আমার ঝিনুকহীন মুক্তা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শাহিদা আরবী ছুটি

(অস্ট্রেলিয়া থেকে):  আমি যখন এই পোস্টটা লিখছি তখন মধ্যরাত। বাইরে ঝড় বৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টি কম, তবে ঝড় বেশি। বাতাসের শো শো শব্দ আমার সাউন্ডপ্রুফ বারান্দার কাঁচের দরজা ভেদ করে শোনা যাচ্ছে। কেমন যেন একটা অশরীরী শব্দ। ভয় লাগার কোনো কারণ না থাকলেও এই শব্দে যে কারও ভয় লাগবে। আমার অবশ্য ডর ভয় একটু কম!
এরকম ঝড় বৃষ্টির রাতে আমার কেনো যেনো ছেলেবেলার বন্ধু ‘মোটা মুক্তার’ কথা মনে পড়ে।

মুক্তার নাম কেন ‘মোটা মুক্তা ‘সেটা বলার আগে বলি কিভাবে ওর সঙ্গে আমার পরিচয়। আমি তখন ক্লাস এইটে পড়ি। একদিন ক্লাসের বাইরে কান ধরে দাঁড়িয়ে আছি (আমার স্কুল জীবনে আমি প্রায় প্রতিদিনই বাইরে কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকতাম, এইটা আমার জন্য কোনো বড় বিষয় ছিলোনা), হঠাৎ দেখলাম একটা সাদা গাড়ি আমাদের স্কুলের সামনে এসে থামলো। সেখান থেকে এক সুদর্শন ভদ্রলোক, আমার বয়সী একটা মেয়ে নিয়ে গাড়ি থেকে নামলো। মেয়েটা ছিলো পরীর মতোন। তবে অবহেলিত পরী।

মেয়েটার মাথার চুল ছিলো এলোমেলো আর জামাকাপড় খুব বেশি সুবিধার না। তবে চেহারা সুন্দর হওয়াতে এসব কিছু ঢাকা পড়ে গেছে। সেই ভদ্রলোক আমার দিকে একবার তাকিয়ে হেডমিস্ট্রেস এর রুমে ঢুকে পড়লো। মূলত উনি উনার মেয়েকে এই স্কুলে ক্লাস এইটে ভর্তি করিয়েছেন, মেয়ে হোস্টেলে থাকবে। উনি চাচ্ছিলেন ক্লাসের সবচেয়ে ভালো স্টুডেন্ট উনার মেয়ের রুমমেট হোক।

কিছুক্ষন পর আমার ডাক পড়লো হেডমিস্ট্রেস এর রুমে। ভদ্রলোক আমাকে দেখে হতভম্ব হয়ে হেডমিস্ট্রেস কে জিজ্ঞেস করলো, ‘এইটা আপনাদের ক্লাসের সবচেয়ে ভালো স্টুডেন্ট? ওকে তো কান ধরে বাইরে দাঁড়ায়া থাকতে দেখলাম।’

হেডমিস্ট্রেস কপাল কুঁচকে বললো, ‘ব্রেন ভালো তবে গাছের বান্দর, দিন রাত বাঁদরামি করে’ … আমি তৎক্ষণাৎ বললাম ম্যাডাম ‘বান্দর’ না ‘বানর’ বলেন। ম্যাডাম আমাকে অগ্নিদৃষ্টি দিলো, আমি সেই অগ্নিদৃষ্টি উপেক্ষা করে, সামনে বসে থাকা পরীর মতোন মেয়েকে জিজ্ঞেস করলাম ‘এই তোমার নাম কি?’ মেয়েটা ভয়ে ভয়ে বললো ‘মুক্তা’, আমি মুক্তার হাত ধরে ওকে স্কুল দেখাতে নিয়ে চললাম !

মুক্তার বাবা হতাশ হয়ে মেয়েকে গাছের বান্দর এর সঙ্গে চলে যেতে দেখলেন …

মুক্তা শেষমেশ আমার রুমমেট হয়ে গেলো। আমি ওকে রুমে এনে বললাম ‘তোর নাম মুক্তা কেন? এইটা চলবে না,আমাদের আরেকটা মুক্তা আছে।’
তখন ‘জেভি’ (আমার আরেক রুমমেট) বললো “ওর নাম হবে মোটা মুক্তা কারণ আরেক মুক্তা শুকনা, এই মুক্তা মোটা “…

সেদিন থেকে আমরা নির্বিকার ভাবে মুক্তাকে ‘মোটা মুক্তা’ ডাকা শুরু করলাম। মুক্তা কয়েকবার বলার চেষ্টা করেছিলো, আমার নাম নাইমা, তোরা আমাকে নাইমা ডাক। আমরা তেমন পাত্তা দেইনি।

মুক্তা আমার রুমমেট হওয়াতে মুক্তার চেয়ে আমার সুবিধাই বেশি হলো। ও খুব লক্ষী টাইপ একটা মেয়ে ছিলো। পড়াশুনা ছাড়া বাকি সব করতে ওস্তাদ। ঘুম থেকে উঠে আমাদের সবার জন্য চা বানাতো, আমাদের কাপড় চোপড় ইত্যাদি ধুয়ে দিতো। আমাদের হোস্টেলটা ছিলো একটু গ্রামের দিকে। আমরা সবাই পুকুরে গোসল করতাম ! মুক্তা আমাকে সময় নিয়ে মাথায় শ্যাম্পু করে দিতো। মুক্তার সঙ্গে প্রথমটায় আমার ডোমেস্টিক বন্ধুত্ব হলো।

মুক্তা ওর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে খুব বেশি কিছু বলতো না। আমিও জিজ্ঞেস করতাম না, একদিন জেভি ফিসফিস করে শুধু বললো মুক্তার আসল মা মারা যাবার পর, ওর বাবা না দুইটা বিয়ে করেছে। মুক্তার বাবার দুইটা বিয়ে নিয়ে আমি খুব বেশি মাথা ঘামালাম না। আমরা সবাই হোস্টেলে যারা পড়ি সেখানে প্রত্যেকেরই কোনো না কোনো গল্প ছিলো, থাকে। ভালোবেসেতো আর বাবা মা তার নিজ সন্তানকে হোস্টেলে পড়তে পাঠায় না।

মুক্তা ওর মতোন থাকতো আর আমি আমার মতোন পড়াশুনা করতাম।

আমি পড়তাম ভোরবেলায়। ফজরের নামাজের পর আমি আর ঘুমাতাম না। বই নিয়ে বাইরের দিকে একটা ঘন জঙ্গল টাইপ বাগান ছিলো সেখানে চলে যেতাম। সেখানে দুই ঘন্টা পড়ে, রুমে আসতাম। তারপর নাস্তা করে স্কুলে চলে যেতাম। একদিন পড়া শেষ করে রুমে একটু তাড়াতাড়ি ফিরলাম। ঢুকে দেখি, মুক্তা এক হাতে আয়না আরেক হাতে ব্লেড নিয়ে খাটের উপর বসে আছে। চুল আলুথালু। চোখ ভয়ার্ত। যেনো একটু আগে ভূত দেখেছে। মুক্তা ব্লেড দিয়ে ওর এক ভ্রু চেঁছে ফেলেছে!

আমি ঘটনার আকস্মিকতায়, চিৎকার দিয়ে উঠলাম। রুমে যারা ঘুমাচ্ছিলো তারাও উঠে গেলো এবং মুক্তার এহেন অবস্থা দেখে ওরাও চিৎকার শুরু করলো। পুরো হোস্টেল বিষয়টা জানাজানি হয়ে গেলো। এরপর থেকে মুক্তার নাম হলো ‘ব্লেড মুক্তা’ ! নামের জন্যই হোক আর এক ভ্রুর জন্যই হোক, সবাই ওকে তখন অ্যাভয়েড করতে শুরু করলো। জেভি আল্টিমেটাম দিলো ওর ভ্রু না গজানো পর্যন্ত ওই রুমে ঘুমাবেনা। মুক্তা ওর এক ভ্রু নিয়ে পুরো একা হয়ে গেলো..
ব্লেড মুক্তার তখন একমাত্র বন্ধু আমি। এই বন্ধুত্ব কিভাবে বাড়লো, কিভাবে হলো মনে নেই। তবে আমি তখন মুক্তার মাথায় সযত্নে শ্যাম্পু করে দিতে আরম্ভ করলাম।ওকে নিয়মিত পড়ানোও শুরু করলাম। তবে লাভ হতোনা, ওর মাথায় কিছু ঢুকতোনা, যা পড়তো তাই ভুলে যেতো।

মুক্তার বয়স যখন তিন বছর, তখন আরেক সন্তান প্রসব করতে যেয়ে ‘মুক্তার মা’ মারা যায়। ওর বাবা তখন আরেকটা বিয়ে করে আর মুক্তা চলে যায় গ্রামে ওর নানী বাড়িতে।

মায়ের মৃত্যুর তিন বছর পর মুক্তাকে ওর বাবা একদিন নিতে আসলো। মুক্তা ভীষন খুশি, বাবার সঙ্গে থাকবে, কি আনন্দ ! ওর বাবা ঢাকায় ওর সৎ মা আর তার দুসন্তানসহ, একটা দেড়তলা বাড়িতে ভাড়া থাকতো। সেই বাড়িতে ছিলো দুইটা বড় বড় আম গাছ, ছায়াঘেরা এই বাসায় এসে মুক্তা মুগ্ধ !!

তবে এই মুগ্ধতা বেশিক্ষন থাকলোনা। মুক্তা বুঝতে পারলো এই শহরে কাজের লোকের বড়ই অভাব।

ছয় বছর বয়সী সেই মুক্তার জায়গা হলো রান্নাঘরের পাশে এক স্টোর রুমে। তবে মুক্তা তাতেই খুশি, নিজের একটা রুম পেয়ে। সারাদিন কাজ কাম করে ওর দিন ভালোই যায়। ওর ছোট দুইটা সৎ ভাইবোন আছে। একদম গেদা। ওদেরকে মুক্তা দেখে শুনে রাখতো।

মুক্তার রুম ভর্তি ছিলো পেঁয়াজ, আলু, ডাল, চাল ইত্যাদি আর তার সঙ্গে ছিল তেলাপোকা, ইঁদুর, পিঁপড়া, মাকড়শা ইত্যাদি। ছয় বছরের বাচ্চা হাইজিন কি বুঝতোনা, তবুও মধ্যরাতে উঠে স্যান্ডেল দিয়ে তেলাপোকা মারতো। এই শব্দে যখন ওর ছোট ভাইবোন জেগে উঠে কাঁদতো, তখন ওর সৎ মা স্টোরে রুমে এসে সেই স্যান্ডেল দিয়েই ওকে পিটাতো।

মেয়েটা একটাসময় তেলাপোকা নিয়েই ঘুমানো শিখে গেলো।

মুক্তার এসব গল্প শুনতে শুনতে আমি অনেক কাঁদতাম। দুহাত দিয়ে মুখ ঢেকে কাঁদতাম। মুক্তা তখন মিটিমিটি হাসতো।

এসব ছাড়াও মুক্তার সৎ মা ওকে আরো অদ্ভুত সব শাস্তি দিতো। মুক্তা অনেক সুন্দরী ছিলো, তাই ওর মাথার চুল উনি ছোপ ছোপ করে কেটে দিতো। আবার মাঝে মাঝে ওর একটা ভ্রু চেঁছে দিতো। ব্লেড নিয়ে স্টোররুমে এসে উনি বলতেন ‘এই ভ্রু চাঁছ, ভ্রু চাঁছ তুই’ ..

বিষয়টা এমন একটা ট্রমা, এতটাই যে, মুক্তা সেই স্টোররুমে আর না থাকলেও, উনি মুক্তার স্বপ্নে এসেও এই আদেশ দিতেন আর মুক্তা ঘুম থেকে উঠে ঘোর লাগা চোখে সেই আদেশ পালন করতো…

দুঃস্বপ্নও বোধহয় এর চাইতে ভালো হয় .. তাইনা?

তবে এতসব কিছু সহজভাবে নিলেও, একটা ব্যাপার মুক্তার ভীষণ ভয় করতো। তা হলো ঝড় বৃষ্টির রাত। এইরকম রাতে অনেক প্রকার শব্দ হতো তো…

গাছে গাছে ঘর্ষণের শব্দ। বাতাসের শো শো শব্দ। বাজ পড়ার শব্দ। তখন বাড়ির আমগাছগুলোকে ওর এক একটা মৃত আত্মা মনে হতো। মুক্তা ঘুমাতে পারতো না। এমন ঝড়ো রাতে তো যে কোন বড় মানুষও একা একা ভয় পায় আর মুক্তা ছিলো স্টোররুমে পড়ে থাকা ছয় বছরের একটা বাচ্চা…
মুক্তা সেইরাতগুলোতে কাঁদতো, খালি কাঁদতো। আর ওর মাকে ডাকতো।

ওর এসব গল্প শুনে আমিও কাঁদতাম। এরকম গল্প শুনলে আসলে কি বলতে হয় আমি জানতাম না। আমি ওর মাথায় হাত বুলাতাম আর বলতাম চিন্তা নিস্ না তোকে আমি আগলায়া রাখবো। মুক্তা মিটিমিটি হাসতো।

একদিন আমি ওকে জিজ্ঞেস করেই ফেললাম, ‘এই আমি যখন কাঁদি,তুই তখন হাসিস কেন?’

মুক্তা তখন বলতো, ‘তোকে আমার মৃত মায়ের মতন লাগে ছুটি। প্রতিবার আমার এক একটা গল্প তোকে বলি, আর মনে হয় এই গল্প যদি আমার মা কে বলতাম সেও কাঁদতো। আমার জন্য কাঁদার কেউ নাইতো, তোর কান্না দেখতে ভাল্লাগে।
মনে হয় কেউ একজন আমাকে আগলায়া রাখার কথা দেয়। আমার মাথায় হাত বুলায় ..তোকে আমার মা মনে হয় ছুটি …’

পরিশেষে –
মুক্তার মৃত মা হয়ে আমি বেশিদিন ছিলাম না, মাত্র তিন বছর। আমি এস এস সি পাশ করে বের হয়ে গেলাম, আর মুক্তা ফেল করে রয়ে গেলো। মুক্তার আর এস এস সি দেয়া হয়নি।
ওর বিয়ে হয়ে গেলো ওর চাইতেও দ্বিগুন বয়সী এক লোকের সঙ্গে। একদিন সেই লোক প্রচন্ড গরমে স্যুট টাই পরে ঘামতে ঘামতে দুই বাক্স জিলাপি আর মুক্তা সহ আমার বাসায় দেখা করতে আসলো। সেটাই আমার শেষ দেখা মুক্তার সঙ্গে।

তারপরও মুক্তা মাঝে মাঝে ফোন দিতো। আমি কলেজ পেরিয়ে ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হলাম, ও তখন প্রেগন্যান্ট .. নিশ্বাস নিতে কষ্ট হতো। দম নিয়ে ফিসফিস করে বলতো ‘সন্তান জন্ম বড় কষ্টের’রে ছুটি .. শুধু ভয় লাগে .. অনেক ভয়।
তবে মুক্তার ভয় বেশিদিন স্থায়ী হয়নি ..

সন্তান প্রসব করতে যেয়ে ওর মায়ের মতোন মুক্তারও মৃত্যু হয়। সেই সঙ্গে ওর অনাগত সন্তানেরও …

তবে এই সংবাদে আমার তেমন কান্না পায়নি …
বরং আমি মিটিমিটি হেসেছি। ওর মৃত সন্তানের কথা ভেবে মনে হয়েছে, যাক পৃথিবীতে অন্তত আরো একজনকে স্টোরে রুম এ ঘুমাতে হলোনা …

এখনও এই ঝড় বৃষ্টির রাতগুলোতে আমার মাঝে মাঝে ইচ্ছা হয়, আমি মুক্তার কবরের পাশে যেয়ে বসে থাকি। আলতো করে ওর কবরে হাত রেখে বলি,
‘তুই ভয় পাইস না, আমি এখানেই আছি .. এইতো তোর পাশেই …তুই নিশ্চিন্তে ঘুমা …’

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]