আমার চিরায়ত প্রভাতফেরী আমাকে ফিরিয়ে দিন

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ড.সেলিম জাহান

(নিউইয়র্ক থেকে): কাল অমর একুশে। না, একুশে ফেব্রুয়ারী নিয়ে কোন গুরুগম্ভীর রচনা লিখতে বসিনি, স্মৃতিচারনও আমার উদ্দেশ্য নয়, আমি শুধু ক’টা কথা কইতে চাই। উচ্চমার্গের কোন বক্তব্য নয়, সেরেফ সাদামাটা কিছু কথা মাত্র।

কেউ বলেনি, কেউ নির্দেশ দেয়নি, কেউ সাজায়নি, কিন্তু সেই প্রথম থেকেই একুশ উদযাপনের সবচেয়ে পবিত্রতম দিক ছিল প্রভাতফেরী – একুশে ফেব্রুয়ারী ভোরের আলো ফুটলেই স্বত:স্ফূর্ত নগ্ন পদযাত্রা মানুষের শহীদ মিনারের উদ্দেশ্যে। কেউ একা একা, কেউ পরিবার নিয়ে, কখনও বা যুথবদ্ধভাবে। ভোরের আলো ফুটছে, মানুষের শান্ত মিছিল চলছে ধীর পায়ে শহীদ মিনারের প্রতি, পুরুষদের পরিধানে পাজামা-পাঞ্জাবী, নারীদের সাদা শাড়ী, কালো পাড়। হাতে ফুলের মালা, পুস্পস্তবক। শিশুরাও আছে মা-বাবার হাত ধরে, তাদের কচি হাতেও ফুল।

সবার কণ্ঠে ধ্বণিত হচ্ছে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো একুশে ফেব্রুয়ারী, আমি কি ভুলিতে পারি’? সে অমর গান ছড়িয়ে পড়ছে আকাশে-বাতাসে। কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসছে আবেগে, সে গানের অনুরণন আমাদের প্রতি রোমকূপে – সে এক অনন্য অনুভূতি।

বড় মায়ায়, অনেক শ্রদ্ধায় আমরা হাতের ফুল নামিয়ে রাখছি মিনারের বেদীতে। না, ধাক্কাধাক্কি নেই, আগে যাবার প্রতিযোগিতা নেই, ছবি তোলার উদ্দামতায় একুশকে অবমাননা করার কোন প্রচেষ্টা নেই। শহীদ মিনার থেকে আজিমপুর গোনস্থান শহীদদের সমাধিস্থলে। সেখানেও সারিবদ্ধ মানুষ ধীর নগ্ন পদযাত্রায়। শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার ছাপ প্রতিটি মানুষের মুখে একটি পবিত্র কাজ সম্পন্ন করার প্রক্রিয়ায়। আজিমপুর থেকে গন্তব্যস্থল বাংলা একাডেমী।

আমাদের কৈশোরে যৌবনে এটাই তো দেখেছি একুশে ফেব্রুয়ারীতে। বাহুল্য নেই, বানিজ্যিকতা নেই, রাজনীতি নেই – আছে শুধু ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা আর মমতা, বাংলা ভাষার প্রতি অপার মায়া আর নিজের ভাষার প্রতি দৃঢ অঙ্গীকার।

একুশে ফেব্রুয়ারীতে প্রভাতফেরীতে যাওয়া আমাদের কাছে ছিল প্রার্থনার মতো। বড় পবিত্র সে নগ্ন পদযাত্রা। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে দেখেছি সে প্রভাতফেরীতে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে তাঁর ছাত্রজীবনে দেখেছি সে প্রভাতফেরীতে। একুশ শুরুই হতো প্রভাতফেরী দিয়ে। সে প্রভাতফেরীর আমেজ পেতে চাইলে বর্তমান প্রজন্ম শহীদ জহির রায়হানের ‘জীবন থেকে নেয়া’ ছবিটি দেখতে পারেন।

আমি বহুকাল প্রভাতফেরীতে যাই না। আসলে বিশের মধ্যরাতে একুশ শুরু হলে তার আর কোন প্রভাতফেরী থাকে না। আমরা ভুলে যাই, মধ্যরাতে দিনের শুরু পাশ্চাত্য কায়দায়, প্রাচ্যে দিনের শুরু সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে। বাঙালীর দিনের শুরু উষা লগ্নে।

একুশ আমাদের মুক্তি দিয়েছিলো – মুক্তি দিয়েছিলো চাপিয়ে দেয়া রাষ্ট্রভাষার শৃঙ্খল থেকে। কিন্তু সেই মুক্তিদাত্রী একুশকে আজ আমরা বন্দী করেছি বানিজ্যিকতায়, স্থূলতায়,লৌকিকতায়,আনুষ্ঠানিকতায়, আত্মপ্রচারে। আমরা নষ্ট করেছি তার স্বত:স্ফূর্ততা, তার গাম্ভীর্য্য আর তার পবিত্রতা। এবারের একুশে আমার একটিই কেবল আকুল আবেদন, ‘একুশকে মুক্তি দিন সব আরোপিত কৃত্রিম শৃঙ্খল থেকে এবং আমার চিরায়ত প্রভাতফেরী আমাকে ফিরিয়ে দিন’।

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]