আমার প্রথম ক্রাশ

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

পোস্টবক্স। ফেইসবুকের একটি জনপ্রিয় গ্রুপ। এবার প্রাণের বাংলার সঙ্গে তারা গাঁটছড়া বাঁধলেন। প্রাণের বাংলার নিয়মিত বিভাগের সঙ্গে এখন থাকছে  পোস্টবক্স-এর রকমারী বিভাগ। আপনারা লেখা পাঠান পোস্টবক্স-এ। ওখান থেকেই বাছাইকৃত লেখা নিয়েই হচ্ছে আমাদের এই আয়োজন। আপনারা আমাদের সঙ্গে আছেন। থাকুন পোস্টবক্স-এর সঙ্গেও।

সা’দ জগলুল আববাস

“মরমীয়া তুমি চলে গেলে

দরদী আমার কোথা পাবো

কারে আমি এ ব্যথা জানাবো….”

সতীনাথের এই গানটি আমার দু’টি কারণে খুব প্রিয়; এক, বাংলা গানের স্বর্ণ যুগের বিরহ সংগীতের (আমরা বলতাম ছ্যাঁকা সংগীত) কিংবদন্তির গাওয়া গান, দ্বিতীয়টা একটু পরে বলছি….।

আমি নিজেকে বেশ ভাগ্যবান মনে করি কারণ আমার জীবদ্দশায় তিনটি ভিন্ন ভিন্ন সময়কে সশব্দে অতিক্রান্ত হতে দেখেছি-বুকে লটকানো সে সব সময়-ফ্রেমে আমি নিজের ছবি দেখি সবসময়। প্রত্যেকটা ফ্রেমের চারিত্রিক বৈশিষ্ট যদিও ভিন্নতর; কিন্তু তিনটি ফ্রেম একে অপরের সঙ্গে দারুণ ভাবে সম্পৃক্ত -একটা ত্রিভুজের মতো ।

বাবার সরকারি চাকুরির সুবাদে আমার ঢাকা শহরে বড় হয়ে ওঠা ছিলো ওই ত্রিকাল দর্শনের মূল চাবিকাঠি। আমি আমার শহরকে সবুজ হতে ক্রমশঃ বিষণ্ন হলুদ হতে দেখেছি ; আমি কংক্রিটের দেয়ালের পিছনে একটু একটু করে আকাশের নীল লুট হয়ে যাওয়া দেখেছি।

আমার শৈশব এবং কৈশোর ছিলো ফিঙের আনন্দময় দুলুনি, ছিলো বুক ভরে শ্বাস নেবার প্রশান্তি। আমি মার্বেলের দ্যুতি আর রং চোখে নিয়ে মাঠে ঘাটে রোদ

ভেঙ্গেছি,লত্তির প্যাঁচ থেকে ছুটে লাট্টুর মতো ভন ভন পাঁক খেয়েছি; সাত চাড়ার স্তূপ ভাঙ্গতে না পেরে টেনিস বল নিক্ষেপের লক্ষ্য বস্তু হয়ে চোখ মুছতে মুছতে সন্ধ্যায় ঘরে ঢুকে পড়তে বসেছি।এই আমিই ক্লাশ সেভেন অথবা এইটে পড়াকালীন বন্ধুদের সঙ্গে লুকিয়ে রূপমহলে রাজলক্ষী ও শ্রীকান্ত সিনেমা দেখে সুচিত্রা সেনের পাশে নিজেকে ভাবতে ভাবতে বাসায় এসে বাবার হাতে চরম পিটুনি খেয়েছি !

তারপর দিন বদলে গেলো খুব তাড়াতাড়ি, বাঙ্গালীরা তেঁতে উঠলো তাদের পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্গে পশ্চিম পাকিস্তানের অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিক বৈষম্যের কষ্ট বুকে নিয়ে, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে চারিদিকে জ্বলে উঠলো দ্রোহের আগুন, পাক সেনাদের হাতে লক্ষ লক্ষ বাঙ্গালী প্রাণ দিলো, ইজ্জত লুটালো অসহায়ের মতো। বেজে উঠলো মুক্তিযুদ্ধের দামামা-এ ঘটনা সবার জানা । তখন আমারও বুকের ভিতর ফস্ করে জ্বলে উঠেছিলো একটা দিয়াশলাই কাঠি – আমি মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের মেলাঘরে গেলাম ।

সবাই এতোক্ষনে নিশ্চয় ধৈর্যের শেষ সীমায় পৌঁছে গেছেন- ভাবছেন হয়তো,দেখ কান্ড, ধান ভানতে শিবের গীত হচ্ছে! আসলে এই ভনিতা করার কারণ আছে,ওই যে শুরুতেই একটা গানের

ক’টা লাইন লিখে

এসেছিলাম, সেখানে পৌঁছতে;গানটা কেন আমার এতো প্রিয় সেই দ্বিতীয় কারণটায় যেতে।

একাত্তরের আগস্ট মাস, আমি টাংগাইল শহরে এসে পৌঁচেছি। ক’দিনের জন্য একটা “সেফ হাউস”প্রয়োজন লুকিয়ে থাকার জন্য। ডেরা হলো সেখানে আমার এক নিরাপদ আত্মীয়ের বাসায়। আমি জুলাই মাসেই ট্রেনিং শেষ করে ঢাকায় ঢুকেছি দলের অন্যান্যদের সঙ্গে। আমাদের ক্যাম্প হলো ঢাকা শহরের বাইরে শেখের জায়গা নামে একটা গ্রামে ।ইতোমধ্যে চামেলী বাগে ফিল্ম পাবলিকেশন অফিস, শহীদবাগের ইলেকশান কমিশন অফিস , ডেমরায় তিতাস গ্যাস পাইপ লাইন উড়িয়ে দেয়া সহ আরো কিছু ছোটখাট ক’টা অপারেশন করার পর আমাদের গ্রুপটা নিয়ে বেশ আলোড়ন উঠেছে ঢাকায়। সবার মনে হলো ক’দিনের জন্য একটু গা ঢাকা দেয়া প্রয়োজন; যে যার মতো হাইড আউটে গেলো, আমি গেলাম টাংগাইল শহরে আত্মীয়ের বাসায়-সম্পর্কে মামা।

তিনি সরকারি চাকুরে, বদলী হয়ে টাংগাইলে পোস্টিং;তিন বছরের একটা ছেলে এবং মামী নিজের গ্রামের বাড়িতেই থেকে গেছে- এ দুঃসময়ে সাহস করে বিদেশ বিভুঁয়ে সঙ্গে রাখেননি।

আমি যখন বাসে করে শহরে পৌঁছি তখন দুপুর পেরিয়ে গেছে,মামা বাস স্টপ হতে আমাকে একটা রিক্সা করে বাসায় নিয়ে আসেন, পনেরো মিনিটের রাস্তা।গাছ গাছালি ছাওয়া বেশ ছিমছাম নীরব শহরতলীর বাড়ী। দু’কামরার ভাড়া বাড়ীটা সাধারন মফস্বল শহরের পুরনো ধাঁচের,বাড়ীওয়ালার সঙ্গে কমন উঠোন আছে, কোণে বাঁধানো চাতালের উপর একটা চাপকল । তবে মামার দু’ঘরের মাঝে একটা বাথরুমে আছে ।পছন্দ হয়ে গেলো মাটির সোঁদা গন্ধ..সকালের দিকে মনে হয় বৃষ্টি হয়েছিলো, ভেজা মাটি সেটাই বলে । আহ্, মা’য়ের গায়ের গন্ধ! সঙ্গে পিআইএর একটা সবুজ ট্র্যাভেল ব্যাগে কিছু প্রয়োজনীয় কাপড় নিয়েছিলাম আর আমার পরম নির্ভরতার সাথী পাম সাইজড ছোট বেরেটা পিস্তলটা। বেশ রিস্ক নিয়ে লুকিয়ে পিস্তলটা এনেছিলাম, ভাগ্য ভালো ছিলো যে রাস্তায় কোন কারণে আমাদের বাসটা চেক হয়নি। তারপরও মনে হয় খুঁজলে পেতো না । তবে কি ভাবে লুকিয়েছিলাম সেটা বলা ঠিক হবে এখানে ।যা হোক , হাত মুখ ধুয়ে( আধুনিক টার্ম: ফ্রেশ হয়ে) একটু অপেক্ষার পর মামা বললো , খেতে চলো। আমি ভাবলাম একলা মানুষ , হয়তো হোটেলেই খান, কারণ ঘরে রান্নার কোন উপকরণ চোখে পড়েনি। মামার সঙ্গে বের হলাম; আমাকে একটু অবাক করে মামা উঠোন পেরিয়ে সোজা উল্টোপাশে জমিদার যুগের স্থাপত্য গায়ে নিয়ে দাঁড়ানো হলুদ রংয়ের একটা একতলা দালানের খোলা দরজা দিয়ে ঢুকে পড়লেন। মামার পিছু পিছু ভিতরে ঢুকে নজরে এলো হাতের ডানে কোণে উন্মুক্ত বসার ঘর; বামপাশে খাবার টেবিলে খাবার সাজানো।

এ অংশটুকু বাহির বাড়ী মনে হলো। অনেকদিনের প্রায় আধাপেট হাবিজাবি খাওয়া পেটটা সত্যিকারের খাবারের গন্ধে মোচড় দিয়ে উঠলো! ইতোমধ্যে মধ্যবয়সী এক ভদ্রলোক ভিতর হতে এসে আমাদের খেতে বসতে বললেন। খেতে খেতে মামা পরিচয় করিয়ে দিলেন। ভদ্রলোক ব্যবসায়ী এবং বেশ অমায়িক ও শিক্ষিত মনে হলো। উনি শুদ্ধ বাংলায় আমাদের সঙ্গে কথা বলছিলেন।

জানতে পারলাম ভদ্রলোকই বাড়ীর মালিক; মামা তাঁর ভাড়াটিয়া -‘অন পেমেন্ট’ খাওয়ার বন্দোবস্ত তাঁদের সঙ্গে।লাজ লজ্জা এক পাশে রেখে বুভুক্ষের মতো মন ভরে খেলাম। খাওয়া শেষ করে উঠে দাঁড়ানোর সময় লক্ষ্য করলাম ভিতর বাড়ী যাওয়ার দরজায় দেয়া সবুজ পর্দাটা একটু দুলে উঠলো – মনে হলো কেউ আমাদের আড়াল হতে দেখছিলো। কলতলায় হাত ধুয়ে ফিরে এসে বসার ঘরে বসলাম। মিনিট পাঁচেক পর চা’য়ের কাপের টিন টিন আওয়াজের সঙ্গে একটা খসখস শব্দ কানে এলে ঘাড় ফিরিয়ে দেখি, আমার মা’য়ের বয়সী মা’য়েদের মতো মায়া ভরা মুখের একজন ভদ্রমহিলা হাতে চা’য়ের ট্রে নিয়ে এ দিকেই আসছেন, শব্দটা হাতে ধরা ট্রেতে রাখা চায়ের কাপের এবং তাঁর শাড়ীর; পিছনে আঁচল চেপে ধরা সাত/আটবছরের একটা পিচ্চি – মিষ্টি চেহারার একটা ছেলে। আমি উঠে দাঁড়িয়ে সালাম দিতেই তিনি হাতের ট্রেটা টেবিলে রাখতে রাখতে মিষ্টি হেসে বসতে বললেন । চা খেতে খেতে অনেক গল্প হলো।গল্প করার ফাঁকে আমার চোখ বার বার ভিতর বাড়ী যাবার দরজার পর্দার দিকে চলে যাচ্ছিলো ; আবারো মনে হলো কেউ একজন পর্দার পিছন থেকে দেখছে। ভিতরে ভিতরে একটু বিব্রত হলাম। তবে কেন জানিনা আমার মনে একটা কূ ডাক দিয়ে উঠলো, তাঁদের কথা এবং ব্যবহার দেখে মনে হলো এঁরা আমার লুকানো পরিচয়টা জানেন ! একটু অস্বস্তি দানা বেঁধে উঠতে লাগলো। চা শেষ করে মামাকে তাড়া দিলাম। ভদ্রমহিলা আমাকে বললেন , বাবা, তোমরা বড় শহরের ছেলে, কষ্ট হবে হয়তো এখানে মানিয়ে নিতে।কোন কিছুর প্রয়োজন হলে কোন সংকোচ করবে না, সরাসরি দরজায় টোকা দেবে । আমি জ্বী বলে পিচ্চিটার মাথায় হাত বুলিয়ে সালাম দিয়ে কোন রকমে বেরিয়ে এসে মামার ঘরে এলাম, পর্দার দুলুনি এবারও ছিলো।

-মামা…

-হ্যাঁ, তোমার সম্পূর্ণ পরিচয় সঙ্গত কারণেই আমাকে বলতে হয়েছে; ভয় পাওয়ার কোন কারণ নেই, এদের বিশ্বাস করি বলেই তোমাকে এখানে আসতে বলেছি।তোমার বাবাও এ ব্যাপারটা জানেন। আমি চুপ করে গেলাম। যদিও আমার ছুটি এক সপ্তাহ , স্থির করলাম দু’একদিনের মধ্যেই ঠিকানা বদলাতে হবে । আমার সঙ্গে সঙ্গে এ বাড়ীর সবার বিপদ হতে পারে । আপাততঃ মামাকে কিছু জানালাম না। পথের ক্লান্তি আর জম্পেশ একটা ভূরিভোজের পর চোখ ভেঙ্গে ঘুম আসছিলো। আমার জন্য নির্ধারিত ঘরের দরজাটা বন্ধ করে একটা ক্যাপস্টান সিগারেট ধরিয়ে দু’টো টান দিয়ে জানালা দিয়ে বাইরে ছুড়েঁ দিলাম আধখাওয়া সিগারেট। বেরেটাটা বালিশের তলায় চালান করে বিছানায় গা দিতেই কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম মনে নেই ।

যখন ঘুম ভাঙ্গলো তখন প্রায় অন্ধকার হয়ে এসেছে। দরজায় চোখ পড়তে দেখলাম ছোট্ট খোকাটা দাঁড়িয়ে আছে,

-মা ডাকছে চা খেতে।

-তুমি যাও, আমি আসছি।

ঘরে দেখি মামা নেই। মুখ ধুয়ে একটু ভদ্রস্ত হয়ে সেই দরজার দিকে এগিয়ে গেলাম।

ভেতরে ঢুকে দেখি বসার ঘরের টেবিলে নানা রকম পিঠা এবং চা দেয়া আছে।ভদ্রমহিলা জানালেন,

-তোমার মামাকে নিয়ে উনি একটু শহরে গেছেন; এসে পড়বেন। তুমি চা খাও, আমি নামাজটা সেরে আসি ।

পিচ্চিটার সঙ্গে একটু ভাব জমানোর চেষ্টা করলাম,

-কি নাম তোমার?

-মিন্টু , বলেই এক দৌড়ে পর্দা দোলান ঘরের ভিতর।

চা শেষ করতে না করতেই মিন্টুর মা চলে এলেন।

মা’য়ের সহজাত স্নেহে বললেন,

-একি, সবইতো পড়ে রইলো।

-না খালা, আমি খেয়েছি.., বলে উঠে দাঁড়ালাম-সিগারেটের দারুণ তেষ্টা পেয়েছে ।সবুজ পর্দাটা আবার দুলে উঠলো; পর্দার পিছনে কে ? একটা অস্বস্তি থেকেই গেলো।

নিজেকে একটু স্পেস দিতে আমি একটা রিক্সা নিয়ে শহর দেখতে বের হলাম। আমি যে বাড়িটাতে থাকি সেটা বড় রাস্তা হতে প্রায় দু’শো গজ ভিতরে। একটা ব্রিক সোলিং রাস্তা বাড়ীটার ফুট বিশেক দূর দিয়ে চলে গেছে, রিক্সার চলাচল ছিলো। একটা রিক্সা পেয়ে গেলাম।

ছোট শহর, রাস্তার দু’পাশে ছোট ছোট মনিহারি দোকান , কিছু রেঁস্তোরা।একপাশে বেশ বড় একটা পুকুর দেখলাম; রিক্সাওয়ালা জানালো ওটা “বড় পুকুর “।

একটু বাঁয়ে গিয়ে রাস্তার পাশে বিন্দুবাসিনী হাই স্কুল। দিনের বেলা ঘুরে দেখা যাবে, চিন্তা করে রিক্সা ঘুরিয়ে বাসায় ফেরত এলাম। পৌঁছে দেখি মামা এবং মিন্টুর বাবা মানে আমজাদ সাহেব আমাদের ঘরের বারান্দায় উদ্বিগ্ন মুখে বসে আছেন।কৈফিয়ত চাওয়ার আগেই আমার মুখ খুললো,

-একটু ঘুরে দেখতে বের হয়েছিলাম..।

-মিন্টুর মা বা শেফালীকে জানিয়ে গেলেই পারতে, বাবা .. বলে ভদ্রলোক উঠানে নেমে গেলেন । নিজেকে একটু অপরাধী মনে হলো । কিন্তু শেফালী কে?

-শেফালী কে, মামা?

-আমজাদ সাহেবের মেয়ে ।কোথায়ও গেলে কোন একজনকে জানিয়ে যেও।

-ও..।

তারমানে পর্দার পিছনে শেফালী দোলে।বেশ মজার তো!

রাতের খাবারের জন্য ডাক এলো।এবার টেবিলে এলো পুরো পরিবার।

-শেফালী, খাবারটা উঠিয়ে দাও ; খালার গলা।

শেফালী বসেছে আমার উল্টো দিকে।তাকে দেখে প্রথম যে ভাবনাটা মনে হলো সেটা হলো, কি অদ্ভুত মিল সুচিত্রা সেন’র মুখের সঙ্গে! খাওয়া উঠিয়ে দেয়ার সময় ক’বার চোখাচোখি হলো-কিন্তু কি ভাবলেশহীন নিস্পৃহ মুখ । খেতে খেতে খালা পরিচয় করিয়ে দিলেন,

-শেফালী আমার মেয়ে, বিন্দুবাসীনি স্কুলে ক্লাশ নাইনে পড়তো।

-পড়তো? আমার মুখ দিয়ে ফস্ করে প্রশ্নটা বেরিয়ে গেলো।

-মুক্তি যুদ্ধ শুরু হবার পর হতে স্কুল যাওয়া বন্ধ।

-ও…বলে আমি খাওয়ায় মনযোগ দিলাম । ভাবলাম মেয়েটি বোবা নাকি, একটা শব্দও বেরোয়নি তার মুখ থেকে । একটা হলুদ কামিজ পরা, সাদা ওড়না। দু বেণী করা চুল, বেণীর শেষ প্রান্ত প্রায় কোমর ছোঁয় ছোঁয়, পাঁচ ফুট তিন বা চার ইঞ্চি লম্বা হবে, একটা হাড়গিলে গঠন গমের মতো রংয়ের শরীরে – আমাকে খাবার পরিবেশনের সময় হারিকেনের মৃদু আলোয় এসব মাপজোক করা হয়ে গেলো।

হাত ধুয়ে ফেরত আসার পর দেখলাম মা মেয়ে মিলে এঁটো বাসন গোছাচ্ছেন।

বসার ঘরে গিয়ে বসতেই পিছন থেকে একটা জড়তাহীন প্রশ্ন ,

-চা খাবেন? আহ্ , কি চমৎকার কন্ঠ!

ফিরে দেখি শেফালী তাকিয়ে আছে , প্রশ্নটা তারই করা।

-নাহ্!

কিছু না বলে হাতে ধরা এঁটো বাসন গুলো নিয়ে ভিতরে চলে গেলো। দারুণ সপ্রতিভ একজন মেয়ে। মফস্বল শহরের রাত ন’টার মধ্যেই ঘুমিয়ে যায়, এটা শহরতলী, আরো নির্জন, ঝিঁঝিঁর ডাকের পাশাপাশি নিজের নিঃশ্বাসের শব্দও শুনতে পাচ্ছিলাম। ঘরে এসে জানালার পাশে আয়েশ করে একটা সিগারেট ধরালাম।

বছর খানেক আগে আমার জীবনে একটা দূর্ঘটনা ঘটে গেছে। তারপর মুক্তিযুদ্ধের টানাপোড়েন, তারপর এই সুচিত্রা সেন । মনে হলো আমি এখানে কি করছি , আমার চার পাশে এরা কেন? আমারতো এখন পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে থাকার কথা। কেন এই মোহের নাগপাশ আমার চারপাশে ! সিগারেট শেষ করে মনের ভিতর একটা ধন্দ মাথায় নিয়ে বিছানায় গেলাম।

মামার অফিস আছে কাল, উনি ঘরের দরজা আগেই বন্ধ করেছেন।

একটা দুঃস্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙ্গে গেলো;ডান হাত বালিশের নীচে বেরেটার উপর। ক’টা বাজলো ! ঘুটঘুটে অন্ধকারে রেডিয়াম দেয়া হাত ঘড়িটা দেখার চেষ্টা করলাম, রেডিয়ামের আলো অস্পস্ট হয়ে গেছে, তারপরও মনে হলো পাঁচটার মতো । হঠাৎ আমাকে চমকে দিয়ে হারমোনিয়মের সঙ্গে একটা মেয়ে কন্ঠের আওয়াজ ভেসে এলো, মনে হলো শেফালীদের ওদিক হতেই, কেউ রেওয়াজ করছে । আমি বিছানা থেকে নেমে জানালায় দাঁড়ালাম- জানালা হতে ওই ঘরের কিছু অংশ দেখা যায়, ও দিকটা হতেই মনে হচ্ছে সুরটা ভেসে আসছে । শেফালী গাচ্ছে কি? নাকি খালা? আমি জানালার পাশে চেয়ার টেনে বসে পড়লাম…সকালের এই গ্রামীন নিস্তব্ধতায় রেওয়াজের সুর কি এক ঐন্দ্রজালিক আবহের সৃষ্টি হয়েছিলো আমি বলে বুঝাতে অক্ষম; এটা বুঝতে হলে ওই সকালের আধো অন্ধকার শহরতলীর নিঃশব্দতায় প্রবেশ করতে হবে, সঙ্গে থাকতে হবে সেই সুরেলা গলার রেওয়াজের মতো অপার্থিব একটি কন্ঠ আর আমার মতো পোড় খাওয়া একটা মন। আমি কতোক্ষণ এ ভাবে ছিলাম জানিনা..পাশের ঘরে মামার নড়াচড়ার শব্দ পেয়ে আমার হুঁশ ফিরলো-রেওয়াজের সুরও ততোক্ষণে থেমে গেছে- চারিদিকে আলোকিত হয়ে উঠছে ।একটা দীর্ঘশ্বাস কি পড়লো? আমি ব্যাগ হতে ব্রাশ পেস্ট বের করে বাথরুমে ঢুকলাম।

নাস্তার টেবিলে সবাই উপস্থিত।যে যার স্থানে । দু’ একবার চোখাচোখি হলো, ঠোঁটের কোণাটায় এক চিলতে হাসি কি ফুটে উঠলো? কি জানি । ন’টার দিকে মামা এবং আমজাদ সাহেব কাজে চলে গেলেন ; এখন আমি কি ভাবে সময় কাটাই। বাইরে যাওয়াটা মনে হয় ঠিক হবে না, এখানে সবাই সবাইকে চেনে, আমাকে নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে । একটা বই বা ম্যাগাজিন পেলে ভালো হতো ; কিন্তু ঘরটায় আসবাব ছাড়া কিছু নেই। নিরাশ হয়ে বারান্দায় এসে বসলাম । দেখি মিন্টু এদিকটাতেই আসছে।

-বু আপনাকে জিজ্ঞেস করতে বলেছেন যে আপনি কি বই পড়েন? কি কাকতালীয় ব্যাপার!

-গিয়ে বলো, উনি বলেছেন যে উনি বই পেলে এখন পড়বেন।

মিন্টু কিছু না বলে ফিরে গেলো।

একটু পর শেফালী এবং মিন্টুকে একসঙ্গে দেখা গেলো, শেফালীর হাতে গেটাকয়েক বই,

-এই আছে আমার কাছে, পছন্দ হলে পড়তে পারেন, সময় কাটবে।

কথাটা বলে পাশের ছোট্ট টেবিলে রেখে চলে যাবার জন্য পা বাড়িয়েও ফিরে তাকালো-

-মা বলেছেন বাইরে না যাওয়াটাই ভালো।

বলে সাবলীল পায়ে হেঁটে গেলো গমের মতো রং মাখা শরীর নিয়ে সুচিত্রা সেনের মুখ বসানো মিষ্টি গলার মেয়েটি ।

বিনুণী দু’টো প্রতিটি পদক্ষেপের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দুলছিলো, কাল রাতে হারিকেনের আলোয় যতেখানি হাড়গিলে মনে হচ্ছিলো, এখন তা মনে হচ্ছে না । চোখ সরিয়ে বইগুলোর দিকে চোখ যেতেই আমার ভ্রু কুঁচকে গেলো-কড়ি দিয়ে কিনলাম, মেম সাহেব, চৌরঙ্গি ; মোট তিনটা বই কিন্তু অসংখ্য প্রশ্ন আমার মনে । সুযোগ হলে জানতে হবে । একটা বই টেনে নিয়ে পড়তে শুরু করলাম । বারান্দায় রোদ চলে আসায় ঘরের ভিতর যেতে হলো, বিছানায় শুয়ে বই পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম। একটা কন্ঠস্বর কানে এসে ঘুমটা ভেঙ্গে গেলো,

-শুনছেন? মা , খেতে ডাকছেন! দেখলাম জানালার পাশে শেফালী দাঁড়ানো ।

-আপনি এতো সিগারেট খান! নিচের দিকে তাকিয়ে নাক কুঁচকে কথাটা বললো।

-আমি এই প্রথম একজন মুক্তিযাদ্ধা দেখলাম, আমার দিকে তাকিয়ে এবারের কথাটা প্রায় ফিসফিসিয়ে বললো।

-হুম, মুক্তিযোদ্ধারাও সবার মতোই মানুষ; হয়তো গান গাইতে পারে না কিন্তু শুনতে দারুন পছন্দ ।

-ও মা, আপনি এতো ভোরে জেগেছিলেন?

এখন দয়া করে খেতে আসুন ।

বলে মৃদু একটা হাসি দিয়ে চলে গেলো।

খেতে বসে জিজ্ঞেস করতে জানতে পেলাম

আমজাদ সাহেব তাঁর অফিসেই দুপুরের খাবার খেয়ে নেন, একটা ছেলে এসে নিয়ে যায়।মামা’র অফিস ছুটি হয় দুটোয়, ফিরতে ফিরতে তিনটা বেজে যায়, উনি অফিসেই কিছু একটা খেয়ে নেন।

পারিপার্শ্বিক সব কিছু ভেবে আমি একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছি।

-খালা আমি পরশু ভোরে চলে যাবো।

শুনে খালা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,

-কেন বাবা, কোন সমস্যা হচ্ছে ?

শেফালী মাথা নিচু করে খেয়ে যাচ্ছ্, নির্বিকার।

-কি যে বলেন! আসলে আমাকে ফিরে যেতে হবে, আপনারা জানেন এখন আমার কি করতে হয়। আমি এখানে আপনাদের যত্ন আত্তির মধ্যে থাকলে কি আমার দায়িত্ব পালন হবে, খালা ?

-তোমার ইচ্ছে, বাবা ।

পরিবেশটা পুরোই পাল্টে কেমন যেন থমথমে হয়ে মনে হলো, কিন্তু কেন এমন হবে? আমি কেন লুকিয়ে আছি, ক’দিন পর চলে যাবো-এটা সবাই জানে ; তারপরও কেন এটা নিয়ে একটা গুমোট পরিবেশের সৃষ্টি হবে!

আমার কাছে তখন মনে হয়েছিলো, এই যে সম্পুর্ণ অচেনা , জান হাতে নিয়ে বেড়ানো একটা যুবককে মায়া মমতার বাঁধনে জড়ানো , এটা একটা প্রহসন ছাড়া আর কিছুই না। আমি কিছুদিন আগে এ রাস্তায় ঘুরে এসেছি ; মাঝপথে এসে মুখ থুবড়ে পড়তে হয়েছে। সে পথে আবার? কোন ভাবেই না। কোন কিছুতে জড়াবার আগেই আমাকে সরে যেতে হবে ; আমি আরো ৩/৪ দিন থেকে যেতে পারতাম কিন্তু মনে হলো ঘটনা অন্য দিকে মোড় নিচ্ছে । এটা আমাকে থামাতে হবে।

খাওয়া শেষ হলো, আমি ঘরে ফিরে এলাম। একটা বই পড়ছিলাম, মনে হয় মেম সাহেব। মন বসাতে পারছিলাম না , কি আশ্চর্য্য ।

এ ভাবেই সেদিন গেলো; আমজাদ সাহেব এবং মামাকে বুঝিয়ে বলতে হলো।পরদিন মানে চলে যাবার আগের দিনের দুপুরের ঘটনা:

খাওয়ার ঘন্টা খানেক পর আমার ঘরের দরজায় একটা ছায়া-শেফালী দাঁড়িয়ে।

-আপনার সঙ্গে কি আর কখনো দেখা হবে? সরাসরি প্রশ্ন।আমি একটু বিব্রত,

-আমি জানিনাতো …।

-আচ্ছা, বলে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো।

-বইগুলো পড়তেও পারলেন না। আপনি সঙ্গে করে নিয়ে যান।

আমি ওর দিকে সরাসরি তাকালাম..সে চোখ নামিয়ে নিলো ।

-ধন্যবাদ, আমার পড়ার সময় হবে না।

-ও , আচ্ছা, আমি যাই। নিজের যত্ন নেবেন।

-তুমিও নিরাপদ থেকো, ভালো থেকো।

রাতে খাবার টেবিলে কোন কথা হলো না তেমন। মামা বাসের টিকেট করে রেখেছিলেন ।বাস ছাড়বে সকাল সাতটায়।

প্রথমদিনের মতো সেদিন ভোর রাতে আমার ঘুম ভেঙ্গে গেলো, কানে এলো হারমোনিয়ামের বাজনার সঙ্গে একটা গান:

“মরমীয়া তুমি চলে গেলে

দরদী আমার কোথা পাবো

কারে আমি এ ব্যথা জানাবো…”

চমৎকার গায়তো!

বুকটা ভেঙ্গে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো।

নাহ্ , এ পথে আর না ।

গানটা শুনতে শুনতে আমি রেডী হতে লাগলাম। খালা নাশতা খেয়ে যাবার জন্য বারবার পীড়াপীড়ি করছিলেন, আমি না করে দিলাম। আর মায়া বাড়ানোর সুযোগ দিতে চাচ্ছিলাম না।

বেরেটাটা জায়গামতো লুকিয়ে নিলাম।

মামা একটা রিক্সা বলে রেখেছিলেন।

গান থেমে গেছে অনেক আগেই; আমজাদ সাহেবের পরিবার বাড়ীর সামনে জড়ো হয়েছে, আমি খালাকে এবং আমজাদ সাহেবকে সালাম দিয়ে মিন্টুর গালটা টিপে আদর করে দিলাম.. শেফালীর দিকে তাকিয়ে বললাম , আসি । শেফালী কোন কিছুই বললো না ।

আমি মামার সঙ্গে রিক্সায় উঠে বসলাম, প্যাডাল মারতেই রিক্সা চলা শুরু করলে বুকটার কোন এক কোণে একটু খচ করে উঠলো? হায়রে মায়াময় মনুষ্য জীবন।

স্বাধীনতার পর আমি একবার এসেছিলাম ওই বাড়িতে; বাড়িটি অগ্নিদগ্ধ মনে হলো। আমি চলে আসার দিন দশেক পর মামারও অন্যত্র বদলী হয়ে যায়-এটা পরে জেনেছিলাম।আশেপাশের লোকের কাছে জানতে পারলাম মুক্তিযোদ্ধাদের নানা ভাবে সাহায্য করার অভিযোগে রাজাকারের সহায়তায় মিলিটারিরা সবাইকে ধরে নিয়ে যায় এবং দুটো বাড়ীতেই আগুন লাগিয়ে দেয় । আমজাদ খানের পরিবারের কোন খবর কেউ জানে না ; যে রাজাকার তাঁদের ধরিয়ে দিয়েছিল তাকে কাদেরীয়া বাহিনী মেরে ফেলে ।

এটাকে কি বলে ? ক্রাশ?

নাকি মেশিন গানের ব্রাশ ?

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]