আমার চেনা দেরা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এস এম এমদাদুল ইসলাম

রাস্কিন বন্ড ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত ভারতীয় লেখক। বন্ডের জীবনের বেশির ভাগ সময় কেটেছে হিমালয়ের পাদদেশে পাহাড়ী ষ্টেশনে। তাঁর প্রথম উপন্যাস “দ্য রুম অন দ্য রুফ” তিনি লিখেছিলেন ১৭ বছরবয়সে এবং এটি প্রকাশিত হয়েছিলো যখন তার বয়স ২১ বছর। তিনি তার পরিবার নিয়ে ভারতের মুসৌরিতে থাকেন। Our Trees Still Grow in Dehra লেখার জন্য ১৯৯২ সালে তিনি সাহিত্য অ্যাকাডেমি পুরষ্কার পান। ১৯৯৯ সালে পদ্মশ্রী এবং ২০১৪ সালে পদ্মভূষণ পুরষ্কারে ভূষিত হন। তিরিশটির বেশি উপন্যাস লিখেছেন তিনি। লিখেছেন প্রচুর নিবন্ধও। রাস্কিন বন্ডের উপন্যাস ‘অল রোডস লিড টু গঙ্গা’ একটি আলোচিত উপন্যাস। প্রাণের বাংলায় এই উপন্যাসের ধারাবাহিক অনুবাদ করেছেন  এস এম এমদাদুল ইসলাম। ‘হিমালয় ও গঙ্গা’ নামে উপন্যাসের ধারাবাহিক অনুবাদের শেষপর্ব আজ প্রকাশিত হলো।

আজ যেটা দেরাদুন, তা আমাদের ছোটোবেলায় চল্লিশ-পঞ্চাশের দশকে ছিলো শুধু দেরা। এখানেই আমার শৈশব, কৈশোর ও যৌবনের বেশিরভাগ সময় কেটেছে, আমার অনেক গল্পে এই দেরা সম্পর্কে লিখেছি।
সেই দেরা আজকের দেরাদুন থেকে বেশ আলাদা ছিল বটে,অনেক ছোটো, অনেক বেশি সবুজ, জনসংখ্যা ছিলো অনেক কম, চুপচাপ এবং একটু পিছিয়ে থাকা ধরনের।মানুষজনের সহজ-সরল জীবনযাত্রা, আড্ডাবাজি পছন্দের, কিন্তু পরচর্চা কম। সময়টা ছিলো বাইসাইকেল ও ঘোড়া-টানা টাঙ্গার। হাতেগোনা কয়েকটা মোটরগাড়ি; কোনো ত্রি-চক্রযান ছিলোনা। আর বছরের যে কোনো সময়ে, দিনে বা রাতে, বলতে গেলে যে কোনো জায়গায় হেঁটে যেতে পারতেন আপনি।
আমার দেখা দেরা-কে আমি সময়ানুযায়ী তিনটি পর্বে ভাগ করতে পারি। আমার শৈশবের দেরা, যখন আমি ‘ওল্ড সার্ভে রোড’-এর বাড়িতে আমার মাতামহের সঙ্গে থাকতাম। ওই বাংলোটির এখন আর তেমন কিছু অবশিষ্ট নেই। আমার স্কুলবেলার দেরা-যখন ছুটিতে বাড়ি আসতাম মা আর আমার সৎ বাবার সঙ্গে থাকতে। প্রায় প্রতিবারই এসে দেখতাম এক নতুন বাসা,আমার ইংল্যান্ড যাবার আগমুহুর্ত্ত পর্যন্ত এমনই দেখেছি। আর আমার ভারত-প্রত্যাবর্তনের পরের দেরা। এ্যাস্ট্লি হল্-এর উপরে আমার নিজের ছোটো ফ্ল্যাটে থাকতাম আমি, যেখানে থেকে আমার সেরা গল্পের অনেকগুলোই লিখেছি।
ইংল্যান্ডে থাকা কালে আমি আমার প্রথম উপন্যাস, ‘দি রুম অন দ্য রুফ’ লিখেছি। সেটা আমার ফেলে আসা দেরা, সেখানকার মানুষজন, আমার কিশোর বন্ধু-বান্ধব- যাদেরকে আমি ভালবাসতাম, পছন্দ করতাম, তাদেরকে নিয়ে লেখা। জানি এটা একটা অপরিপক্ক লেখা, কিন্তু সেটা ছিলো একটা সতের বছরের তরুণের সরাসরি হৃদয়-উৎসারিত আবেগানুভূতির কথা। লেখাটি যদি আজো সতেজতায় পূর্ণ মনে হয় তো তার কারণ হবে এই যে ওটা স্বতঃস্ফূর্ত, অপরিশীলিত।
দেরায় ফিরে এসে আমি ধারাবাহিক কিছু লিখেছি ‘উপত্যকার ভবঘুরেরা’- এরকম। তেমন ভালো কিছু হয়নি, তবে ওতে পঞ্চাশের শুরুর দিকের দেরা ও দুন উপত্যকার জীবনযাত্রার কিছুটা উঠে এসেছে।
একুশ বছর বয়সে আমি ভারত, তথা দেরায় ফিরে আসি এবং বিবিজির মুদির দোকানের উপরতলায় প্রকৃতপক্ষে আমার লেখালেখির দোকান খুলে বসি।
বিবিজি আমার সৎ বাবার প্রথমা স্ত্রী। সৎ বাবা ও আমার মা দিল্লি চলে গেছেন, বিবিজি রয়ে গেছেন তাঁর এই দোকান নিয়ে। তাঁর সঙ্গে আমার সুসম্পর্ক ছিলো, আমি তাঁকে তাঁর হিসাবপত্রে সাহায্য করতাম, আর তিনি আমাকে দিয়েছিলেন দোকানের উপরে ঘর- থাকা ও ব্যবহারের জন্য। এরকমটা বোধহয় একমাত্র ভারতেই সম্ভব মা ও ভারতীয় সৎ বাবার সঙ্গে মিলে চলতে অক্ষম, কিন্তু সেই বাবার পরিত্যক্ত স্ত্রীর সঙ্গে বসবাস সম্ভব হচ্ছে একজনের পক্ষে।
বিবিজি চমৎকার পরাটা, শালগমের আচার, মুলার ঝাঁঝালো সস-এসব বানাতে পারতেন। ফলে আমি দারুণ রোম্যান্টিক হওয়া সত্ত্বেও আমাকে ঠিক চিলেকোঠার আধপেটা কবি ঠাওরাবার কিছু নেই। বিবিজিকে নিয়েও মন খারাপ করা নিষ্প্রয়োজন, তিনি দেরার প্রথম মহিলা দোকানি, এবং ব্যবসাটি চালাচ্ছিলেন ভালোই।
বিবিজি বয়সে অবশ্য বেশ বড়ো আমার চেয়ে, মজবুত গড়ন, বলশালী এক মহিলা। ময়দার ভরা বস্তা তিনি দোকানের এখানে ওখানে ছুড়ে ফেলতে পারতেন। তাঁর দুষ্ট ছেলেটা তাঁর হাতের নাগালের বাইরেই থাকতো; কানের কাছে এক থাবড়ায় সে মেঝেতে গড়াগড়ি খেতো। তাঁর হার্নিয়ার সমস্যা ছিলো, ইংল্যান্ড থেকে তাঁর জন্য একটা হার্নিয়া-বেল্ট আনার কারণে তিনি আমার প্রতি বিশেষ কৃতজ্ঞ ছিলেন। ওই বেল্টটি তাঁকে বেশ আরাম দিতো।
খুব ভোরে উঠে তিনি বাজারে যেতেন তাঁর দোকানের মালামাল (চাল, আটা, ডাল, ইত্যাদি) পাইকারি কিনতে, কখনো কখনো আমিও যেতাম তাঁর সঙ্গে। এভাবে আমি নানান ধরনের ডালের নাম শিখেছি- মুগ, মালকা, অড়োহর, মসুরি, চানা, লবিয়া, রাজমা, ইত্যাদি। তাসত্ত্বেও রান্নার বই লেখা বা কোনো রেশনের দোকান চালাবার অভিপ্রায় কখনো আমার হয়নি।
গল্পের উপাদান পাকিয়েই আমি বেশ ছিলাম। আমার গল্পের বেশিরভাগই সন্ধ্যার পরে কেরোসিন বাতি জ্বালিয়ে লেখা হতো। বিবিজি ক্রমশ জমে যাওয়া বকেয়া বিদ্যুত বিল পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় লাইন কাটা গিয়েছিলো। এটা আমার জন্য বড়ো কোনো সমস্যা ছিলোনা। মোম বা প্রদীপের আলোয় আমার জীবন দিব্যি কেটেছে। বরং মোমের আলো আমার লেখক জীবনে কিছুটা রোম্যান্টিকতার ছোঁয়া দিয়েছে।
প্রথমদিকের গল্পগুলোতে রোম্যান্টিকতা রয়েছে বেশ। ‘দি আইজ আর নট্ হিয়ার’ গল্পের রেলগাড়ির মেয়েটি, এবং দিওলি স্টেশনের প্লাটফর্মে মেয়েটির ঝুড়ি বিক্রয়, দিলারাম বাজারের পিছনে মারাম খালার প্রেমকাহিনি, ইত্যাদি। সে যাই হোক, আমার পাঠক-পাঠিকাদেরকে আমার দেখা দেরা-এর সঙ্গে পরিচয় করাতে চেয়েছি, ওই সংকলনের সব কাহিনিই দেরাদুন বা তার আশে পাশের জায়গা নিয়ে। তখনকার লেখা ছিলো যারা আমার লেখা পড়বেন তাদের সবার জন্য। ছোটোদের জন্য লিখতে শুরু করেছি অনেক পরে।
আমার গল্পে উল্লেখিত প্রিয় কিছু স্থানের মধ্যে ছিলো, প্যারেড গ্রাউন্ড বা ময়দান, পল্টন বাজার ও তার আশ পাশ, দালানওয়ালার লিচু-বাগান, চা-বাগান, রাজপুর রোড-এর উপরের দিকে (এখন শপিং-মলে রূপান্তরিত), রাজপুরের কাছে শালবন, দেরায় ঢোকার সড়কপথ বা রেলপথ, এবং অবশ্যই রেলওয়ে স্টেশন, যা এখনো মোটামুটি একইরকম আছে।
আমি যখন ছোটো, তখন অনেক বাংলোর (যেমন আমার পিতামহ যেটা বানিয়েছিলেন) সঙ্গেই বড়ো মাঠ থাকতো- সামনের দিকে ফুলের বাগান, আর পেছনে ফলের বাগান। লিচু ছাড়া আর যেসব ফলগাছ বেশি দেখা যেতো সেগুলো হলো, পেঁপে, পেয়ারা, আম, লেবু, বাতাবিলেবু, এক ধরনের আঙুর, ইত্যাদি। সে সব খোলা জায়গাওয়ালা বাংলো ভেঙে এখন হয়েছে হাউজিং-এস্টেট। ১৯৫০ সালের ৫০,০০০ বেড়ে দেরার জনসংখ্যা এখন হয়েছে সাত লক্ষর উপরে। ফলগাছের জন্য যথেষ্ট জায়গা আজ আর অবশিষ্ট নেই!
কিছু গল্প, যেমন ‘এ হ্যান্ডফুল অব নাট্স’ এবং ‘লিভিং উইদাউট মানি’ দেরা ছেড়ে আসার অনেক পরের লেখা, কিন্তু তাও দেরার প্রভাব ওই গল্পগুলোতেও বেশ স্পষ্ট। কোনো লেখক যখন তার জীবনের অতীতে ফিরে যান কোনো নির্দিষ্ট স্থান বা কালের অনুসন্ধানে তখন তিনি সেখান থেকে সেই জায়গা ও অভিজ্ঞতার নির্যাসটুকু ছেঁকে নিতে চান।
বিবিজির উপরতলায় অবস্থানের (১৯৫৬-১৯৫৮) দু’বছরে সখের লেখক হিসেবে তিরিশটার উপরে গল্প, গোটাদুয়েক উপন্যাস এবং বেশ কিছু হালকা বিষয়ের উপর প্রবন্ধ লিখেছি। কয়েকটা গল্প বিবিসি-র হোমসার্ভিস প্রোগ্রামের কাছে বিক্রি করতে পেরেছিলাম ‘দি থিফ, নাইট ট্রেন অ্যাট ডেভলি, দি ওম্যানঅন প্লাটফর্ম এইট, দি কিটিমেএবার’ অন্যগুলো এলিজাবেথান ইলাসট্রেটেড উইকলি অব ইন্ডিয়া ও সানডে স্টেটসম্যান-এর কাছে (দীর্ঘ সময়ে অনেক লেখা হারিয়েও গেছে)। ভারতে আপনি একটা গল্প বা প্রবন্ধ লিখে বড়োজোর পঞ্চাশ টাকা পাবেন, তবে এখানে মাসে তিনশ থেকে চারশ টাকায় মোটামুটি আরামেই থাকতে পারবেন অবশ্য আপনার চলাফেরার বাহন হতে হবে সাইকেল। কেবল সফল ব্যবসায়ী আর ডাক্তাররা পারেন মোটরগাড়ি পুষতে।
আমার সৎ বাবা ছিলেন একজন ব্যতিক্রমী ব্যাবসায়ী। এই অসফল ব্যাবসায়ী প্রতিমাসে গাড়ি পরিবর্তন করতেন। এটা সম্ভব হতো, কারণ দেরা ছেড়ে যাবার আগে তিনি একটা মোটরগাড়ির মেরামতখানা চালাতেন। কেউ তার গাড়িখানা মেরামত বা ওভারহলিং (তাঁর মতে মূলত তেল-গ্রিজ দেবার জন্য)-এর জন্য রেখে গেলে তিনি এক-দু’মাস গাড়িটা ঠিক হয়েছে কিনা তা পরখ করার জন্য রেখে দিতেন নিজের কাছে। মালিকের ধৈর্য তার শেষ সীমায় না পৌঁছা পর্যন্ত তিনি এরকম করতেন। এমনো হতো যে কাউকে কাউকে একরকম জোর করেই তাদের গাড়ি উদ্ধার করতে হতো। কোনো কোনো সময় অবশ্য তিনি নিজে থেকেও গাড়ি ফেরত দিতেন, তবে এতোদিন ধরে গাড়ি দেখাশোনা করার একটা বিল সহ।
দেরাতে তাঁর এই প্রতিভার স্বীকৃতি মেলেনি। দিল্লি গিয়ে অবশ্য তিনি একজন সফল বিক্রেতা হয়েছিলেন।
দেরার গল্পগুলোতে কিছু চরিত্র কাল্পনিক, কিছু বাস্তব; ঠাকুমার চরিত্রটি অবশ্যই বাস্তব। ‘রুম…রুফ’ এবং ‘ভ্যাগ্রান্টস’-এর সবাই বাস্তব। রাস্টি কী মীনা কাপুরের সঙ্গে দৈহিক সম্পর্ক করেছিলো ? এই প্রশ্নটি আমাকে করা হয়েছে, যার উত্তর আমি এড়িয়ে গিয়েছি। সেরকম হয়ে থাকতেও পারে, আবার নাও পারে। থাকনা বিষয়টা একটা মধুর রহস্য হয়ে।
একটা বিষয় দ্বিধাহীন ভাবে বলতে পারি। দেরা আমার লেখক হবার পিছনে পরিপূর্ণ ভুমিকা রেখেছে। এটা সিমলাতে হয়নি, যেখানে আমি স্কুলে গিয়েছি। লন্ডনেও না, যেখানে প্রায় চারটি বছর থেকেছি। দেরার ভুমিকা দিল্লির চাইতেও বেশি, দিল্লিতে আমার অনেকগুলো বছর কেটেছে। মুসৌরি সম্পর্কেও একই কথা বলা যায়, যেখানে আমার অর্ধেকটা জীবন কাটিয়েছি। দেরাতে, তার প্রকৃতিতে, এমন কিছু আছে যা আমার রুচি ও মেজাজকে দারুণভাবে বশীভূত করে রেখেছিলো।
কিন্তু এখন সব খুব বদলে গেছে, এখন আর রাজপুর রোড ধরে হেঁটে যেতে যেতে বৃষ্টির মধ্যে গুনগুন করার অনুভূতি হয়না। সেই আগের মতো নেচে, ছুটে, গানগেয়ে বেড়াতে গেলে যেকোনো সময়ে দ্রুত ধাবমান কোনো মোটরগাড়ির চাকার তলে পড়ার সম্ভাবনা। কাজেই নিরাপদ ফুটপাথ ধরে হাঁটি আর পরিচিত পথচিহ্ন খুঁজি, একটা প্রাচীন পিপুল গাছ, একটা পুরনো পরিচিত বাঁক, টিকে যাওয়া একটা বাড়ি, বইয়ের দোকান, সবজি বাজার, একটু খোলা মাঠ, যেখানে একসময় ক্রিকেট খেলেছি।
সেসময় দেরার সর্বত্র এক ধরনের জংলা ফুলের লতা দেখা যেতো, সেগুলো আজো আছে। আমরা ওগুলোকে বলতাম ব্লু মিন্ট ফুল। এরা খানা-খন্দ থেকে শুরু করে অবহেলিত বাগানে বা যে কোনো খোলা জায়গায় জন্মায়। প্রায় সারা বছরই এদেরকে দেখা যায়। দেরার সঙ্গে এদেরকে অবিচ্ছেদ্য বিবেচনা করেছি সব সময়। মানব-সভ্যতার আগ্রাসন এই ফুলকে দমাতে পারেনি। এটা এমন এক উদ্ভিদ যা অদম্য, এরা কখনো বিলিন হবে না। ছেলেবেলায় এদের সঙ্গে বড়ো হয়েছি, যতদিন এরা থাকবে ততদিন আমার মনে হবে যে আমার একটা অংশ দেরায় বেঁচে রয়েছে।(শেষ)

ছবিঃ গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]