আমার দেখা সামাদ ভাই

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

মামুন রিয়াজি

ফেইসবুক।সবার কাছেই জনপ্রিয় এই শব্দটি। তাই প্রাণের বাংলায় আমরা সংযুক্ত করলাম ফেইসবুক কথা বিভাগটি।এখানে ফেইসবুকের আলোচিত এবং জনপ্রিয় লেখাগুলোই  আমরা পোস্ট করবো।আপনার ফেইসবুকে তেমনি কোন লেখা আপনার চোখে পড়লে আপনিও পাঠিয়ে দিতে পারেন আমাদের ই-মেইলে।

১৯৭৬ থেকে ১৯৭৭ সনের কোন এক বছর আমাদের আর্ট কলেজের অভিষেক অনুষ্ঠান পরিচালনা ও পরিকল্পনার দায়িত্ব আমাকে  দেওয়া হয়েছিলো ।তখন অনুষ্ঠানটি নতুন ভাবে নতুন আঙ্গিকে সাজানোর জন্য আমি টেলি সামাদ ভাই কে আনার সিদ্ধান্ত নেই ,আমার সঙ্গে তার পূর্বে কখনো পরিচয় হয় নাই, কিন্তু স্বাধীনতার পরে তিনি চলচ্চিত্রে এবং টেলিভিশনে অত্যন্ত জনপ্রিয় কৌতুক অভিনেতা ছিলেন। তিনি আর্ট ইনস্টিটিউটের গ্রাজুয়েশন করা ছাত্র। উনার রুমমেট ছিলেন আজকের স্বনামধন্য শিল্পী হামিদুজ্জামান খান স্যার। স্যার আমাকে বললেন যে মামুন তুমি যদি চাও ‘আমি সামাদ ভাইকে ফোন করে দেবো তুমি গিয়ে পিক আপ করে নিয়ে এসো তোমার অনুষ্ঠানে! আমি কথা বলেছি তিনি আসতে রাজি হয়েছেন অংশগ্রহণ করবেন।’ আমি তো খুব খুশি হলাম সামাদ ভাইকে টেলিভিশনে এবং ফিল্মে দেখেছি সরাসরি তার সঙ্গে দেখা হবে! উনার ফার্মগেটের বাসভবনের ঠিকানা নিয়ে আমি উপস্থিত হলাম উনার বাসায়। কলিং বেল বাজাতে তিনি দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন। আমার পরিচয় দিয়ে বললাম, ‘আমি মামুন রিয়াজী আর্ট ইনস্টিটিউটের ছাত্র।’ তিনি বললেন, ‘হামিদুজ্জামান খান তোমার কথা বলেছে বসো চা খাও।’ অমায়িক ব্যবহারে তিনি আপন করে নিলেন অল্প কিছুক্ষনের মধ্যেই।আমার সঙ্গে অনর্গল কথা বলছেন আর খুশিতে তার নতুন বাড়িটির সম্পর্কে বিস্তারিত বলতে থাকলেন। টাইলস সিঙ্গাপুর থেকে এনেছেন সেটাও তিনি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখালেন আমাকে ।মনে হলো উনি বুঝি আমাকে অনেকদিন ধরেই চেনেন। কথার মাঝে তিনি অনেকক্ষণ ধরে আমার দিকে তাকিয়ে থাকেন আর কথা বলেন। কোথাও যেন দু’জনের মিল রয়েছে চেহারায় এটাই বুঝি অনুধাবন করছিলেন আমিও হালকা পাতলা গড়নের , সামাদ ভাই ও হালকা পাতলা লম্বা এবং উনার চুল আর আমার ঝাঁকড়া চুল ‘লুক লাইক টুইন ব্রাদার’ ।আমরা রিক্সা করেই চারুকলার দিকে যাত্রা শুরু করলাম। কত গল্পকথা। একপর্যায়ে তিনি বললেন, ‘মামুন আমি আসলে যখন আট কলেজ হোস্টেলে থাকতাম তখন অনেক কষ্ট করেছি ।কষ্ট করে দাঁড়াতে হয় তুমিও ছাত্র তোমাকেও কষ্ট করে দাঁড়াতে হবে।’ সামাদ ভাই আরও বললেন আমি খোদাকে বলতাম ‘ও আল্লাহ আমায় সুখ দিলে আমার যৌবনকালেই দিও আমি যেন আমার যৌবন কাল উপভোগ করতে পারি’। আসলেই তাই। সময় গড়িয়ে আশির দশকে যখন আমি আবার টেলিভিশনে চুটিয়ে অভিনয় করা শুরু করলাম ফিল্ম এলাম, হঠাৎ করেই একদিন এফডিসির শুটিং স্পটে সামাদ ভাইয়ের সঙ্গে দেখা।আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন আমি তোমার প্রোগ্রাম দেখি তুমি টেলিভিশনে ‘যদি কিছু মনে না করেন’ অনুষ্ঠানে আছো। আমার খুব ভালো লাগে তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন,‘ তুমি কি জানো গতসপ্তাহে চিত্রালী পত্রিকায় একজন পাঠক প্রশ্ন করেছেন টেলিসামাদ কি মামুন রিয়াজীর ভাই?’ চিত্রালী সম্পাদক উত্তর দিয়েছিলেন, ‘যে না উনারা ভাই নয় তবে দুজনাই আট কলেজের থেকে পাস করা শিল্পী।’ সামাদ ভাইকে ছেড়ে এবং দেশ ছেড়ে চলে যাওয়া আমার ৩০ বছর হয়ে গেল। গত চার বছর আগে একুশে টেলিভিশনের তৎকালীন চেয়ারম্যান আব্দুস সালাম সাহেব ঢাকায় এসে একুশে টেলিভিশনে একটা ঢাকা প্রোগ্রাম করার জন্য সিদ্ধান্ত নিলেন। আমি  প্রোগ্রাম সাজিয়ে একটি স্ক্রিপ্ট তৈরী করি।ওখানে সামাদ ভাইকেও রেখেছিলাম। ফোনে উনার সঙ্গে কথা হলে উনি বললেন,‘ কই গেলা মিয়া তুমি? দেশ ছেড়ে চলে গেছো তোমারে তো আর দেখি না।’ আমি বললাম,‘ ভাই আমিতো আমেরিকায় থাকি’। তিনি বললেন, ‘ও ভালো করছো ভালো করছো।’ খুব খুশি হলেন তিনি জেনে । অবশেষে আমি একুশে টেলিভিশনে প্রোগ্রামটি করতে পারিনি। আমার অসুস্থতার কারণে আমি ব্যাক করে আবার আমেরিকা তে চলে যাই। মাঝে মধ্যে ফোনে কথা হতো সামাদ ভাইয়ের সঙ্গে। লাস্ট কথা যখন হয়েছিলো তিনি বললেন, তিনি বড় অসুস্থ তার পায়ে ডায়াবেটিসের কারণে পচন ধরেছে। আমি ঘাবড়ে গেলাম বললাম ইনশাল্লাহ আপনি সুস্থ হয়ে যাবেন। আমাকে বলেছিল,‘ ঢাকায় এলে দেখা কইরো আমি খুশি হব।’ ঢাকায় এসেছি আর দেখা হলো না । সেই আশির দশকের বিটিভ প্রোগ্রাম এর পরেই রাস্তায় বের হলে নিউমার্কেটে গাউছিয়া মার্কেটে পিছন থেকে অনেকের কন্ঠ শুনতে পেতাম ‘ওই জুনিয়র টেলিসামাদ যাইতাছে।’ কখনোই দর্শকদের উক্তি আমাকে খারাপ লাগেনি কারণ সমালোচনা তো হবেই। যাই হোক সামাদ ভাইয়ের ছেলে সুমন আমেরিকাতে থাকে। এবার ঢাকাতে এই কয় মাসে অনেক প্রিয় কাছের মানুষ কে হারালাম। চলে গেলেন অনেকে না ফেরার দেশে। এখনো আমি বেঁচে আছি । ফেলে আসা অতীতে যাদেরকে হারিয়েছি তাদের কথা খুব মনে পড়ে যেমন, ফজলে লোহানী ভাই ,গোলাম মোস্তফা ভাই ,জাফর ইকবাল ,রোজি ভাবী , ইমতিয়াজ বুলবুল ,হুমায়ুন ফরিদী, সাইফুদ্দিন ভাই সিডনি ভাই আরো অনেকে ,দোয়া করি যারা চলে গেছেন আল্লাহ তায়ালা যেন উনাদেরকে বেহেশত নসিব করেন । আমিন।

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]