আমার কী অপরাধ ভোগে ভোগা উচিত!!

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

প্রভাতী দাস

(নিউইয়র্ক থেকে): ডাক্তারদের অপেশাদারিত্বের খবরে ভেসে যাচ্ছে ফেসবুক ফিড। চেম্বার বন্ধ, ক্লিনিকে ডাক্তার নেই, নিজের অসুস্থতার দোহাই দিয়ে ডাক্তাররা

লানটয়া এবং এঞ্জেলাঃ আমার প্রিয় দুই রেসপাইরেটরি থেরাপিস্ট

জ্বর/কাশি/হাঁপানির রোগিদের দেখছেন না- পারিবারিক বৈঠক, ফোনের আলাপ…সবখানেই এই এক প্রসংগ। প্রথম কয়েকজনের সঙ্গে সরাসরি আলাপে, বিভিন্ন পোষ্টে বা ইনবক্সে তর্ক করার পর, বোঝানোর আশা ছেড়ে দিয়েছি। এতো সময়ই বা কই আমার।

আমরা ডাক্তারী নামক ‘মানবসেবার মতো মহৎ’ পেশায় আছি বলে যারা নিজেদের নিরাপত্তা বিসর্জন দিয়ে আমাদের রোগীর সেবা দানের কথা বলেন, তাদের জন্য নীচের এই লেখাটি। একটু মনোযোগ দিয়ে পড়ুন, তারপর চোখ বন্ধ করে কয়েক মূহুর্ত ভাবুন…। এর এমবিবিস, এফসিপিএস, এমডি, এমএস পদবী’র পেছনে যারা আছেন তারাও অন্য সবার মতোই রক্তমাংসের মানুষ। আর হ্যাঁ, তারা সেবা দান করেন বলে ইশ্বর তাদের অমরত্ব দান করেনি, দান করেননি অসাধারন কোনো রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও। তারাও আপনাদের মতো নশ্বর। বিশেষজ্ঞ হতে হতে তারাও বয়স্ক হয়, তাদেরও উচ্চ রক্তচাপ, ডায়বেটিস, শ্বাস নালীর অসুখ, হৃদরোগ, ক্যান্সার হয় বা আছে, তাদের অনেকেরই রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অত্যন্ত দুর্বল। COVID19 এর চিকিৎসা দিতে গিয়ে নিজেরাও আক্রান্ত হচ্ছেন, অসুখের সঙ্গে লড়াইয়ে হেরে তারাও প্রতিদিন মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছেন, গত ২৪ ঘন্টায় আমরা চিকিৎসক সমাজ খুব কাছের কয়েকজনকে হারিয়েছি, আমরাও স্বজন হারানোর তীব্র বেদনায় আহাজারি করছি সাধারণ মানুষের মতো।

ল্যাব টেকনিশিয়ান

রোগ সম্পর্কে জানি বলে, চিকিৎসা দিতে জানি বলেই আমি অবিনশ্বর নই, রোগের কাছে অপ্রতিরোধ্যও নই। তাই যথাযথ পার্রোনাল প্রোটেক্টিভ ইক্যুইপমেন্ট ছাড়া কাজে যেতে আমিও ভয় পাই। আমিও প্রতিদিন কাজে যাবার আগে অনেক কিছু ভাবি। সোশ্যাল ডিস্ট্যান্সিং বজায় রেখে রোগী দেখতে চেষ্টা করি, অফিসের ঘন রোগীসমাগম থেকে যাতে রোগ না ছাড়াতে পারে তাই চেম্বার বা অফিসে সরাসরি রোগী দেখা বন্ধ করে দিয়েছি। আমি নিজেকে সাহসী বলেই জানি, তবুও হাসপাতাল থেকে কল এলেই বুক কেঁপে ওঠে আজকাল। ডায়ালাইসিস অথবা নন ডায়ালাইসিস, একিউট কিডনি ইনজুরি না ক্রনিক কিডনি ডিজিজ; তারচেয়ে বড় প্রশ্ন, ‘COVID19 পজিটিভ’ অথবা ‘নেগেটিভ’। সপ্তাহ দু’য়েক আগে হলে প্রশ্ন না করেও ধরে নেয়া যেতো, COVID19 নেগেটিভ। আর এখন প্রশ্ন না করেও ধরে নেওয়া যায় COVID19 পজেটিভ; গত কয়েকদিনে পরিসংখ্যান বদলে গেছে এতোটাই। আরো অনেক কিছু বদলেছে! আমার সহকর্মীরাই ভর্তি হচ্ছেন হাসপাতালে, মঙ্গলবার একজন ইন্টারনিষ্ট, বুধবার একজন গ্যাস্ট্রোএন্টেরোলজিস্ট ভর্তি হয়েছেন আমারই হাসপাতালে। স্পেশালিষ্ট বলে নিজে বাড়তি সুরক্ষায় আছি বলে ভেবেছিলাম, সেই নিশ্চয়তাটুকুও এখন নড়বড় । আমি করোনা আক্রান্ত হলে, আমার কর্মক্ষেত্র- দুইটি হাসপাতাল, ৪টি ডায়ালাইসিস সেন্টার, অফিসের কয়েক হাজার রোগীর চিকিৎসা কে দেবে! আমার অন্য কলিগ যিনি আছেন, তার পাত্রও আরো পূর্ণ বই শূন্য নয়। অসাবধানতার জন্য অসুস্থ হলে এরাই অতিরিক্ত কাজের বোঝা সামলাতে না পেরে বা প্রয়োজনের সময় ডাক্তারের দেখা না পেয়ে আমাকে অভিশাপ দেবেন নিশ্চিত! আর সন্তান, স্বামী বা পরিবারের অন্যদের কথা… অকালে চলে গিয়ে তাদের প্রতি দায়িত্বের পালনে ব্যর্থতা…তারাও সবাই কী আমাকেই অভিশাপ দেবে না …।

রেনাল ফিজিশিয়ান্স এসোসিয়েশন( RPA) মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহেই শুধুমাত্র শারীরিক পরীক্ষার জন্য COVID19 পজিটিভ রোগীর ঘরে ঢুকে নেফ্রোলজিস্টদের নিজেদের COVID19 আক্রান্ত হবার ঝুঁকি নিতে মানা করে বরং ইন্টারনিষ্ট বা ক্রিট্যিক্যাল কেয়ার স্পেশালিষ্ট শারীরিক পরীক্ষার উপর নির্ভর করতে বললেও, শারীরিক পরীক্ষার ছাড়া রোগ দেখার সময় প্রচন্ড অপরাধ ভোগে ভুগেছি। ডায়ালাইসিস কোম্পানিগুলো থেকে সেন্টারে না গিয়ে আইপ্যাড, আই ফোন/স্মার্ট ফোন বা মাইক্রোসফট টিম মিটিং এর মাধ্যমে রোগী দেখতে বললেও, সরাসরি রোগীদের দেখতে না পারার অপরাধ ভোগে ভুগবো না বলে স্বশরীরে ডায়ালাইসিস সেন্টারে গিয়েছি। গত সপ্তাহের আগে যে কোনো একটা মাস্ক হলেই রোগীর ঘরে ঢুকে পরতে যে আমি দু’বার ভাবতাম না অনেকগুলো নেগেটিভ রোগীদের আবার পজেটিভ হয়ে ওঠার ঘটনা সেই আমি-ই যথাযথ পিপি-ই না পেয়ে রোগী শারীরিক পরীক্ষার না করেই চিকিৎসা/পরামর্শ দিয়ে বেরিয়ে এসেছি। এখন নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে N-95 মাস্ক ছাড়া আর কোনো রোগীর ঘরেই ঢু্কবো না সিদ্ধান্তের জন্য আমার কী অপরাধ ভোগে ভোগা উচিত!!

ছবি: লেখকের ফেইসবুক থেকে

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]