সেই বড় ভাই তালাসহ ফোন করার বিশেষ কৌশলও আবিষ্কার করে ফেলেছিলো। আমার সাহায্যেই তালা বহাল রেখে সেই প্রতিবেশী যুবক ফোন করা অব্যাহত রেখেছিলো। এজন্য অবশ্য ঘুষ হিসেবে আমাকে দেয়া হতো সিগারেট। অল্প বয়সে এদের মাধ্যমেই আমি ধূমপানের সঙ্গে জড়িয়ে যাই। আমাদের দোতলা বাড়ির অন্য ভাড়াটেদের কারুরই ফোন ছিলো না। ফলে নানা সময়ে তাদের আত্নীয়স্বজনদের নানা ফোন বার্তা আমাকেই বহন করতে হতো।

পাশের বাড়ির গৃহকর্তৃীরা ফোন করতে এলে অনেক সময়ই হাতে করে কোনো খাবার নিয়ে আসতেন। কেউ আবার যাবার সময় খাবার নিয়ে যেতেন। আমার অনেক বন্ধুরা ফোন করতে এসে আমাদের বাসায় ভাত খেয়ে যেতো।ফোন হয়ে উঠেছিলো প্রতিবেশীর সঙ্গে শুভেচ্ছা আদান প্রদানের মাধ্যম।

পাশের বাড়ি এখন এই শহরে হারিয়ে গেছে। হারিয়ে গেছে পাশের বাড়ির টেলিফোনও। মোবাইল ফোন দখল করে নিয়েছে একদা গড়ে ওঠা সেই যোগাযোগের সংস্কৃতি।এখন আর কাউকে কোনো বাড়িতে অসময়ে ফোন করে বলতে হয় না-অসময়ে বিরক্ত করছি, পাশের বাসা থেকে অমুককে একটু ডেকে দেবেন?

ছবিঃ প্রাণের বাংলা