আমার দেশপ্রেমে যতটা দেশ আছে, ততটাই প্রেম আছে

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

(কলকাতা থেকে): আমি ভয় পাচ্ছি।

আমি কিন্তু ভীষণ ভয় পাচ্ছি…
অথচ আমার ভয় পাওয়ার কথা ছিলো না।

আমি ছোটোবেলা থেকে, এবং এখনও… যে কোনও প্রান্তে জনগণমনর সুরটুকু শুনলেও উঠে দাঁড়াই। নিজে থেকে দাঁড়াই। সিনেমা হলে সে গান বাজিয়ে মানুষকে দাঁড় করানোর ফতোয়া আমার না-পসন্দ হলেও, প্রতিবার গানটা শুরু হওয়া মাত্র আমি দাঁড়াই। পাশে কেউ না দাঁড়ালে বিরক্ত হই। কিন্তু তাকে জোর করে মেরেধরে দাঁড় করানোর চেষ্টা করি না আবার।
এবং একই সঙ্গে আমার স্মৃতিতে এখনও এক বারও নেই, গোটা গানটা আমি গেয়েছি অথচ আমার গায়ে কাঁটা দেয়নি।

তাই আমার কিন্তু ভয় পাওয়ার কথা ছিলো না।

যত রদ্দি এবং সস্তা যুদ্ধের সিনেমাই হোক, শেষ দৃশ্যে তেরঙা ওড়ার মুহূর্তে আমার চোখে জল আসে। আসেই।

ফলে আমার কিন্তু ভয় পাওয়ার কথা ছিলো না।

কয়েক দিন আগেই কাশ্মীর ঘুরে এলাম যখন, প্রতিটা সেনার সঙ্গে কথা বলার পরে, সে হাবিলদারের সঙ্গে বা অফিসারের সঙ্গে… আমি স্যাল্যুট করেছি একটা করে, হাসিমুখে। কেউ বলেনি, কেউ বকেনি, কোনও জবরদস্তি ছিলো না, কিন্তু একটা শক্ত হ্যান্ডশেক আর ফার্ম স্যাল্যুট আমার নিজে থেকেই এসেছে। বারবার।

তা হলে আমার তো ভয় পাওয়ার কথা ছিলো না!

গত বছর কাশ্মীরে বাইক এক্সপিডিশনে গিয়ে, আমি যে দিন কুপওয়ারা থেকে দ্রাস যাচ্ছিলাম… আদিগন্ত ধানক্ষেত, তার গা দিয়ে বেয়ে ওঠা পাহাড় আর পাহাড়ের মাথায় চুমু খাওয়া ঝকঝকে নীল আকাশ দেখে গলা খুলে গেয়ে উঠেছিলাম ধনধান্যপুষ্পভরা… আচমকা, গলা খুলে। চিৎকার করে। আমার প্রতিটা লাইন সত্যি মনে হয়েছিলো ওই মুহূর্তটায়। মনে হয়েছিলো, ‘সকল দেশের রানি সে যে আমার জন্মভূমি’-র মতো অলীক বাক্যটা শুধু এই জায়গাটা দেখেই লেখা হয়েছিলো।

তা হলে আমি কেন ভয় পাচ্ছি?

ভারত মাতাকি জ্যায় বাক্যবন্ধটা নিয়ে আমার কোনও লজ্জাবোধ বা আপত্তি না থাকলেও, এ বাক্যবন্ধটা আমায় উদ্বেলও করে তোলে না। অথচ আমি ‘আওয়ার প্লেজ’ এখনও মুখস্ত বলতে পারি। ইন্ডিয়া ইজ় মাই কান্ট্রি… থেকে …লাইজ় মাই হ্যাপিনেস পর্যন্ত প্রতিটা অক্ষর আমায় উদ্বেল করে, সেই ছোট্টোবেলার স্কুলের প্রেয়ারে গোটা প্লেজটা অর্থ ধরে ধরে শেখা থেকেই।

তা হলে কি আমার ভয় পাওয়া উচিত?

সেটা ভাল করে বুঝে উঠতে না পেরেও আমি ভয় পাচ্ছি।

কারণ, আমায় যে কোনও মুহূর্তে বলা হতে পারে, পতাকা গায়ে জড়িয়ে জয়শ্রীরাম বলতে। যে কোনও মুহূর্তে। মাঝরাতে বাড়িতে চড়াও হয়ে, বা কাল অফিস যাওয়ার পথে। আমার দেশপ্রেমের এক্সপ্রেশন অমন না-ও হতে পারে। কিন্তু সেটা না-হলে আমায় দেশদ্রোহী বলা হবে। বুলি করা হবে। শহিদ শব্দটা নিয়ে আমার আপত্তি নেই। কিন্তু কারও যদি যুক্তিবোধ অহিংস ভাবে বলে যে যুদ্ধে মৃত্যুর ক্ষেত্রে এ শব্দ অ্যাপ্ট নয়, তবে তাকে নিয়েও আমার আপত্তি নেই। থাকার কথা নয় গণতান্ত্রিক দেশে। কিন্তু এই না-থাকাটুকু দিয়েই তো আমায় জাজ করবেন দেশপ্রমিকরা।

তাই আমি খুবই ভয় পাচ্ছি।

এবং আমি যেহেতু খুবই ভয় পাচ্ছি, তাই হয়তো প্রেমিকদের সেই গণরোষের সামনে বলেই উঠতে পারবো না পরিষ্কার করে, যে জয়শ্রীরাম শব্দটা নয়ের দশকে বাবরি মসজিদ ভাঙার সময়ে তৈরি করা একটা নোংরা জিগির। ধর্মান্ধদের স্লোগান, গাড়িতে লাগানো স্টিকার, যেটা এখন একটা বিশেষ রাজনৈতিক দলের তরফে কাজে লাগানো হচ্ছে দেশপ্রেমের নাম করে। জয়শ্রীরাম শব্দটা রামরাম বা রামদুহাই-র মতো নিছক কুশলবিনিময় নয়। আর নয় বলেই সেটা দিয়ে আমার দেশপ্রেম ডিফাইনড হয় না।

হ্যাঁ, আমি খুবই ভয় পাচ্ছি।

কারণ আমার চেতনা, বোধ, যুক্তি, চিন্তা… এ সবটা মিলিয়ে আমায় শিখিয়েছে, দেশ মানে কেবল আঁকাবাঁকা দাগকাটা ভৌগোলিক মানচিত্র নয়। দেশ মানে মানুষ, গাছ, পাখি, গান, ফুল, ইতিহাস…
আমি আরও বড় হতে হতে রিয়ালাইজ় করেছি, দেশ মানে প্রত্যন্ত গ্রামে এক বেলা ভাতের সঙ্গে ডিম পেলে, কুসুমটা হাতে লুকিয়ে রেখে ফোকলা একটা হাসি। দেশ মানে, সে হাসিতে যাতে কলুষতা না মেশে, তার দায়িত্ব নেওয়া… আমার কাছে দেশ মানে খরাবিধ্বস্ত গ্রামে একটা টিউবওয়েলের অঙ্গীকার, একটা শেষ হতে বসা কমিউনিটিকে শিক্ষার আলো দেখানো…

আমি তবু ভয় পাচ্ছি…

কারণ প্রতিবার পুলওয়ামার মর্মান্তিক ঘটনায় শিউরে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই আমার মধ্যে প্রশ্ন শিউরে উঠছে, এতটা অ-নিরাপদ একটা ব্যবস্থায় কেন, কী ভেবে ফেলে দেওয়া হলো এতগুলো মানুষকে… কারণ প্রতিটা কাশ্মীরির আর পাকিস্তানির ঘরে ঢুকে জঙ্গি মারার সঙ্কল্প নিয়ে সারা শরীর শক্ত ওঠার আগেই আমার মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে… এত মানুষ জঙ্গি কেন হয় এই ভেবে…

আমি খুবই ভয় পাচ্ছি।

তাই এই  লেখা থেকে আপ করা পর্যন্ত আমি বারবার খুঁটিয়ে পড়বো। খুঁটে খুঁটে দেখবো, এ লেখার কোনও ছত্রে, কোথাও, নিজের অজান্তেই দেশের প্রতি কোনও দ্রোহ থেকে গেলো কি না…।
কিন্তু আমি জানি, আমার দিক থেকে তা এতটুকু না থাকলেও, কিছু মানুষ হয়তো সে দ্রোহ খুঁজে পাওয়ার সময় আর ছুতো ঠিক পেয়ে যাবে। এবং তার চেয়েও বেশি ভয় আমি এটা ভেবে পাচ্ছি, যে তেমন কিছু খুঁজে পেয়ে যদি আমায় আক্রমণও করা হয়, তা হলে বেশ কিছু শিক্ষিত, সংবেদী, তীক্ষ্ণমেধার মানুষেও আমার বিপক্ষে দাঁড়িয়ে যুদ্ধের পক্ষ নেবেন। কারণ তাঁরা দেশপ্রমিক। এবং তাঁদের দেশপ্রমের সমস্ত সংজ্ঞাটুকু আমার সঙ্গে অক্ষরে অক্ষরে মিলছে না।

কিন্তু এই এত ভয় পাওয়ার পরেও আমি অনেক দ্বিধায়, অনেক দ্বন্দ্বে এটা দিচ্ছি, কারণ আমার দেশপ্রেমে ঠিক যতটা দেশ আছে, ততটাই প্রেম আছে।
এবং সেই প্রেমবোধ আজও রক্তকামী নয়, যুদ্ধকামী নয়, মৃত্যুকামী নয়। সেই দেশবোধ আজও বারুদের গন্ধের চেয়ে ধানের গন্ধ অনেকটা বেশি ভালবাসে।

এটুকুই আমার ভয়।
এটুকুই আমার জয়।

ছবি:গুগল