আমার চোখের মাঝে তারা যে তুই

শিল্পী কনকনকচাঁপা কচাঁপা এবার গানের পাশাপাশি প্রাণের বাংলার পাতায় নিয়মিত লিখছেন তার জীবনের কথা। কাটাঘুড়ির মতো কিছুটা আনমনা সেসব কথা, হয়তো কিছুটা অভিমানিও। কিছুটা রৌদ্রের মতো, খানিকটা উজ্জ্বল হাসির মতো।

নাতী নাতনীর সঙ্গে

মা হবো এই অনুভূতি আমার সে বয়সে তেমন কাজ করেনি। প্রসবের ভয় ও তেমন ছিলো না।হয়তো এতোটাই দিশেহারা ছিলাম যে সবকিছু মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছিলো। কাজকর্ম প্রায় বন্ধই হয়ে গেলো আমার। শশুর বাড়িতে নিজের হারমোনিয়াম নাই, গর্ভবতী বলে অনুষ্ঠানেও যাইনা।গানের থেকে অনেক দূরে চলে গেলাম। সে কারনেই সব শুণ্য শুণ্য হয়ে গেলো। দিন কোনমতে গুজার হচ্ছিলো আর কি। কিছু নিয়মকানুন কিছু ওষুধ চিকিৎসা এগুলো নিয়েই সময় কাটছিল। একসময় দিন ঘনিয়ে এলো।শান্তিনগর এর ফরিদা ক্লিনিকেই আমার সন্তান হবে।ডঃ ফরিদা আপা খুবই নামকরা ডাক্তার। ওনার স্বামী টি এ চৌধুরী আরো নামকরা। বলা যায় উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ ডাক্তার দের একজন। দিনক্ষন ঘনিয়ে এলো।ওই যে মাথার ভেতর কিছুই কাজ করেনা। তাই বাচ্চার নাম, বাচ্চার জন্য কিছু কেনা, তার বিছানা বালিশ কিছুই রেডি করিনি।সময় ঘনিয়ে এলো।জীবনের শ্রেষ্ঠতম ভয়ংকর এবং শ্রেষ্ঠতম আকাঙ্ক্ষা পূরণের সময় ঘনিয়ে এলো।আমি কিছুই না বুঝে মানসিক ভাবে রেডি। যা হয় হবে টাইপ ভাব আর কি।সময় মত ক্লিনিক এ গেলাম। আল্লাহ আমাকে সেই ভয়াবহ পরিস্থিতির সামনে দাঁড় করালেন। আমি মোকাবেলা করলাম, স্বামী, মা পাশেই ছিলেন। ভয়াবহ কঠিন পরিস্থিতি সামলে আত্মজ কে বুকে পেলাম। আমি তাজ্জব! এই দেবশিশু আমার সন্তান? কি অপূর্ব চোখ? কি অপূর্ব ভ্রু? কি ঘিয়ের মত গায়ের রং? কি অপূর্ব অবয়ব! আলহামদুলিল্লাহ! মাশআল্লাহ।! হে আল্লাহ! কতই তুমি দিলা আমায় বিনা কারনে। বাচ্চা নিয়ে শশুর বাড়ি গেলাম। সবাই খুব খুশী আবার আশ্চর্যান্বিত এই দেবশিশু কোথা থেকে এলো।কি অপূর্ব কি অপূর্ব। সবাই, প্রায় সবারই কথা এটা যেন আমার বড় জায়ের বাচ্চা হলেই বেশী মানায়।উনি যেমন রূপবান তেমন তার গায়ের রং।

আমার ছেলে মাশুক ও তার বৌ

যখনই এই কথা কেউ বলে আমি হাসিমুখে মেনে নেই কিন্তু আসলে মুখ কালো করে বেড়াই।সবাই ঘুমিয়ে গেলে পুত্রকে কোলে কঠিন করে বুকে জড়িয়ে একা একাই বলি বাবা, আমি যতই শ্যামলা হই আমিই তোর মা।আমি কাউকে বলতে পারিনা যে আমাকে যতটা শ্যামলা দেখা যায় আমি আসলে তা নই আর আমার স্বামী, তিনিও তো একদম গোলাপী ধরনের মানুষ, আর আমি ছোট বেলায় অনেক ফর্সা ছিলাম কিন্তু সারাজীবন মাদারটেক এর কড়া রোদ বৃষ্টি ঝড়ে তামাটে হয়ে গেছি আর সত্যি কথা কখনোই কোন মানুষের গায়ের রং দিয়ে বিচার করা পরিবার থেকে শিখিইনি তাই এই রংয়ের বৈষম্যতে আমি একটু অস্থির হচ্ছিলাম এবং মন ও খারাপ হচ্ছিলো ।এতো কথার মাঝে শাশুড়ি মা বললেন তোমার ছেলে একদম আমার শশুর জমিদার জনাব হায়দার আলী খান সাহেবের রঙ পেয়েছে। এতদিনে মন আমার হালকা হলো যে যাক পুত্র আমার তার বড়দাদার রং পেয়েছে কিন্তু চোখ আমার আব্বার ।তবুও মন ছোট করে থাকি যে এই দেবশিশুর মা হওয়ার যোগ্য আমি নই।আবার তাকে বুকে জড়িয়ে কি গর্বই না লাগে। আমার সন্তান, আমার পয়লা সন্তান, আমার পুত্র ফাইজুল ইসলাম খান মাশুককে বুকে পেয়ে আমি আমার গান আমার দুঃখ আমার অভাব সব ভুলে গেলাম, ভুলে গেলাম মা হওয়ার ভয়ংকর শারীরিক কষ্টের কথা।জীবনের অর্থই বদলে গেলো। কিশোরী মা আমি জীবনের সব কাপড়ের পুতুল এর দুঃখ ভুলে জ্যান্ত ননীর পুতুল নিয়ে মেতে উঠলাম। জীবন আসলেই পালটে গেলো। আলহামদুলিল্লাহ।

ছবি: লেখকের ফেইসবুক থেকে