আমার কোনো ভয় নেই তো…

নাগরিক জীবনকে তো কবেই তকমা দেয়া হয়েছে বিচ্ছিন্নতার ভবিষ্যত বলে।কবি সমর সেন সেই কবে লিখেছিলেন কবিতায়, ‘শহর, হে ধূসর শহর…’। শহর তার আপন নিয়মেই ধূসর। যন্ত্র আর যান্ত্রিক জীবন তাকে দিনে দিনে ধূসর করে। নির্যাতনের কেন্দ্রে ঠেলে দেয় বাসিন্দাদের। কিন্তু সেই বাসিন্দারা কি সবাই সচেতন শহরবাসের কারাগার নিয়ে? সেখানে কী অসীম ঐশ্বর্য, কী অনন্ত সেই কারাগার! নাগরিকদের জীবন যন্ত্রের মতো। নগরজীবন যেন তাদের রক্তপান করে ভোরবেলা জেগে ওঠে আবার রাত্রিতে ঘুমাতে যায়।

সাম্প্রতিক সময়ে মানুষের বেঁচে থাকার রাজনীতিতে নতুন অনুপ্রবেশকারীর নাম ভয়। একদা মানুষ ভয় পেতো ছেলেধরার নাম শুনলে, ভয় পেতো তেলাপোকায়, ভয় পেতো চোর। আর এখন ভয় কোথায় নেই? কিছু একটা গুজব শুনলেই আঁতকে উঠছে মানুষের অন্তরাত্মা, ইন্টারনেটে কোনো একটা সংবাদ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটা পোস্ট এক লহমায় মনের মধ্যে হাজির করে ভয়ের দানব।হঠাৎ মনে হলো বাড়ির আশপাশে ঘোরাঘুরি করছে অচেনা লোক, অথবা ধারণা তৈরি হলো কেউ অনুসরণ করছে। ব্যাস, ভয় তার বিশাল সংসার নিয়ে এসে হাজির। চেপে বসছে সে মনের মধ্যে। ভয়ের সন্দেহে মানুষ মানুষকে পিটিয়ে মেরেও ফেলছে। নগর জীবনের অভিশাপ বলবো একে? এবার প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজনে রইলো ‘বেশি ভয় পাচ্ছি?’।

মনস্তাত্ত্বিকরা মানুষের কাল্পনিক ভীতির কথা বলতে গিয়ে বলছেন, ইদানীং বেশিরভাগ মানুষ তাদের কাছে এসে বলছেন, তাদের মনে হচ্ছে কেউ যেন সর্বদা তাদের অনুসরণ করছে। অন্য মানুষ পেছনে ষড়যন্ত্র করছে এমন সন্দেহ আর এই বিশ্বাস নিয়ে অভিযোগ নতুন নয়।মানুষের মনের কল্পনা আর দু:শ্চিন্তা মিশে গিয়েই তো তৈরি হয়  ভয়। তাই এ ধরনের বিশ্বাস সহজেই মানুষের মনে ভীতি উৎপাদন করে। যা নতুন তা হলো সেই অনুসরণকারীর চরিত্রটি। সমাজে ক্রমাগত ঘটে যাওয়া নানান ধরণের ঘটনা, নতুন নতুন ভয়ের চরিত্র বদলে দিচ্ছে তেলাপোকা অথবা ছেলেধরামার্কা ভয়ের সংজ্ঞা। এই নাগরিক ভয় এখন একটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। মধ্যবিত্ত নাগরিক দেশের বহুবিধ সমস্যা নিয়ে আর ততটা চিন্তিত নয়, যতটা চিন্তিত নিজের নিরাপত্তা নিয়ে। নিরাপত্তার এক প্রাইভেট ইন্ডাস্ট্রি গড়ে উঠেছে, তাদের কাছেই মানুষ নিরাপত্তা কিনছে।

আজকে সাধারণ মানুষের সংস্কৃতিতে সবচেয়ে বিপজ্জনক দিকটি হলো দৈনন্দিন ভয়ের রাজনীতি।ভয়ের কোনো কারণই এখন বিরাজমান নেই বললে মিথ্যা বলা হবে। জঙ্গী সন্ত্রাস তাড়া করে ফিরছে, ব্যাংকে জমানো সঞ্চয় লোপাট হচ্ছে, মানুষ খুনের জন্য পথে নামছে অজ্ঞাতনামা আততায়ী। ইন্টারনেটের সামনে বসে থাকা সন্তান ভুল পথে পা বাড়াচ্ছে-ভয় তো আছেই।  কিন্তু ভয়ের সত্যিকার কারণের সঙ্গে জুড়ে গেছে ভয়ের ছায়া। সেই ভয়ের ছায়াই তৈরি করছে মানসিক জটিলতা।

রক্ত হিম করা, স্নায়ু বিপর্যস্ত করা, নিরাপত্তাহীন, বিপজ্জনক শহরের অনেক রাস্তা পরিহার করতে হবে; এই ধরনের জায়গায় যাওয়া নিরাপদ নয়, এমন ধরণের ঘোষণা প্রায়শই শুনতে হয়।এই সাবধানবাণীগুলোই তৈরি করে দিচ্ছে ভয়ের কারাগার। নাগরিকরা দশগুণ ভয়ে কুঁকড়ে গিয়ে গুটিয়ে নিচ্ছে নিজেদের। কেউ বলতে পারেন, এ হলো এক সামাজিক বিকার। কিন্তু আসলেই কি তাই? এই বিকার কিন্তু মনের বিকার নয়। এর পরিণাম হলো সংলাপের জায়গা ফুরিয়ে আসছে ক্রমশ। আমরা মানুষের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করার বদলে পালিয়ে যাওয়ার কৌশল আয়ত্ব করে ফেলেছি। এক সময় উদ্বিগ্ন পিতামাতা তাদের সন্তানদের বলতেন, ‘অচেনা মানুষের সঙ্গে কথা বলবে না’।এখন তারা বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অচেনা লোকের সঙ্গে বন্ধুত্ব না করার কথা। মজার ব্যাপার হচ্ছে,  এই উক্তিগুলো, এই সাবধানবাণীগুলো এখন বয়স্কদেরও স্বাভাবিক জীবনযাপনের স্ট্রাটেজি। মনের বিজ্ঞানীরা বলছেন, এতে করে দৈনন্দিন জীবনে অংশগ্রহণ করার দক্ষতা মানুষ আর শিখতে পারছে না। প্রাচীরের ভেতরে আবদ্ধ আবাসিকই আজ তাই কমিউনিটির সংজ্ঞা পায়। কমিউনিটি রক্ষণের অর্থ হলো সশস্ত্র গেটকিপার নিয়োগ করা, যে বা যারা অন্যদের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করবে। আর এমন চিন্তার সূত্র ধরে বিভিন্ন এলাকায় নিরাপত্তার খাতিরে বসছে নজরদারি। একই ধরনের জীবনের মধ্যে আপস-আলোচনার বদলে পৃথকীকরণ হলো আজকের মেট্রোপলিটান মন।

সমাজতাত্ত্বিক রিচার্ড সেনেট শহর সম্বন্ধে এক অসাধারণ উক্তি করেছেন। তিনি বলেছেন, শহর হলো সেই জায়গা যেখানে একজন অচেনা মানুষ আরেকজন অচেনা মানুষের সঙ্গে মিলিত হয়। এ ধরণের সাক্ষাতের আর কোনো যোগসূত্র থাকে না। আমরা দ্রুত ভুলে যাই একে অপরকে। অচেনা ভয় আর বিশ্বাসহীনতা এখন দুজন মানুষকে আর সম্পর্কের বন্ধনে আবদ্ধ হতেও দেয় না। অচেনা মানুষ অচেনা-ই রয়ে যায়। এমন এক নকল জীবন আমরা নগরে বয়ে বেড়াই বলেই হয়তো মানুষ আস্থা হারাচ্ছে অন্য মানুষের ওপর। আর তাতেই সূচনা ঘটেছে বিচ্ছিন্নতার যুগের।

এই সংযোগহীনতা থেকেই হয়তো নাগরিক মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করেছে ‘ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব’।সন্দেহ আর ভয়মাখা নানা কল্পনা, দুশ্চিন্তা আর ভয় ঢুকে পড়ছে আমাদের সাধারণ মানুষের অন্দরমহলে। আর তাতেই নিরপত্তা নিয়ে মানুষের মনের মধ্যে তৈরি হচ্ছে অবসেশন। এই ভয়েরও কিন্তু একটা রাজনীতি আছে। এই রাজনীতি হলো আরও বেশি সিসিটিভির মাধ্যমে নজরদারি, আরও বেশি পুলিশ নিয়োগ প্রভৃতি দাবি। এক নিরাপত্তা ইন্ডাস্ট্রি গড়ে উঠেছে এবং তা আরও প্রসারিত হচ্ছে। এমন নতুন বাড়ির ক্ষেত্রে নিরাপত্তা যে কত সুদৃঢ় সেটা বিজ্ঞাপিত করতে বলা হচ্ছে। এখানে শুধু গেট আর পাহারাদার নেই, ফ্ল্যাটের নিরাপত্তা সব চেয়ে আধুনিক মোবাইল টেকনোলজির সঙ্গে যুক্ত, যার ফলে অফিসে বসে নিজের মোবাইলে আপনি আপনার ফ্ল্যাটে কী ঘটছে তা দেখতে পারেন। শক্ত প্রাচীর, উঁচু গেট, মজবুত নিরাপত্তা ব্যবস্থা, চব্বিশ ঘণ্টার নিরাপত্তারক্ষী দিয়ে মানুষ যে অনধিগম্য দ্বীপ তৈরি করেছে, এই দ্বীপের বাসিন্দাদের সঙ্গে সে অবশ্য স্বচ্ছন্দে স্বাধীন ভাবে কথাবার্তা বলতে পারে। কিন্তু সেখানেও তো আবার রুটিন কথার বিনিময়। স্বপ্নের বিনিময় কি সেখানে ঘটছে? এই সংযোগচ্যুতি তো মানুষে-মানুষে ভেঙে যাওয়া বন্ধনের দাম ছাড়া আর কিছুই নয়।

ইরাজ আহমেদ

ছবিঃ গুগল