আমার কিছু ভাল্লাগে না…

“বেলুন কিনি বেলুন ফাটাই, কাচের চুড়ি দেখলে ভাঙি
ইচ্ছে করে লন্ডভন্ড করি এবার পৃথিবীটাকে
মনুমেন্টের পায়ের কাছে দাঁড়িয়ে বলি
আমার কিছু ভাল্লাগে না।”

কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ইচ্ছে কবিতার শেষ কয়েকটি লাইন। ভালো না-লাগাকে এভাবে কয়েক লাইনে ব্যাখ্যা করার ক্ষমতা বোধ হয় কবিদেরই আছে। ভালো লাগে না আমাদেরও। কখনো চলতে চলতে, কখনো কাজের মধ্যে ডুবে থেকে, কখনো অবেলার অবসরে হঠাৎ বুকের মধ্যে নিভে যায় ভালো লাগার আলো। মন বিদ্রোহ করে বসে। আর চলতে ইচ্ছে করে না, আর ভাবতে ইচ্ছে করে না, আর হয়তো এগুতেই ইচ্ছে করে না। তখন তাল কাটে, সুর ভুল হয়, মনের ঘুড়ি সুতো কেটে ভেসে যায় কোন অচেনা আকাশে।
তখন কী করি আমরা? মন কী ভাবে তখন?তখন কেবলই মনের মধ্যে চলে কাটাকুটি খেলা। ভাবনার মেঘ জমে, পেছনের পথে বেয়ে হয়তো ভেসে আসে স্মৃতি। জানি না, জানা যায়ও না। তখন শুধু বলতে ইচ্ছে করে, ‘আমার কিছু ভাল্লাগে না’।

এবার প্রাণের বাংলায় প্রচ্ছদ আয়োজন সেই ভালো না-লাগা নিয়ে। কথা বলেছেন, সাংবাদিক, চলচ্চিত্র নির্মাতা, স্ট্যান্ডআপ কমেডিয়ান, গীতিকার, গায়ক। ছড়িয়ে দিয়েছেন তাদের মনের মেঘ।

শারমিন শামস্, প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও লেখক

মি তাকে বলি বোকা সময়। আমি তাকে ডাকি বোবা সময়। সেই সময়টা, যখন আমার মনের ভিতর ডাহুক পাখির বাসা, যখন আমি মনের ভিতরে আরো মন, বহুমনের অলিগলি ঘুরে তল না পেয়ে ফের ফিরে আসি বাইরের মন বারান্দায়। কিন্তু আকাশে তখন বরফ বরফ চাঁদের ছায়া পড়েছে, শেষ শীতের হাওয়া দিচ্ছে, আর একটা রিকশা- যেটা ছুটে যাচ্ছে দক্ষিনের দিকে। আমি সেই রিকশায় চড়ে বসেছি। রিকশার গায়ে বিশাল বক্ষা নায়িকার ছবি আঁকা, লাল রঙের ঘাগড়ায় যার যৌবন ফেটে পড়ছে, আর নায়কের মাংসল পেশিবহুল হাত তার সেই যৌবন আকড়ে ধরে আছে। রিকশাওয়ালার পিঠ কুঁজো, উদাস উদাস চোখে সে রিকশার হ্যান্ডেল ধরে রাখে, রিকশা চলেছে দখিনের দিকে।
আমি চলেছি, কারন আমার মন ভালো নেই। মন কেন ভালো নেই, তার রহস্য খুঁজেছেন কনফুসিয়াস, তার জন্য জাহাজে চড়ে বসেছেন কলম্বাস, পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা লিখে লিখে নিজেকে বুঝতে চেয়েছেন ফেরদৌসী। আর আমি নিতান্ত ছোটমোটো তুচ্ছ বালিকণা, সমুদ্রের পাশে বিশাল বালিরাশির ভিতরে মুখ গুঁজে থাকি, আর ঢেউয়ের আঘাতে ভিজে গেলে আমার সর্বাঙ্গ, তাতে ঢেলে দিই জমানো অশ্রুবিন্দু। মন ভালো নেই তাই বাতাসে কাটছি সাঁতার, মন ভালো নেই তাই খুঁজছি কাউকে যেরকম আমি বরাবর খুঁজি। হয়তো কোন বন্ধুর মুখ, হয়তো প্রেমিক, হয়তো মুগ্ধজন। তবু শেষ বিকেলের সেই হাপিত্যেশের ক্ষণে একটা কফিশপে যখন লালচে রোদ এসে পড়ে, আমি একদম একা। কেউ নেই। কেউ কোথাও থাকে না কখনো। শাহবাগের রাশ রাশ বইয়ের সারি থেকে তুলে আনা বইয়ের গন্ধ, ধানমন্ডির রাস্তায় ছায়া ছায়া আলোদের ভিড় ঠেলে আমি চলেছিই শুধু। আজ কার মন ভালো নেই? কবে কার মন ভালো ছিল না কখনো? কবে কার বিষন্নতার অসুখ জমে ছিল ছাদের কার্ণিশে? আমি জানি না তো। একটা গল্পের শুরু আছে, শেষ জানা নেই। মধ্যবর্তী অংশটুকু নিয়ে বসে থাকা সারা বিকেলের মত আমিও চলেছি- রিকশায় পাল তুলে, বাতাসের ঢেউ কেটে- সড়ক আর মহাসড়ক পেরিয়ে- যেতে যেতে যেতে যেতে যেতে যেতে যেতে যেতে…..

ফেরদৌস আরা রুমী, মানবধিকারকর্মী

মার ভাল্লাগে না… ‘আমার ভাল্লাগে না ভাল্লাগে না মনের অসুখ’ দলছুটের গান..সঞ্জীবদা (সঞ্জীব চৌধুরী) গেয়েছেন। মন খারাপ থাকলে অথবা ভালো না লাগলে এই গানটার কথা আমার মনে হয় সবার আগে। অন্যগানগুলো আছে। ভাল না লাগা টাইপের কথা অথবা মন খারাপের কথা বলা আছে যে গানগুলোতে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে ভালো লাগে না কেন? সুনির্দষ্ট কারণ থাকলে তো কথা নেই। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা ঠিক হয়ে যাবে ঠিক ঠিক। কিন্তু অকারণ খারাপ লাগা …মন বিষন্ন থাকা। এগুলোর চিকিৎসা কি? দুপুরটা হঠাৎ কোন কারণ নেই বিষন্ন হয়ে গেল…অথবা দেখা গেল আকাশটা বিষন্ন হলো প্রাকৃতিক কারণে, সেই দেখে আমার মনটা ধড়াম করে বিষন্ন হয়ে গেলে। অথবা কোন কারণ নেই মনটা বিষন্ন হয়ে গেল। সবকিছু কেমন যেন বিষন্ন হয়ে গেল সঙ্গে সঙ্গে। কোন মানে হয় এসবের! কিন্তু বিষন্নতা উপভোগ করার জন্য মনটা আর বেঁধে রাখা গেল না তখন। ছুট্টে কই কই যে যেতে চায় মন! মনে হয় বালিকার মতো সাঁতরে নদীর এপার ওপার করি। অথচ পারি না সাঁতার । অথবা বিলের ধারে সবচেয়ে নির্জন জায়গাটা খুঁজে থম মেরে পড়ে থাকি। কেউ পাবে না খুঁজে। আর নয়তো একা মধ্যরাতের রেল স্টেশনে ছোট্ট টিমে টিমে আলোয় যে চায়ের দোকানটা, সেখানে গিয়ে চা খাই আর অকারণে চা ওয়ালার সঙ্গে রাজ্যের গল্প জুড়ে দেই। কিন্তু পারি না এসবের কিছুই করতে। কোথায় যে ইট-কাঠের কারাগারে বন্দি হয়ে পড়েছি। ভীষণ বিচ্ছিরি। ভালোবাসি না এই কারাগার। আমি আমার বিষন্নতা …ভালো না লাগা উপভোগ করতে চাই। তোমাদের কাছে আর কিছু চাই না…শুধু মুক্তি চাই। দাও না মুক্ত করে।

প্রিয়ম সেনগুপ্ত, সাংবাদিক,ব্লগার, মিউজিশিয়ান (পশ্চিমবঙ্গ)

মার কাছে একটানা ভাললাগার মাঝের ছোট্ট ব্রেকটাই হল মনখারাপের সময়। পৃথিবীতে কোনও কিছুই চিরস্থায়ী নয়। মনখারাপও না। তাই ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই আমি চেটেপুটে উপভোগ করে নিই। এই মনখারাপের সময়টায় আমি প্রচুর খাওয়া–দাওয়া করি। একাএকাই খাওয়ার জন্য কোনও রেস্তোরাঁয় ঢুকে চেয়ার আঁকড়ে বসে পড়ি। সুন্দরী ওয়েট্রেস হাসিমুখে অর্ডার নিতে আসেন। আমি শুরু থেকেই জানি, অর্ডার করবো স্রেফ একটা মিক্সড চাউমিন। তবু এটা কী, ওটা কী বলে মুখটা গম্ভীর রেখে হাজারো প্রশ্ন করতে থাকি। তরুণী ওয়েট্রেস এতদিনে আমার মুখ চিনে গেছেন। তিনি নিজেও জানেন অমুক সসেজ, তমুক সিজলার নিয়ে যতই প্রশ্ন করি না কেন, আদতে আমার দৌড় সেই মিক্সড চাউমিন পর্যন্ত। অনেক চিন্তাভাবনা করছি, এমন একটা ভাব দিয়ে চাউমিনটা অর্ডার করি। একটু পরে চাউমিন চলে আসে। সেই প্লেটটা সামনে রেখে আমি থুতনিতে হাত দিয়ে বসে থাকি। দেখি, অন্যমনস্কভাবে তরুণীটি চুল ঠিক করছেন। অন্য কোনও টেবিলের ক্রেতার সঙ্গে চোখাচোখি হলেই তাঁর কিছু লাগবে কি না জানতে বারবার এগিয়ে যাচ্ছে। এসব চলতে চলতেই আমার দিকে চোখ পড়ে তাঁর। এগিয়ে এসে মিষ্টি করে হেসে বলেন, ‘আর কিছু লাগবে স্যার।’ মেয়েটির মুখ গজদাঁত আছে। সেদিকে চোখ পড়তেই মুহূর্তে আমার মন ভাল হয়ে যায়

শাহান কবন্ধ, গীতিকার

ন খারাপ যে কখন কোন গণ্ডি পাড় করে ঢুকে পড়ে মনের চিলেকোঠায় বলা মুশকিল। যদি তার আশা যাওয়ার পথ জানতাম তবে বলতে পারতাম কোথায় তার বাড়ি, কোথায় ঘর। কীভাবে হল আমার সঙ্গে পরিচয়। সত্যি জানি না। তবে হয়। কখন হয় জানি না। হয়ে যায় আচমকাই। বলা যায় বেল না দিয়েই ঢুকে পড়ে ঘরে। আর ঘরে এলেই আমি শান্ত হয়ে যাই জলের মতো। নীরব হয়ে যাই। চোখে ভাঁজ। নিশ্চুপ বারান্দার গ্রিল ধরে তাকাই দুরের অপারে। যেখানে কিছুই পরিষ্কার নয়। মনে ছায়ার অলিগলি পেরোয় দ্বিধা দন্দের বাইরে। অতীত এসে দাঁড়ায় চোখের পাতায়। মনে পড়ে ছেলে বেলার সব। বেশির ভাগ সময় নিজেকে আড়াল করে ফেলি। সব থেকে বেশি অপছন্দ লাগে মানুষের সঙ্গে কথা বলার কাজ। হেঁটে যাই চিন্তার বলি রেখা ধরে দূর দুরন্তে। আমার বেয়াড়া মনকে ভালো করার কোনও পন্থা আমার জানা নেই। তবে মিউজিক মাঝে মাঝে কাজ দেয়। সেই কৈশোরের প্রিয় গান,কবিতা আর বই। নেড়ে ছেড়ে দেখি। নিজের সঙ্গে নিজের হয় হাজারও গল্প। জেতার গল্প, হারার গল্প। পাওয়ার গল্প, না পাওয়ার গল্প। এই গল্পে গল্পে আবার মিশে যাই কোলাহলে। ভুলে যেতে বসি ভালো নেই। ভালো ছিলাম না। কখন যেন ভুলেও যাই। জীবন মানে ভুলে যাওয়া। আনন্দ ভুলে কষ্ট। কষ্ট ভুলে আনন্দ। এইতো পাশাপাশি হাসাহাসি আমি। আমি মানেই সবকিছুতে শরীর চেপে ধরা অনুভূতি।

জয় শাহরিয়ার, সঙ্গীত শিল্পী

ভাল্লাগেনা এমন সময় তো আসেই।মনখারাপের এই সময় কখনও কয়েক মুহুর্তের কখনও বা তারচেয়ে অনেক দীর্ঘতর।আমার মনখারাপ হয় কেউ ভুল বুঝলে, কাছের কারো দুঃসময়ে আর প্রফেশনাল মিউজিশিয়ান হিসেবে মনের মত গানটা না করতে পারলে প্রচন্ড মনখারাপ হয়। মনের মত গান করার পরিবেশ সব সময় সব জায়গায় থাকে না তখন এত মন খারাপ হয় যে বলে বোঝানো যাবে না।গানটা যখন পেশা তখন চাইলেই তো আর মনের মতো গানটা করা যায় না।
আর অজানা কারণেও কখনও কখনও মনখারাপ হয় না, তা নয়।তবে সেটা একটা নিয়ম ভঙ্গের মত। তখন প্রিয় শিল্পীর গানকে সঙ্গী করি। ঢাকার রাস্তায় একা একা ঘুরি।প্রিয় ক্যাম্পাসে আমার মতো সময় কাটাই। তবে খুব তাড়াতাড়িই বেরিয়ে আসি খারাপ লাগা থেকে।কারণ ভালো থাকতে জানতে হয়।আমার বিশ্বাস আমি ভালো থাকতে জানি। তাই মনখারাপের সময় বেশীক্ষণ এবং বেশীদূর আমাকে গ্রাস করতে পারে না।

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়, সাংবাদিক (পশ্চিমবঙ্গ)

ন খারাপ নিয়ে নাকি লিখতে হবে…। লিখতে হবে, মন খারাপ হলে কীসে আশ্রয় নিই…। এইটা কোনও কথা হল…? আমার আসলে এতই মন খারাপ হয়, এত আশ্রয়ের দরকার পড়ে, আবার এত তাড়াতাড়ি মন ভালও হয়, যে এটা লেখা কোনও ব্যাপারই নয়…। আদর্শ মুডি বলতে যা বোঝায়, আমি তাই…। এই বৃষ্টি, এই রোদ, এই মেঘ, এই হাওয়া চলছে দিনভর বুকের বন্দরে…। কোনও হাওয়া অফিসের সাধ্য নেই, পূর্বাভাস দেওয়ার…। কখনও কখনও তো ভাল মন এত তাড়াতাড়ি খারাপ হয়, ভাল করে বুঝেই উঠতে পারি না মন খারাপ…। আবার বুঝে ওঠার আগেই দেখি এক চিলতে হাসি দেখেই হোক, এক ফোঁটা শিশির দেখেই হোক, বা এক আকাশ তারা দেখেই হোক……হুট করে খুশি হয়ে গেল মন…। মন খারাপ হয়েছে বুঝতে পারলে, আমি সবার আগে কথা বলা বন্ধ করি আশপাশের মানুষের সঙ্গে…। কারণ কথা বললেই, কেউ আঁচ পেয়ে যেতে পারে আমার মন খারাপের। আর একটা গবেষণা তো বলেছেই, মন খারাপের সময় সান্ত্বনাবাক্যের বর্ষণ মন খারাপকে তুমুল রাগে পরিণত করে…। এ সময়, গভীর মন খারাপে, গভীর খারাপ লাগায়, ভীষণ করে মনে করার চেষ্টা করি জীবনের সেরা মুহূর্তগুলো… পাহাড়ে হাঁটাগুলোকে রিওয়াইন্ড করি…। মলমের মতো স্মৃতির প্রলেপ দিই মনের জখমে…। একই সঙ্গে চেষ্টা চলে মন খারাপের কারণটাকে সরিয়ে ফেলার…। ঠিক যে ভাবে টেবিলে ওপর রাখা কলমটা সরায়, ঠিক ততটাই সহজে সরানোর চেষ্টা করি…। টোকা মেরে ফেলে দেওয়া যেন…। দু’টো পদ্ধতি ঘষা খেতে খেতে এক সময় কমন ট্র্যাকে পড়ে, তখনি আস্তে আস্তে কাজ শুরু হয় মন খারাপের মলম…। এ তো গেল সিরিয়াস মন খারাপ, যে মন খারাপের বড় কারণ আছে..। যে মন খারাপের কৌলীন্য আছে…। এর বাইরে বহু সময়েই হয়, কোনও কারণ ছাড়াই, বা তুচ্ছ কিছুতে মুহূর্তের মধ্যে সারা পৃথিবীটা বিষাক্ত হয়ে যায়…। প্রতিটা মানুষ অসহ্য হয়ে যায়…। পৃথিবীর আহ্নিক গতিটাও যেন তখন বিরক্তির কারণ…! তখন সময় পাওয়া যায় না, নিজেকে গোছানোর…। তখন এক্সপ্রেস করতে হয় নিজেকে…। সেই মুহূর্তে রাগটা বার করে ফেলতে না পারলে বাঁচব না মনে হয়…। অথচ সময়, পরিস্থিতি সে সুযোগ দেয় না…। তখন প্রিয়জনকে ফোন করে ফেলি, নেহাৎ মেজাজ দেখানোর জন্যই…। নয়তো একলা হয়ে চেঁচিয়ে ফেলি…। আর এ সবের বাইরে মনের নরম দিকটা ঘেঁষে যে ছোঁয়াচে অসুখের টুকরোটা পড়ে থাকে, তার নাম ‘ভাল্লাগেনা’…। পৃথিবীর কোনও কিছুতেই কিছু ব্যত্যয় না ঘটলেও, চার পাশে সোনাঝুরি রোদের কণা লেগে থাকলেও, কোলের কাছে হরিণছানা খেলে বেড়ালেও কিচ্ছুটি ভাল লাগবে না…। তখন সময় দিতে হয় নিজেকে…। সে সময় জুড়ে রাখতে হয় পাহাড়ের পুরনো ছবি, সমুদ্রের আগাম পরিকল্পনা…। রাখতে হয় কাছের মানুষদের ফোনকল, মায়ের কাছে আবদার করা রান্না…। সে সময় নিজেকে তুমুল ভাল বাসতে হয়…। নিজেই নিজেকে বুকে চেপে ধরে বলতে হয়, সব ঠিক আছে, সব ঠিক থাকবে…। এ অসুখ যেমন অকারণে জড়িয়ে ধরে, তেমনি অকারণেই কখন যে মিলিয়ে যায়, টের পাওয়া যায় না…। আর মিলিয়ে যাওয়ার পর যে ঝকঝকে মনটাকে উপহার দিয়ে যায়, তা বহু দিন ধরে শাসনে রাখে আহ্লাদী মনের বিলাসী অসুখকে…

রিপন ইমরান, সাংবাদিক

চারিদিকে হাসিঠাট্টা, হৈ-হুল্লোড়, হা-হা-হি-হি…স্বচ্ছ কাঁচ ভাঙা গলায় সুন্দরীদের ন্যাকা ন্যাকা গপ্পো… এরই মাঝে দুম করে মনটা খারাপ হয়ে যায়…চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসে…জলে ভেজা টাটকা ঠাণ্ডা হাওয়ার জন্য ফুসফুসে হাসফাঁস কারবার চলে…চোখের সামনের হাসি হাসি মুখগুলোকে অসহ্য মনে হতে থাকে…অকারণেই মাখন রঙা ন্যাকা সুন্দরীর গালে পাঁচ আগুলের দাগ বসাতে ইচ্ছে করে…সুখী সুখী পোষাক পরা মানুষটিকে খুন করতে ইচ্ছে করে…বারবার মনে হয় এমনতো হবার কথা ছিলো না, তবুও কেনো হলো…মাথার ভেতর হাতুড়ি পেটাতে থাকে কেউ অনবরত…শুধু একমুহূর্তের জন্য অথবা অনন্তকাল ধরে… মনের ইচ্ছে মনেই রয়…সন্তর্পনে ভেতরের আমিকে ঢেকে ফেলি দেঁতো হাসির আড়ালে…ঘুনাক্ষরেও কেউ টের পায় না কী ভয়ঙ্কর খেলা চলে মনের ভেতর… আমার প্রায়ই এমন হয়…প্রায়ই…আপনাদের কারো হয়???

ইশতিয়াক নাসির, স্ট্যান্ডআপ কমেডিয়ান

মাঝে মাঝে তো এমন হয় যখন কোন কিছুই ভালো লাগেনা। কেন ভালো লাগছে না, তার কারন জানতেও ইচ্ছে করে না। সেই সময়টা খুব অদ্ভুত। এক ধরনের উদাসীনতায় পেয়ে বসে।হয়ত পরিচিত কারো ফোন আসল রিসিভ করলাম না। অসময়ে ঘুম আসছে না তাও ঘুমানোর জন্য ফুল স্পিডে ফ্যান ছেড়ে কাঁথা মুড়ি দিয়ে ঘুমের ভান করে পড়ে থাকলাম। কানে হেডফোন দিয়ে জোরে জোরে গান শুনলাম। এসব করার পেছনে কোন লজিক নেই, কোন সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্যও নেই। তবে ঠান্ডা মাথায় পরে চিন্তা করলে বুঝতে পারি এসবই নিজেকে একটু বেশি গুরুত্ব দেয়ার জন্য। হয়তো বাইরের জগতে প্রত্যাশা অনুযায়ী প্রাপ্তি হয়নি বলে মন খারাপের যে ডালপালা ভেতরের জগৎটাকে এলোমেলো করে দিচ্ছে, বাইরের জগৎ আমার গুরুত্ব কেন বুঝলোনা বলে যে খারাপ লাগা আমাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে, সেই ভারসাম্যহীন অবস্থার একটা সমাধানের চেষ্টা। খুব বেশি খারাপ লাগলে ঘুরতেও চলে যাই দূরে কোথাও। আসলে একেকজন একেকভাবে এই ‘ভালো না লাগা’র মুহূর্তটাকে পার করে। তবে যাই করিনা কেন, চেষ্টা থাকে এই সময়টা যেন খুব দীর্ঘায়ত না হয়। ভালো না লাগা কিছু সময়ের জন্য ভালো, সব সময়ের জন্য না। মাঝে মাঝে নিজেকে সময় দেয়া, নিজের মধ্যে ডুব দেয়া খুবই দরকার। নিজেকে জানার জন্য, বোঝার জন্যই এটা প্রয়োজন। যদি কেউ ভালো না বাসে, তাহলে নিজেকেই নিজে ভালো বাসতে হবে। মন খারাপের দিনগুলিতে সেই কাজগুলোই করতে হবে যা করতে সবচেয়ে ভালো লাগে। যা খুশি তাই! শুধু খেয়াল রাখতে হবে নিজেকে সুখী করতে যেয়ে কোন অসুখ যেন শরীরে বাসা না বাধে। অনেকে মন খারাপ হলে অন্য কারো সঙ্গে শেয়ার করে, কিন্তু আমি করিনা। কেন জানি ইচ্ছে করে না। কি দরকার? কে জানে, তার হয়ত আমার চেয়ে বেশি মন খারাপ! যাই হোক, সব মিলিয়ে এই ‘কিছুই যখন ভালো লাগেনা’ সময়টা এক হিসেবে ভালোই কাটে আমার! অন্য সময় তো নিজের জন্য এতটা করাও হয়না, ভাবাও হয়না।

তুসা, সাংবাদকর্মী

মেঘের পলেস্তরা খসে পড়া বিকেল শহরে ভিড় ঠেলে তুমি এগিয়ে যাচ্ছ, তোমার আঙুলে পেচানো সুতায় বাধা স্বপ্নবাজ বেলুন হয়ে আমি আকাশমুখী উড়ছি। হাওয়ারা হাত বুলিয়ে দিচ্ছে আমাদের চুলে, আর আলো এসে পথ হারাচ্ছে চোখের অতলে। মন খারাপ হলে আমার কখনো ঘুড়ি হতেও ইচ্ছে করে। কবে একবার পৃথিবীর ছাদে এসে সঙ্গম পরবর্তী দীর্ঘশ্বাস উড়িয়েছিলে আকাশে, বিষন্নতায় ছিড়ে যাচ্ছিল পৃথিবীর বামপাশ, পথ হারিয়ে নদীরা ঢুকে পড়ছিল ঘুমন্ত জনপদে, আর মানুষের উল্লাসে ছিড়ে যাওয়া ঘুড়ি সম্পর্কের সুতা ধরে উড়ে যাচ্ছিল শূন্যতার গহ্বরে। মানুষ এমনই। মানুষ এইসব ভাবে। নারীকে দেবী ভেবে পূজো দেয়, প্রার্থনায় তার ফুরিয়ে যায় রাত। আরেক রাতের মধ্যভাগে সিধ কেটে ঢুকে পড়ে দেবীর শরীরে। হাতের আঙুলে ছুঁয়ে দেখে তার বখে যাওয়া সন্তান। বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে বুনে দেয় ফসলের বীজ, বাতাসের ভাজে ভাজে ছড়িয়ে পড়ে বুণো শষ্যের ঘ্রাণ। এমনই শষ্যের ঘ্রাণ বুকে ধারণ করে তুমি এগিয়ে যাও, তোমার আঙুলে পেচানো সুতায় বাধা স্বপ্নবাজ বেলুন হয়ে আকাশমুখী উড়ে মানুষ, এইসব দেখে দেখে মন খারাপ হলে — আমার কখনো মানুষ হয়ে যেতে ইচ্ছা করে।

স্বাগতা জাহ্নবী