আমার প্রথম প্রেম…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শাহিদা আরবী ছুটি

ফেইসবুক।সবার কাছেই জনপ্রিয় এই শব্দটি। তাই প্রাণের বাংলায় আমরা সংযুক্ত করলাম ফেইসবুক কথা বিভাগটি।এখানে ফেইসবুকের আলোচিত এবং জনপ্রিয় লেখাগুলোই  আমরা পোস্ট করবো।আপনার ফেইসবুকে তেমনি কোন লেখা আপনার চোখে পড়লে আপনিও পাঠিয়ে দিতে পারেন আমাদের ই-মেইলে।

মায়ের সঙ্গে রুমী এবং জামি দুই ভাই

আমার বয়স তখন ১৬, মাত্র এস এস সি পরীক্ষা দিয়েছি। বয়সটা এমনতেই ভয়াবহ, তার উপর আমি সারাজীবন ছিলাম হোস্টেলে। হোস্টেল থেকে মেট্রিক পরীক্ষার পর ছাড়া পেয়ে যখন বাসায় আসলাম, তখন আমার জীবনের একটাই উদ্দেশ্য – তা হলো যেমনেই হোক একটা প্রেম করতে হবে. কারণ মেট্রিক পাস্ করলে, কলেজে আবার হোস্টেলে চলে যাবো, তাই সময় আছে হাতে মাত্র ৩-৪ মাস।এর মধ্যেই কিছু একটা করতে হবে..

সেসময় মোবাইল ফোন ছিলোনা,আর চাইলেই ধুম ধাম করে প্রেম ভালোবাসা হয়না। তখন প্রেম করার জন্য বাসার বারান্দা আর ছাদ এ দাঁড়িয়ে ট্যাংকি মারাই ছিলো আমার জেনেরাশনের একমাত্র ভরসা।
আমার বাসায় হাটা-হাটি করা টাইপ কোনো ছাদ ছিলোনা – ছিলো টিনের চাল, সেই বাসায় বৃষ্টির দিনে টিনের চালে বৃষ্টি শুনতে শুনতে আমার কিশোরী মনে ব্যাপক প্রেম উঁকি মারলেও সেটা বাস্তবায়িত করার ‘নো ওয়ে’ –
যদিও আমাদের একতলা বাসার একটা বারান্দা ছিলো, সেই বারান্দার চারপাশে ছিলো শুধু গাছ আর গাছ, আর আমাদের বাসার চার পাশটায় ছিলো অনেক উঁচু প্রাচীর। তাই আশে-পাশে অন্য কোনো বারান্দার, অচেনা অজানা ছেলের প্রেমে পরে মন আকু পাকু করার কোনো উপায় নেই. তবুও মাঝে মাঝে বারান্দায় আমি বই আর চায়ের কাপ নিয়ে বসতাম…।

তখন আমার ভাইয়া মুখ গম্ভীর করে বারান্দায় এসে বলতো
‘বারান্দায় বইস্যা বইস্য্ চায়ের কাপ আর বই নিয়ে সিনেমা করস? যা ভিত্রে যা।’- আমাকে তখন সিনেমার সেট ফেলে ঘরের ভেতর চলে যেতে হতো। আমি এবং আমার বোন বারান্দায় যেতে পারতাম শুধুমাত্র রাতের বেলা কারেন্ট চলে গেলে ,কারণ তখন অন্ধকারে বসে থাকা দুইটা সুন্দরী মেয়ের সঙ্গে কেউ ট্যাংকি মারতে পারবে না।

এতো রেস্ট্রিকশন , এতো বন্দি জীবনে থাকার পরও আমি শেষ মেশ প্রেমে পড়লাম। আমার প্রথম প্রেম !! মানুষের প্রথম প্রেম হয় – লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট টাইপ’- আমার হলো স্টোরি এট ফার্স্ট রিড।

ছোট্ট রুমী

আমি ওর গল্প, ওর মায়ের মুখে প্রথম শুনে, ওর প্রেমে পরে যাই। তারপর আমি বার বার ওর মায়ের মুখে ওর গল্প শুনি – ওর মায়ের অন্য সব গল্প বলার সময় আমি উদাসীন থাকি , অনেক ডিটেইল মিস করি শুধু ওর মা যখনই ওর নাম নেন, আমি আমার বড় বড় চোখ আরো বড় করে ওর গল্প শুনি।

প্রথম যেদিন আমি ওর গল্প শুনি, ওকে অল্প একটু জানি, সেদিন সারারাত আমি ওর জন্য কান্না করি. এরপর প্রতিদিন ওর একই গল্প শুনে আমি কান্না করি – রাতের বেলা।কেউ যেন না দেখে। কেউ এই প্রেমের কথা জানলে আমাকে পাগলা গারদে দেবে। ভাইয়া বলবে ‘সিনেমা করস? শাবনূর তুই?বালিশ চাইপ্পা কান্দোস?’

সেই সিনেমা টাইপ প্রেম মনে নিয়ে, মেট্রিক পাস্ করে আমি কলেজে চলে যাই। কলেজে থাকতে আমি ওর সব তথ্য, ওর বন্ধুদের তথ্য জোগাড় করে ফেলি – ওর বাসার ঠিকানা, ওর ছবি, ওর প্রিয় গানের শিল্পী, ওর প্রিয় পোশাক, ওর প্রিয় খাবার – সওব – সব কিছু -তারপর একসময় কলেজ শেষ করে ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হই। ভাইয়াও আর দেশে নাই বিদেশ থাকে। সব মিলিয়ে আমি স্বাধীন।

শুরু হয় আমার প্রেম – প্রথমেই আমি ওর বাসায় যাই। এলিফ্যান্ট রোডে ওর বাসার আসে পাশে, পাড়ার বখাটে ছেলেদের মতন ঘুরাফিরা করি। ওর বাসা দেখি – দেখতেই ভাল্লাগে –

তখন, আমার এক ইউনিভার্সিটির ছোট ভাই বললো ছুটি আপু – ‘এম্নে আসে পাশে ঘুরেন কেন , চলেন বাসায় নিয়া যাই। উনার বাসা সাধারণ মানুষের জন্য খোলা থাকে দিনের একটা নির্দিষ্ট সময়ে, সেই সময়ে যাবো। ‘

অবশেষে একদিন আমরা গেলাম ওর বাসায়।….. বাসার চৌকাঠে পা দেয়া মাত্রই আমার কান্নার শুরু – আসে পাশে দুনিয়ার মানুষ তাকায়া ছিলো. আমার ফুঁপানো কান্না একসময় হিচকি দেয়া টাইপ এ পরিণত হলো। আমি গেলাম না। .. সেই সময় আমার সেই ভার্সিটির ছোট ভাই বলছিলো ,’ শুধুমাত্র বই পড়ে, কেউ কারো এতটা প্রেমে পড়তে পারে? যুদ্ধ- মুক্তিযোদ্ধা এগুলোর প্রতি আমাদেরতো ভালোবাসা থাকেই – তাই বলে ‘শহীদ রুমির’ নাম এভাবে বুকে ধারণ করেন আপনি ?’

শফি ইমাম রুমী

প্রথম প্রেম -প্রথম প্রেমই। বারান্দার রেস্ট্রিকশন না থাকলে হয়তো অন্য ঘটনা হতো – মেট্রিকের পর তিনমাস হাজারো বই না পরে , একটা দুইটা রক্ত মাংসের মানুষের সঙ্গে প্রেম হয়ে যতো। কিন্তু আমার প্রথম প্রেম হলো – শহীদ জননী জাহানারা ইমাম এর বড় সন্তান – শাফি রুমী ইমামের সঙ্গে।
আমাকে যারা ব্যক্তিগত ভাবে চিনে – স্পেশালি আমাকে কিশোরী বয়স থেকে যারা চিনতো – জানতো – তারা জানে – রুমীর সঙ্গেই আমার প্রথম প্রেম – যদিও ওয়ান সাইডেড , তবুও সে প্রেম ছিল মাথা আউলা করা প্রেম।

সেই প্রেম ‘হাগ -কিসি’ টাইপ এইযুগের প্রেম না। সেই প্রেম ছিলো – ওর অনুপস্থিতে, ওর ঘরে যেয়ে, ওর নতুন কলেকশনের এলভিস প্রিসলির রেকর্ডটায় আলতো করে ছুঁয়ে দেয়া …সেই প্রেম ছিল, ওর জন্মদিনে ওর মায়ের সঙ্গে রান্নাঘরে বার্গার বানাতে বানাতে ওর গল্প করা,জন্মদিনে ওর মায়ের মুখে ওর গল্প শুনতে শুনতেই – ওর প্রিয় ভ্যানিলা ফ্লেভারের কেক বানানোর প্রিপারেশন নেয়া –

শুভ জন্মদিন রুমী। আপনি বলেছিলেন ”যদি চলেও যাই, কোন আক্ষেপ নিয়ে যাব না”.. আমার আজও আপনার মতন এতো আর কোনো  সাহসী পুরুষের কথা জানা হয়নি।

বনানীর এই দুর্ঘটনার পর সবাইকে ‘হ্যাপি ফ্রাইডে”’সবাই ভালো থাকেন’ এগুলো বলা যায়না। আমি ঠিকমতন সমবেদনা জানাতে পারিনা, আবার একইসঙ্গে দেশকে, দেশের সার্ভিস কিংবা সিস্টেমকে বাপ মা তুলে গালি দিতেও আমি পারিনা। তবুও বলি, রুমীর মতন সাহসী পুরুষেরা নিশ্চয়ই এমন একটা দেশ গড়ার স্বপ্ন দেখে নিজের জীবনোৎসর্গ করেনি।

কাভার ছবিটা আমার ১৬ বছরের আমি আর সেই সময়কার দুর্দান্ত রুমী ।

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]