আমার চাচা শহীদ ডক্টর শামসুজ্জোহা

রেজাউর রহমান

আজ শহীদ জোহা দিবস I ১৯৬৯ সনের ১৮ ফেব্রুয়ারী , রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বজন প্রিয় শিক্ষক ডক্টর শামসুজ্জোহাকে পাকিস্তানী সৈন্যরা প্রথমে গুলি করে, তিনি গুলিবিদ্ধ অবস্থায় কিছুদূর যাওয়ার পর মাটিতে পড়ে যান তখন লেফটেনান্ট হাদি তার বুকে ও পেটে বার বার বেয়নেট চার্জ করে তাকে মারাত্মক ভাবে আহত করে ওর তার দেহটা টেনে হিচড়ে নিয়ে রাস্তার পাশে ফেলে দেয় I ছাত্ররা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরেও তিনি বেঁচে ছিলেন, বেয়োনেটের আঘাতে তার শরীর ক্ষতবিক্ষত হয়ে গিয়েছিলো , চিকিৎসকরা সাধ্যমত চেষ্টা করা সত্ত্বেও অপারেশন টেবিলে তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন I

জোহা চাচা ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী, প্রাণবন্ত , আধুনিক ও নিষ্কলুষ মনের একজন মানুষ I তিনি সহজেই বড় ছোট সকলকে আপন করে নিতে পারতেন I জোহা চাচা ছিলেন আমাদের খুব প্রিয় , আমার বাবা আর মা তাকে খুব ভালোবাসতেন I চাচা বাসায় আসা মানেই আনন্দI তিনি ছিলেন খুবই জনপ্রিয় একজন শিক্ষক কারণ ছাত্রদের সঙ্গে তার সম্পর্ক শুধু শিক্ষাদানে সীমাবদ্ধ ছিলোনা তিনি তাদের সঙ্গে বিভিন্ন খেলায় অংশ নিতেন, নানা বিষয়ে গল্প করতেন, তাদের প্রক্টর হিসেবে সব সময় তাদের ভালো মন্দের দিকে নজর রাখতেন I ৬৯ এর গণআন্দোলনে আহত, রক্তাক্ত ছাত্রদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য যখন এম্বুলেন্স পাওয়া যাচ্ছেনা তখন তিনি নিজে তার ভোক্সওয়াগানে তাদের নিয়ে হাসপাতালে গেছেন I তখন আয়ুব খানের স্বৈরশাসন , দেশ জুড়ে সান্ধ্যআইন আর পাকিস্তানী সৈন্য , পুলিশ আর ইপিআরের জুলুম, সেই সময় জোহা চাচা তার চাকুরীর তোয়াক্কা করেন নাই , তিনি ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়েছে , বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনে শরিক হয়েছেন , শিক্ষকদের মিছিলে তিনি ছিলেন অগ্রভাগে I

১৮ ফেব্রুয়ারী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে ক্যাম্পাস থেকে রাস্তায় বার হলে পাকিস্তানী সৈন্যরা তাদের উপর গুলিবর্ষণের প্রস্তুতি নেয় , জোহা চাচা তখন সৈন্য ও ছাত্রদের মাঝে অবস্থান নেন ও সৈন্যদের দলপতির উদ্দেশে হাত তুলে বলেন ” Please don’t open fire on my students , I am giving you word that they will return to campus right now”. এর পরে তিনি ছাত্রদের নির্দেশ দিয়ে অনুরোধ করে ক্যাম্পাসে ফিরত পাঠাতে সক্ষম হন , ছাত্রদের প্রত্যাবর্তনের শেষ মুহূর্তে তিনি যখন ক্যাম্পাসের গেটের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন তখনি পাকিস্তানী সৈন্যদের দলপতি তাকে গুলি করার নির্দেশ দেয় , এটা ধারণা করা হয় যে ছাত্রদের উপর তার প্রভাব দেখে সৈন্যের দলপতি চাচাকে ছাত্রদের মূল চালিকা শক্তি বলে মনে করে ও তাকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেয় ১৯৬৯ , ১৮ ফেব্রুয়ারী ডক্টর জোহার হত্যাকাণ্ডের সংবাদ প্রচারিত হওয়ার সাথে সাথে সারা বাংলাদেশে মানুষ স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে সান্ধআইন আর সেনাবাহিনীর গুলি উপেক্ষা করে রাস্তায় নেমে আসে তার আত্মদান ৬৯’ গণআন্দোলনকে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যায় ফলে আয়ুবশাহী ২১ ফেব্রুয়ারী আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা তুলে নেয় ও ২২ ফেব্রুয়ারী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিঃশর্ত মুক্তি প্রদান করে জোহা চাচাকে আমি কখনো ভুলতে পারি নাই তাই ১৯৮৬র ফেব্রুয়ারী মাসে আইন আদালত অনুষ্ঠানে আমি তার হত্যাকাণ্ডের উপর একটি বিশেষ তথ্যমূলক প্রতিবেদন প্রচার করেছিলাম I পরিতাপের বিষয় যে বাংলাদেশ টেলিভিশনের কতিপয় অসাধু, দায়িত্বজ্ঞানহীন কর্মকর্তার অবহেলার কারণে আরো অনেক প্রতিবেদনের মতো এটির কোনো অস্তিত্ব আর নেই I

পরবর্তীতে আমি আমার সম্পাদিত পত্রিকা “এখনই সময়” এ জোহা চাচার উপর একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করে ছিলাম I এই প্রতিবেদন প্রকাশে আমাকে মূল্যবান সাহায্য করে ছিলেন আমাদের পত্রিকার রাজশাহী প্রতিনিধি আবু সালেহ মহম্মদ মুসা (রাজু) I আমার অনুরোধে ২০১৪তে তিনি কয়েকটি দুর্লভ ছবি আমাকে পাঠিয়েছিলেন যা আমি এখানে প্রকাশ করেছি

জোহা চাচা নেই, কিন্তু তার আদর্শ বাংলাদেশের মানুষ চিরকাল মনে রাখবে, অনুসরণ করবে সেই আশা নিয়ে আমি এই মৃত্যুঞ্জয়ী মহাপ্রানকে স্মরণ করছি