আমার প্রথম নজরুল সঙ্গীতের শিক্ষক

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সাগুফতা শারমীন

খুব কড়া শিক্ষক ছিলেন, খুব কড়াকড়ি ছিলো সুরের বেলায় উচ্চারণের বেলায়। একটা ছোট্ট পুরু খাতা ছিলো তাঁর, ব্যবহারে ব্যবহারে প্রায় শতচ্ছিন্ন। বয়সে বড়রাও তাঁকে সমীহ করে চলতেন, খুব আদবকায়দা বজায় রাখতেন। সুর মুখস্থ করে বাড়ি গিয়ে নিজে নিজে হারমনিয়মে তুলতে শিখিয়েছিলেন।

আমার প্রথম নজরুল সংগীতের শিক্ষক।
আমি ছিলাম তাঁর ক্লাসে সর্বকনিষ্ঠ ছাত্র।
মাঝে মাঝে ছাত্রদের জিজ্ঞেস করতেন, চাঁচড় মানে কী, ঘুমতি নদী কী… আমি পারতাম, খুব অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখতেন ক্ষুদে ছাত্রকে। গানের ক্লাসে বসে ছবি আঁকতে থাকলে কতই না বিরক্ত হতেন। প্রায় ধমকে উঠতেন, “কাঁঠাল কি? গাইতে হবে ‘আমকাঁটালের মধুর গন্ধে জ্যৈষ্ঠে মাতাও তরুতল’…”

আপনার গাওয়া পুরনো দিনের গানের একটা লাইন আমার মাথায় হর মৌসুম ঘোরে… ফাগুন হাওয়ার মতো আমি বলবো তোমার কানে গো বলবো গানে গানে, মোর অনেক দিনের আশা আমি বলবো গানে গানে।
প্রায়ান্ধকার একটা ঘরে চটের কার্পেটে বসে আমরা শিখতাম…বিজলিতে কে দূর বিমানে, সোনার চুড়ির ঝিলিক হানে…
গুমগুম করে তবলা বাজতো আর আমরা হৈহৈ করে গাইতাম…বাজ রে বীণা বাজ, দীপক তানে বাজ। নবীন আশা জাগলো যে রে আজ। নূতন রঙে রাঙা তোদের সাজ।
বড় মমতায় আঙুল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সুর তুলে দিয়েছিলেন… তুমি দেখাইলে মহিমান্বিতা নারী কি শক্তিমতী, চাঁদের কন্যা চাঁদ সুলতানা চাঁদের চেয়ে জ্যোতি।

আপনার মাথার কাছে একটা জানালা ছিলো, জানালায় কলাবতী ফুলের ঝোপ। সুর করে আমরা গাইতাম ‘নিখিলের চিরসুন্দর সৃষ্টিইইইই’। আপনি হাসতেন না। একেবারেই না। এই যে আপনার সবচেয়ে ছোট ছাত্র গাইতো…মন কি মোরগ পাউ ম্যায়, খাজা কে দরবার যাউ ম্যায়… আপনি শুধু বলতেন, মন কি মুরাদ মন কি মোরগ হয়ে গেল?

মৃত্যুপরবর্তী যাত্রায় কোনো পুঁটুলি বেঁধে নিয়ে যাওয়া যায় না, নইলে আপনাকে আমার আন্তরিক অভিবাদন আর অশ্রু সঙ্গে করে দিতাম।

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]