আমার প্রথম কোলকাতা ও কলকাতার বইমেলা দেখা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

নাদিয়া আরেফিন শাওন

১৯৮৯ সালের দিকে আব্বা প্রায়ই আমাকে সাগর পাবলিশার্সে নিয়ে যেতো। ওখানে অনেক জ্ঞানীগুনী জন আব্বার বন্ধু ছিলো। তারা আড্ডা দিতো আর আমি কখনও তাদের কথা গিলতাম বা বই পড়তাম। আড্ডার অন‍্যতম আর্কষণ ছিলো মমতাজ উদ্দিন আহমেদ,আহমেদ সফা,হায়াৎ মাহমুদ আরো সাগর পবলিশার্সের মালিক বাকি দুই জনের নাম মনে নাই। এই নাম মনে না থাকার প্রধান কারন ছোটবেলায় ভাইয়া অনেক ফালতু নাম দিয়েছিল যেমন -গোলাপি মাড়ি,পিতলা,টাকলু,জাম্মু,

টাইগার বাম ইত‍্যাদি। ওখানেই জানতে পারি আব্বারা বন্ধুরা মিলে কলকাতার বই মেলায় যাবে।আমার ছোটবেলা থেকেই পায়ের নীচে চাকা লাগানো তাই আমি রেডী আর ভাইয়াও যেতে চাইলো।

মমতাজ উদিদন আহমেদ

হায়াৎ মাহমুদ চাচা তখন প্রায় প্রতিদিন সকালে বাসায় এসে একগাদা কাগজ ছিটিয়ে লেখালেখি করতে বসতো; যেন আমাদের ড্রইংরুমই তার ঘর বাড়ি। অবশ‍্য এ সময়ে আব্বার লেখা “ঢাকা শহরের ইতিকথা” বের হয়। বিকালে আসতো মমতাজ চাচা আর বাসায় হৈ হৈ শুরু….এদিক ওদিক থেকে হাসির শব্দ বাড়িময় গড়িয়ে পরতো আর আহমেদ ছফা চাচার গল্প শুনেই জেনেছি জার্মান কত সুন্দর দেশ। তার প্রায় প্রতি কথায় জার্মান চলে আসতো। একবার জার্মান থেকে আমার কুকুরের গলার আটোচেন এনে দিয়েছিলেন। যা খুবই সুন্দর ছিলো!!

যাই হোক এই পাগল বুড়াদের সঙ্গে প্রথমে যশোর পযর্ন্ত প্লেনে ও পরে গাড়ি করে কলকাতা যাই। প্রথম দিন ক্লান্ত হলেও হোটেলে আমরা হুলস্থুল শুরু করে দিলাম। পূজার সময় পূজাও চলছিলো। চারপাশে মাইকে গান,হৈচৈ আর কোলকা

আমার আব্বু

তার বাতাসে বিখ‍্যাত গন্ধ….!! সব মিলে আমাদের ভীষন উত্তেজনা।

পরদিন সকলে নাস্তাকরে প্রথমেই গেলাম বই মেলাতে।বাংলাদেশি ষ্টলে পরিচিত মুখ,পরিচিত বই ছাড়াও পুরো বইমেলার সব দোকান ঘুরে এসে দেখি আব্বা আর মমতাজ চাচা বইমেলার মধ্যে লোকজন নিয়ে আসর জমিয়ে আড্ডা দিচ্ছেন আর পাশেই স্তুপ করা এতো বই। সন্ধ্যায় মেলা থেকে বের হয়ে হতাশ গলায় ভাইয়া বলে উঠে “এই দেখতে এতোদূরে আসার কি দরকার ছিলো আমাদের বইমেলা তো হয়ই”।পরদিন ভাইয়া বিদ্রোহ করে- ‘এটা বেড়ানো হচ্ছে না আমি বেড়াতে এসেছি.. .বইমেলায় যাবো না।’ আব্বা হেসে আমাদের নিয়ে প্রথমে যান “ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল” দেখাতে আমি তো দেখে ভেবেছি ওটাই “তাজমহল “!! পরে আব্বার কাছ থেকে জানলাম কোলকাতায় তাজমহল নাই আর এইটা তাজমহল না। আমাদের ছোটবেলায় প্রায় সব ফেক্টরিগুলোতে আব্বা জ্ঞান অর্জনের জন‍্য নিয়ে যেতেন।যেমন কাগজমিল ,পাটকল, বিদুতকেন্দ্র,চা কারখানা,কাপড় মিল,গ‍্যাসফিল্ড ইত্যাদি।শুধু দর্শন না আব্বু ধারা বর্ণনা করার মতো জ্ঞান বিতরণ করে যেতেন। আর যতো প্রশ্ম তত উত্তর। আমার ধারনা জুতা সেলাই থেকে চন্ডীপাঠ সবাই আব্বা জানতেন।যাইহোক তারপর ট্রামে চড়ে যাই মাটির তলায় রেলগাড়ির ষ্টেশনে; মাটির নীচের মেট্রোতে চড়েওছি কিন্তু ওটা যে মাটির তলায় সেটাও টের পাইনি। সেখান থেকে গড়ের মাঠে গিয়ে দেখলাম মোটেও কল্পনার গড়ের মাঠের সঙ্গে মিল নাই তাতেও ভাইয়ার মুখ ভার। রেসের মাঠে গিয়ে ঘোড়া দৌড় দেখতে পেলাম না কিন্তু মাঠের দর্শন করে মঞ্চনাটক দেখতে গেলাম সেখানে সব চাচারা আগেই চলে এসছিলো তাই হৈচৈ করে নাটক দেখে গেলাম “বিড়লা প্লেনেটোরিয়মে” এই জিনিস আগে দেখিনি তাই আমি আর ভাইয়া হা করে দেখতে লাগলাম। সব শেষে হোটেলে ফিরতে আব্বা বললেন আমাদের হোটেলটা ছেড়ে অন্য কোথাও উঠতে হবে।

আহমেদ ছফা

এইবার আমাদের তাজ্জব হবার পালা; হোটেলের লবিতে আমাদের ব‍্যাগ বাঁধা। যার মানে সকালেই আব্বা সব ব‍্যবস্থা করে গিয়েছিলো।হোটেল ছাড়ার কারন মমতাজ চাচা বলল ” কাল আমরা বেশ কিছু প্রয়োজনীয় বই কিনেছি আর কিছু অর্ডার দিয়েছি তাই আমাদের হোটেলে থাকবার পয়সা নাই।!বোঝ অবস্থা!! ভাইয়া তো রেগে টং। একদিনে তুমি সব টাকা খরচ করেছো?বলে চিৎকার করতে থাকে। আব্বাও অপরাধি গলায় বলে না,খাবার টাকা আছে,শান্তিনিকেতনে যাওয়া আসার টিকেট আছে আর আছে ফেরার খরচ!!এই ছিল আমাদের বাবা।কতদিন বাজারের থলি নিয়ে বের হয়ে অনেক দেরিতে একগাদা বই ভর্তি থলি নিয়ে বাসায় ফেরায় কি অশান্তি তৈরী হতো কিন্তু তাতে কি ;মানুষটা সত্যিই বই পাগল ছিলো।

যাক, তারপর কোলকাতায় আমাদের আশ্রয় হলো বৌদ্ধদের মঠে। বৌদ্ধ মন্দিরের সংলগ্ন বিশ্রামাগারে দুটি ঘর হায়াৎ মাহমুদ চাচা সারাদিনে যোগার করেন তাতেই আমরা সবাই গিয়ে উঠি।

সে ঘরে কি আছে?? কতগুলো দড়ি বাধা খাট,চাদর,বালিশ ব‍্যাস।আব্বা শুকনো হাসি দিয়ে বললেন” তেমন খারাপ না তাই না?এখানের বৌদ্ধ মূর্তিটি অনেক দামি আর নাম করা কাল সকালে দেখো।”আমি আর ভাইয়া শোনা মাত্র ছুটে গেলাম দেখি, চুরির ভয়ে গৌতম বুদ্ধ জেলখানায় বন্দি! কি সুন্দর মূর্তি, সারাগায়ে নানা রঙের পাথর আর লোহার দরজায় এতো বড় তালা। আমি আর ভাইয়া চুরি করার প্ল‍্যান করতে লাগলাম আব্বাকে আইডিয়া বলামাত্র সে তখন সাধুদের গলায় কি একটা বললো” পরনারী পরধন ইষ্টসম” এরকম একটা কিছু যার অর্থ নাকি অন‍্যর সম্পদকে ইট মনে করবে ;তাতে কি আমরা অন্য সম্পদকে পাথর মনে করে চুরির ধান্ধা করতে করতে ঘুমিয়ে গেলাম। সকালে অদ্ভুত সুরে আর ঘন্টার শব্দে ঘুম থেকে উঠে দেখি বৌদ্ধরা প্রার্থনা করছে কি বলছে না বুঝলেও খুব খুব ভালো লাগলো। তাই আমরা চুরির প্ল‍্যান বাদ দিলাম।

হায়াত মাহমুদ

সকালের নাস্তা শেষে ট্রেনে করে শান্তিনিকেতন রওনা হলাম। আমি আর আব্বা একসঙ্গে অনেক জার্নি করেছি তাই আমি জানি আব্বা পথে ভারী খাবার খায় না। সারা রাস্তা শশা,আপেল ইত‍্যাদি খেতে খেতে ;চারপাশ দেখতে দেখতে ট্রেনের সঙ্গে দুলে দুলে শান্তিনিকেতন পৌঁছে আমি তো অবাক এখানে সব মেয়েরা সাইকেল চালায়!! হবিগঞ্জে আমার সাইকেল চালানো নিয়ে আব্বাকে অনেক মোল্লাদের নালিশ শুনতে হয়েছে। আমি একদল সুখী মেয়েদের দেখে মুগ্ধ। আরো মুগ্ধ হলাম রবিঠাকুরের শান্তিনিকেতন, তার ব‍্যবহার্য জিনিস,বিভিন্ন নামের বাড়িগুলো কিযে সুন্দর….সত‍্যিই যথার্থ নাম শান্তিনিকেতন।কিন্তু আমাদের জীবনে শান্তি নাই। আমাদের হুড়াহুড়ি করে বিকেলের ট্রেনেই ফিরতে হবে। একে টাকা নাই, ট্রেন মিস হলে বিপদে পরবো তাই সবাই মিলে দৌড়াতে দৌড়াতে ইষ্টিশনের দিকে ছুটতে লাগলাম। ওমা গিয়ে দেখি ট্রেন দাড়িয়ে আছে সবাই পরিমরি করে উঠে বসলাম কিন্তু ভাইয়া কোমরে হাতদিয়ে প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে গালাগাল করছে;আব্বা হতভম্ব হয়ে জানতে চাইলো কি সমস্যা ও একনাগারে হরবর করে বলতে লাগলো “”ফাইজলামি.. তোমারা ফাইজালামি পাইসো?সকাল থেকে শশা মশা খাওয়ায়ে বুড়ার বাড়ি ঘুড়াইতেসো। আমি ভাত না খায়ে কোথাও যাবো না।””আমি টাকা নিয়ে পাতার প্লেটে ওকে ভাত কিনে দিলাম ;কমদামি পথের পাশের সস্তা ডালভাত। ও তাই নাকেমুখে খেয়ে ট্রেনে উঠে এলো। ফিরে এসে দেখি মঠে বেনারস থেকে কিছু ব‍্যবসায়ি এসে উঠেছে। ভাইয়া তখন অল্পসল্প গিটার বাজায় আর গিটার নিয়েই কোলকাতা গিয়েছিলো। ওরা জানতে চাইলো আমরা গান গাইতে পারি কিনা, আমাদের আর ঠেকায় কে! আমরা দুইজন গলা ছেড়ে গান করলাম…. পরে কোলকাতা থেকে বাড়ি ফেরা কেন জানি মন থেকে মুছে গেছে।।মনে করতে চেষ্টা করেছি কিন্তু মনেপরে নাই।…

তবে যাদের সঙ্গে এই ঘোরাঘুরি তাদের মধ্যে আমি, ভাইয়া আর হায়াৎ মাহমুদ চাচা ছাড়া বাকি সবাই ইহলোকের মায়া ত‍্যাগকরে হয়তো একসঙ্গে আড্ডা দিচ্ছেন এখন…

ছবি: লেখক ও গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]