আমার এই পথ চলাতেই আনন্দ…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শিল্পী কনকচাঁপা এবার গানের পাশাপাশি প্রাণের বাংলার পাতায় নিয়মিত লিখছেন তার জীবনের কথা। কাটাঘুড়ির মতো কিছুটা আনমনা সেসব কথা, হয়তো কিছুটা অভিমানিও। কিছুটা রৌদ্রের মতো, খানিকটা উজ্জ্বল হাসির মতো।

তিন.

হাঁটতে হাঁটতে দেশের প্রান্তর ছাড়িয়ে বিদেশে পা দেই। পেশাদারি জীবনের প্রথম থেকেই সারা পৃথিবী ভ্রমণ করি আমি ও আমার বাউলসঙ্গী। হঠাৎ শুনি যুক্তরাষ্ট্রের এই আটলান্টিক শহরে আমাদের বাংলার “সোনার ময়না পাখি” থাকেন। আমাদের নীনা হামিদ, আমি উনাকে এ নামেই ডাকি। উঁনি কোথায় থাকেন-তার মুঠোফোনের নাম্বার কিছুই জানিনা।

আব্দুল আলীমের সঙ্গে

আয়োজকদের একজনকে বলতে উনি বলেন আমার সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেবেন। আমি আগাম ধন্য হয়ে যাই। পরদিন আয়োজক বলেন উঁনার সঙ্গে কথা হয়েছে, নীনা আপাই আমার হোটেলের ঠিকানা নিয়েছেন। আমাদেরকে দেখা দিতে আগামীকাল দুপুরে আসবেন। আমি আনন্দে আত্মহারা। অনুষ্ঠানে গান গাই, মন পড়ে থাকে ময়না পাখিতে।

পরদিন ময়না পাখি ও উনার জীবনসঙ্গী প্রখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী, সঙ্গীত পরিচালক এম.এ হামিদ ভাই সহ আমাদের হোটেলে আসলেন। এসেই বুকে জড়িয়ে আদর। বড়রা এমনই হন। সত্যিকারের যারা বড় তাদের কোনো কিছুই বিলিয়ে দিতে কখনও কোনো কার্পন্য নাই- থাকেও না। কুশলাদি বিনিময় শেষ হতে অনেক সময় লাগলো। বাংলাদেশের সব শিল্পীর খবর তার শোনা চাই। একটা সময় বললাম আপা আমি আপনার একটা সাক্ষাতকার নিতে চাই। উনি বললেন আর সাক্ষাতকার। আমার সাক্ষাতকার কে পড়বে, বাংলার মানুষ আমাকে কি চিনে? বুঝলাম অভিমানের মেঘ পুঞ্জিভুত হয়ে ভারী বর্ষণের অপেক্ষায়। রেকর্ড প্লেয়ার না থাকায় ভিডিও ক্যামেরায় সব ভিডিও করেছি। উনার সোনার ময়না পাখির গানের গল্প, রূপবান ছবির গল্প, আব্দুল আলীমের গল্প, ভিডিও ক্যামেরায় চোখে রেখে শুনছিলাম। পুরো আবহমান বাংলার সোঁদামাটির গন্ধ, রূপ-রঙ্গ সব আমার চোখে ভাসছিলো। ভাসতে ভাসতে সরে যাচ্ছিলো। হঠাৎ নীনা আপা বললেন – ‘কনক! তুমি কানতেছ? কাইন্দো না বোন। কানতে কানতে আমার কলিজার পানি সব শুকাইয়া গেছে।’

স্বামী এম এ হামিদের সঙ্গে

হায় কপাল, যে মানুষটার গানে গ্রাম বাংলা কেঁদে ওঠে, যে অশ্রুতে নদী ভরে যায় সেই মানুষটার চোখের নদী শুকনো? এত অভিমান, এত কষ্ট কি এই “ময়নাপাখি”র প্রাপ্য? যার গান শুনলে মনে হয় আমি আকাশে উড়ছি, ডানা মেলে সুর তরঙ্গে ভাসছি। শান্ত বিকেলটা প্রশান্তি ছড়িয়ে বিশ্রাম নিচ্ছে, সেই কন্ঠের অধিকারী নীনা হামিদ অভিমানের খাঁচায় বন্দি? একটা মানুষ নাই তার অভিমান ভাঙ্গাতে। তাকে পরবাসী জীবন থেকে মুক্ত করে দেশে নিয়ে আসার মত কি কেউ নেই? মাটির মানুষ নীনা আপাকে কি আমেরিকায় মানায়?

উনি আক্ষেপ করছিলেন ‘দেখো কনক রূপবান একটা শুধু কাল্পনিক চরিত্র না, এটা বাংলার নারীর স্বাশ্বত চরিত্র। যে কিনা ২০ দিন বয়সের স্বামী সন্তানসম পালন করার দুঃসাহস ও ধৈর্য রাখে এবং নিজের যুবা বয়স সামলে জীবন পার করে। একজন রুপবান নামের নারীমানুষের মধ্যে একই সঙ্গে কন্যা, জয়া, জননীর অন্তর রূপ ফুটে উঠেছে। অথচ সেই রূপবান আজকের গানে অনর্থক কোমর দোলায়া নাচে আর সারা বাংলার পুরুষদের নাচায়!যার কান্নায় সারা বাংলা কানলো সেই রূপবান আজ বিনোদনকারী! কনক বলো এই কি রূপবান?’ আমি কাঁদতে কাঁদতে হাসি। আপা মানুষ এক জীবনে চরিত্র বদলায়, আর আপনার রূপবানের এখন পঞ্চম জন্ম চলছে। এখন আর কোমর দুলালে চরিত্র স্খলন হয় না। উনি আবার হাসেন। যে হাসি বড় শিশুসুলভ এবং অবশ্যই দুর্লভ।

যে মানুষ এমন হাসতে পারে তিনিই তো গাইতে পারেন সোনার ময়না পাখির মত গান একদমে। বাংলার মানুষ তাকে মনে না রাখলে কিছুই আসে যায় না। তার গান মনে রেখেছে নদীর পলিমাটি, বাঁশঝাড়, নদীর ভরা নৌকার পাল। যেমন বাংলার দুঃখে কেঁদেছিলেন তেমনি অবলীলায় বাংলাদেশকে করুনা করার স্পর্ধাও জানিয়ে দিলেন আমার মাধ্যমে।

বললেন, ‘সবাইকে বইলো যারা আমাকে মনে রাখে না তাদের আমিও মনে রাখিনা।’ এমন হেলাফেলা সেই করতে পারেন যিনি অতটাই ঐশ্বর্যশালী, এবং আমাদের নীনা হামিদ আপা অবশ্যই ঐশ্বর্যশালী একজন কন্ঠশিল্পী যার কন্ঠে বাংলাদেশ সমৃদ্ধ।

আমার জীবন আবারো ধন্য হলো নীনা আপার উদারতায়। বললেন কনক, ‘আমার এই গানটা তোমার পছন্দ? যাও এই গানটা আমি তোমাকে দিলাম’। এবার আমি অশ্রুতে ভাসি। এ প্রাপ্তি আমার পাওনা স্রষ্টা তুমি কতই না দয়ালু! এভাবে আমার জীবন চলতে থাকে। জীবন দর্শন গভীর হয়।

হঠাৎ কোন বাঁকে জীবন পথ বদলে যায়। যে বাউল আমি গেরুয়াতে চোরকাঁটা বিঁধলেও থেমে দাঁড়াতাম। পা ফেটে যাওয়া শামুকটাকেও পরম মমতায় হাত বুলিয়ে ফেলে দিতাম, সে আমি জীবন দর্শনে পরিশোধিত হয়ে, পরিমার্জিত হয়ে জীবন পথে গভীর কোনো গিরিখাদ দেখেও থামিনা। সঙ্গী বাউল বলেন হাঁটো জোর কদমে, এ খাদ তোমার পাড়ি দিতেই হবে। তোমাকে পারতেই হবে।

তাঁর আর্শিবাদে আমি আবার পথ চলতে থাকি, গিরিখাদ পড়ে থাকে খাদের গভীরতায়। তার গভীরতা আমাকে আর স্পর্শ করেনা। কিন্তু এই তিন মহিয়ষীর মত সুরভিত কিছু ব্যাক্তিত্ব আমার ভাবনায় সুগন্ধ ছড়াতে থাকে। সারা দিনের ক্লান্তির পর প্রশান্তিতে সেই সৌরভ আমাকে ঘুমের দেশে নিয়ে যায়। স্রষ্টা কতই তুমি দিলা আমারে বিনা কারণে।

ছবি: গুগল ও লেখক

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]