আমার কলেজ আমার কাছে একটা গুরুত্বপূর্ণ বাঁক…

শ্বেতা চট্টোপাধ্যায়

(কলকাতা থেকে): জীবন আমাদের চলার পথে প্রত্যেকেই এক একটা করে বাঁক উপহার দেয়..যেখানে লুকিয়ে থাকে নানা রঙের বিচিত্র অভিজ্ঞতা..। আমার কলেজ জীবন আমার কাছে তেমন একটা গুরুত্বপূর্ণ বাঁক… একটা জার্নি..। যেখানে পৌছঁতে পেরে আজ মনে হয় আমার জীবনের একটা বৃত্ত পূর্ণতা পেয়েছে..।

মফস্বলের বাংলা মিডিয়াম থেকে ভাল নম্বর নিয়ে পাশ করে আসা একটা মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে অনেক খানি সংকোচ আর শঙ্কা নিয়ে পড়তে এসেছিলো এই কলেজে..। আত্মবিশ্বাস টুকু ছাড়া তথাকথিত স্ট্যাটাস আর মানিব্যাগ ভর্তি টাকা তো ছিলোই না, ছিলো না কোনো পরিচিতি বা প্রাচুর্য..।

বন্ধুরা

কলকাতার কলেজ গুলোর নামে সেই সময় যে সমস্ত গুজব মুখে মুখে ঘুরে বেড়াতো, সেসব শুনে ফার্স্ট ইয়ারের প্রথম ক্লাস শুরু হওয়ার আগের রাতে হাত পা ছড়িয়ে কাঁদতে বসেছিল মেয়ে, পরদিন সে কিছুতেই ওই কলেজে যাবে না বলে..! কারণ সে নিজে থেকে ওখানে ভর্তি হতে চায়নি, পরিবারের সমর্থন ও পায় নি বিশেষ । শুধু তার পড়ার মাস্টারমশাই তাকে জোর করে ফর্ম তুলতে যাওয়ার জন্য বাসে তুলে দিয়ে বলেছিলেন, ‘যদি ভর্তি হওয়ার সুযোগ পাও, তবে ওখানেই পড়বে তুমি..। এটা আমার ইচ্ছে, বাকি কথা তুমি নয়, সময় বলবে..’।

দুরুদুরু চিত্তে যেদিন প্রথমবার ‘একা’ কলেজের সিঁড়ি তে পা রেখেছিলাম, সেদিনের অনুভূতিটা আজও একদম টাটকা ! সেটাই ছিলো আমার জীবনে প্রথমবার একা কলকাতায় যাওয়া..। আর তারপরের সময়টা বা বলা ভাল বছরগুলো বালির মত বেরিয়ে গেছে হাতের মুঠো থেকে…। আজ মনে হয়, সেসব নিয়ে যা বলি, যা লিখি, কিছুই যথেষ্ট হবে না যে …!

আজ কলেজের রিইউনিয়ন এর মিটিং উপলক্ষে এতগুলো বছর পর কাজ থেকে ছুটি নিয়ে বিকেল বেলায় যখন কলেজ এর সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম, ফ্ল্যাশব্যাকে ঝলসে উঠলো বছর গুলো..।
এখন পর্যন্ত কাটানো আমার জীবনের সেরা সময়…এই বাড়িটা.. এই পরিবেশটা..এই সংস্কৃতিটা..এই ক্লাসরুমটা..এই বন্ধুবৃত্তটা..আর অবশ্যই সেই শিক্ষকরা..। তেরো বছর পর গিয়ে সেই assembly hall কত স্মৃতি ফেরালো..।
একজন স্যার কে দেখতে পেলাম যিনি আমাদের গ্রুপটা একবারেই চিনতে পারলেন..। এক ব্যাচ এর বন্ধুদের সঙ্গে

 সেই পুরনো বেঞ্চে বসে আড্ডা আর পুরনো স্মৃতির রোমন্থন করতে করতেই কেটে গেল মন খারাপিয়া ভাললাগা বিকেলটা..।

এই বাড়িটা আমায় দিয়েছে অনেক কিছু..। বলা ভাল, দুহাত ভরিয়ে দিয়েছে..। আজ আমি যা কিছু, তারজন্য অনেকখানি অবদান এই বাড়িটার..। কত কি মণিমুক্তোসম বিষয় আর আভিজাত্য ছড়ানো আছে এই বাড়িটার কোনায় কোনায়..। যার সবটা শিখে ওঠা হয়নি আমার, তবে যেটুকু নিতে পেরেছি, তা আমার বাকি জীবনের পুঁজি…।

আজ সিঁড়ি দিয়ে ঢুকতে ঢুকতে তপু প্রণাম করে পা রাখলো assembly hall এ…। আমিও আলেকজান্ডার ডাফ এর ঐ মূর্তির সামনে হল এর চৌকাঠ এর উদ্দেশ্যে প্রণাম রাখলাম..। মনে পরে গেল assembly prayer এর দিন গুলো..। কি শান্ত স্নিগ্ধ অথচ গাম্ভীর্যপূর্ণ পরিবেশ..। এমন একটা মাধুর্যপূর্ণ নীরবতা, যেখানে শুধুই নিজেকে সমর্পণ করতে ইচ্ছে করে..। খ্রিস্টান প্রোটেস্ট্যান্ট ধর্মাবলম্বী স্কটিশচার্চ কলেজ এক কুলীন ব্রাহ্মণ পরিবারের মেয়েকে কীভাবে যেন ধর্ম নিরপেক্ষতা আর মানবিকতা শিখিয়েছিল নীরবে..! প্রেমে পড়েছিলুম…!

ছবি: লেখক