আমার ছেলেবেলা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

কাকলী আহমেদ

সত্তর দশকের মানুষগুলোর কথা মনে হলেই, চোখের সামনে ভেসে ওঠে বড় রাস্তায় কেবল দুই তিনটা ট্রাক। ভক্সওয়াগন গাড়ি। প্রাইভেট গাড়ি হাতে গোনা দুই তিনটি। জোনাকি সিনেমা হলের সামনে ৬৭, নয়া পল্টনে অপু ভাইদের বাড়িতে আমরা ভাড়া থাকতাম। বড় বড় দুই কামরা। সঙ্গে অর্ধেক গোসলখানা ও অর্ধেক কামরা। সংলগ্ন উঠোন। উঠোন পেরোলে আরেকটা কামরা। তার বাঁ পাশে ল্যাট্রিন।
চিলতে উঠোনে আলো আর দুলাল ( খোকার মা-র ছেলে) এক্কা এক্কাদোক্কা খেলে। আমি রোদে মোড়া পেতে ওদের খেলা দেখতাম। খেলা বলতে তখন ঘরের খেলা ছিলো লুডু, বাগাডুলি। বাইরের খেলা ফুলটোকা, ছোঁয়াছুঁয়ি, কানামাছি ইত্যাদি৷ ছেলেরা শীতকালে ব্যাডমিন্টন খেলতো। আর গরমকালে ফুটবল। মাঠের অভাব ছিলো না তখন ঢাকায়। এ পাড়া আর ওপাড়ার ছেলেদের দলের ফুটবল ম্যাচ হররোজ লেগেই থাকতো।

সকালে নিয়ম করে পড়তে বসা। সকালের নাস্তা রেডি হলে মাদুর বিছিয়ে আম্মার হাতের গরম গরম আটার রুটি আর আলু ভাজি। মুদি দোকানে তারের গোল খাঁঞ্চি -তে মুরগীর ডিম। এক হালি ডিমের দাম তখন কত আজ মনে নেই। বিরাট কাঁচের বৈয়ামে তেঁতুলের গোল গোল আচার। ডিম কিনতে দোকানে যেতাম খোকার মার সঙ্গে। এক পয়সায় চারটা গোল গোল তেঁতুলের আচার কিনে ফিরতাম। আম্মার চোখে পড়লে নির্ঘাত মার ও বকা। তবু হজমি ও এই আচার খোকার মা লুকিয়ে কিনে দিতো। খোকার মা-র পান, চুন, খোলা সুপারি, গুলের ডিব্বা দিয়ে সদাই শেষ হলে আমাদের হাতে তুলে দিতো টিক টিকির ডিম, হজমি ও তেঁতুলের আচার।

আমার চৌদ্দ মাসের বড় সহোদরা আলো সবে তখন কি নয় দশ বছরের। সারাদিন উঠোনে রোদ খেলে বেড়ায়। অপু ভাইদের বিরাট উঠোনে অজস্র আম, জাম, লিচু আর পেয়ারার গাছ। উঠোনের এক পাশে চাপকল আর চাতাল। আম্মার ছিলো কাপড় কাঁচার রোগ। বিরাট লোহার কড়াইয়ে বিছানার চাদর প্রতি রোববারে সোডা দিয়ে সেদ্ধ করা চাইই চাই। বিছানার চাদর ছিলো সাদা ধবধবে। ঢাকা ডাইং-এর স্ট্রাইপ স্ট্রাইপ। বঙ্গবন্ধু এভিনিউ -এর দোকান থেকে ডবল ও সেমি ডবল চাদর কিনে নিয়ে আসতো নিজের পছন্দ মতো। সন্ধ্যায় সেদ্ধ চাদরের আর বালিশের গন্ধ ঘুমের পরীদের যেনো নামিয়ে আনতো।

তিন বেলা বিছানার চাদর তুলে সপাং সপাং ঝাড়া। বাড়ির সব কাজে আম্মার হাতের ছোঁয়া। গল্পের সঙ্গে স্বল্প আয়ের এক অদ্ভুত বুনন প্রতিটি ঘরে ঘরে এক শিল্প সুধা ছড়িয়ে দিতো।
জোনাকি সিনেমা হলে তখন প্রতি সপ্তাহেই নতুন নতুন সিনেমা আসতো। বিরাট সিনেমার বিলবোর্ড। সারা সিনেমা হলের গায়ে বড় বড় সাঁটা পোস্টার। সিনেমা হলের সামনে ব্ল্যাকে টিকেট বিক্রি। সিনেমার শো ভাঙ্গলেই ভীড় আর লোকজনের হল্লা। আব্বুর কড়া নির্দেশ জানালা দিয়ে সিনেমার বিলবোর্ড -এর দিকে তাকিয়ে থাকা যাবে না। অথচ আমরা তখন রাজ্জাক, ববিতা,শাবানা, অলিভিয়া, জাফর ইকবাল ছবির দিকে উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকি। মানুষ সমান হাতে আঁকা বিলবোর্ড-এ তাঁদের খুব কাছের মানুষ মনে হয়।

সত্তরের দশকে “কে তুমি”, সুজন সখী”,” দা রেইন”, গাঁয়ের বধু” ” সাত ভাই চম্পা”, ” ওরা এগারো জন” এসব সিনেমার গল্প চলে বাসায়। ইত্তেফাক, বাংলাদেশ অবজারভার, রোববার, সচিত্র সন্ধানী, চিত্রালী, পূর্বানী-তে সিনেমার আলাপ সালাপ। অথচ আমরা কেবল ছোট হবার কারণে সবকিছু থেকে বঞ্চিত। মাঝে মাঝে ইংরেজি ছবি আসে। আব্বুর বন্ধু মনু চাচার সঙ্গে আম্মা আমাদের বাচ্চাদের উপযোগী ছবি দেখতে পাঠান। সদলবলে আমরা সিনেমা হলে যাই।

ছারপোকার কামড় খাই। সিনেমা হলের পর্দায় বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ দেখি। জাতীয় সংগীত বাজতেই উঠে দাঁড়াই। (ছোট্ট একটা সরকারি বিজ্ঞাপনে নিজের ছবি দেখি। অনেকে দেখে এসে বলার পর মা নিজে গিয়ে দেখে বিশ্বাস করেন তাই তো। মেয়েটি তো কাকলী। শিশু স্বাস্থ্য প্রতিযোগিতায় মুনিয়ার ফোকলা দাঁতের হাসি ভরা মুখ দেখে খুশিতে আম্মাও আটখানা।)

“ও মা আমি নয়ন জলে ভাসি……..সোনার বাংলা ” বলার সঙ্গে সঙ্গে আমার দু’চোখ ভেসে যায় জলে। পুরো হল ভর্তি মানুষের অর্ধেক মানুষ-কে চোখ মুছতে দেখি।
সিনেমা হলের পর্দা জুড়ে পত পত করে বাংলার আকাশে পর্দা ওড়ে। ফটাস ফটাস সিনেমা হলের চেয়ার ফেলে চোখ মুছি আর বসে পড়ি। আজো আমার সিনেমা হলে গিয়ে সিনেমা দেখলে, জাতীয় সঙ্গীত বাজলে শরীরের লোম খাড়া হয়ে ওঠে।
দেশ মাতৃকার প্রতি এই ভালবাসা বয়সের সঙ্গে সঙ্গে আরো পরিপক্ক হচ্ছে।
এখনো বাথরুমে গেলে আমি নিজ মনে গেয়ে উঠি ” সালাম সালাম হাজার সালাম সকল শহীদ স্মরণে”।

শহীদ তোমরা শোনো কি? আমি/ আমরা কি তোমাদের ত্যাগ মনে রেখেছি। সন্মান ধরে রেখেছি? মাথায় পড়িয়েছি শিরোস্ত্রাণ?

ছবি:লেখকের ফেইসবুক থেকে

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]