আমার বন্ধু দীপংকর

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

পোস্টবক্স। ফেইসবুকের একটি জনপ্রিয় গ্রুপ। এবার প্রাণের বাংলার সঙ্গে তারা গাঁটছড়া বাঁধলেন। প্রাণের বাংলার নিয়মিত বিভাগের সঙ্গে এখন থাকছে  পোস্টবক্স-এর রকমারী বিভাগ। আপনারা লেখা পাঠান পোস্টবক্স-এ। ওখান থেকেই বাছাইকৃত লেখা নিয়েই হচ্ছে আমাদের এই আয়োজন। আপনারা আমাদের সঙ্গে আছেন। থাকুন পোস্টবক্স-এর সঙ্গেও।

মারুফ জাকারিয়াহ

 ‘মুক্ত কর ভয়, আপন মাঝে শক্তি ধরো, নিজেরে কর জয় …’অন্তরত্মায় উদ্দীপনা ও জীবনী শক্তি সঞ্চালক কবি গুরুর এই চরণটি প্রথম শুনেছিলাম ল্যাবরেটরি স্কুলে ক্লাশ টু’তে অত্যন্ত কোমলমনা সুদর্শন আমার বন্ধু দীপংকর বিশ্বাসের কাছ থেকে। সুযোগ পেলেই ও ডেস্কে আংগুল দিয়ে তবলা বাজিয়ে পুরো গানটা গেয়ে শোনাতো। আবার প্রতিটি চরণের বিষদ ব্যাখ্যাও দিতো, ঐ বয়সে! মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনতে শুনতে কখন যে আমিও গুনগুন শুরু করেছিলাম টের না পেলেও পুরো গানটি আমার মনের Read Only Memory (ROM) এ স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে, সেটা স্পষ্ট। আমি সপ্তম শ্রেনীতে ল্যাবরেটরি স্কুল ছেড়ে ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজে চলে যাই। তারপর আর কোনদিনই দীপংকরের সঙ্গে আমার দেখা হয়নি। হয়নি দেখা অধিকাংশ ল্যাবরেটরি স্কুলের বন্ধুদের সঙ্গে বহু বছর। তিন চার বছর আগে থেকে আবার নতুন করে আমার প্রথম স্কুলের বন্ধুদের সঙ্গে সম্পর্ক ফিরে পেয়েছি, কিন্তু পাইনি দীপংকরকে। ও নাকি কোলকাতায় থাকে। পেশায় ফুটবল কোচ! অনেক যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও ওর কোন সাড়া মেলেনি। কি ওর অপারগতা, কোন কষ্ট চেপে ও এমন নিভৃতচারী তা জানা না গেলেও, আমি প্রতিজ্ঞা করেছি কখনো ওকে কাছে পেলে, ওর শোনানো চরণ গুলি ওকে শ্রবণ করিয়ে ফিরিয়ে আনবো ওর আপন বলয়ে, নিজ বাসভূমে।

বহু চরাই উতরাই, ঘাত প্রতিঘাত পেরিয়ে সুদীর্ঘ জীবন যাপন করেছি। যুবা বয়সে প্রতিটি প্রতিকুলতা, প্রতিবন্ধকতা আমাকে করেছে চূর্ণ, ছিন্ন বিচ্ছিন্ন। কাছের মানুষের হৃদয়হীনতা, যন্ত্রণা, শঠতা আমাকে করেছে কক্ষচ্যূত, ধ্বংস। তারুণ্যের আবেগ ক্ষতি ছাড়া কোন লাভের মুখ দেখাতে পারেনি। তবে শত প্রতিকূলতার মাঝেও মুখের হাসিটি ধরে রেখেছি বাল্য বন্ধু দীপংকরের কাছে শোনা চরন গুচ্ছ হৃদয়ে ধারণ করে। আস্তে আস্তে সময়ের সঙ্গে বয়স বেড়েছে, বেড়েছে পরিপক্কতা। অর্ধেক খালি গ্লাসকে অর্ধেক পূর্ণ হিসেবে খুঁজে পাবার চেষ্টায় রত হয়েছি। পেয়েছিও অন্তহীন শান্তি। অতীত কে ভুলে, অনাগত অনিশ্চিত ভবিষ্যৎকে নিয়ে দুশ্চিন্তা না করে বর্তমানকে উপভোগ করতে শিখেছি। জন্মগত ভাবে অত্যন্ত আবেগ প্রবণ ও স্পর্শকাতর এই আমার মস্তিষ্ক স্বয়ংক্রিয়ভাবে তৈরী করেছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি। যা কোন বিপর্যয়কেই বেশীক্ষণ সক্রিয় থাকতে দেয় না! ঘটনা বা দুর্ঘটনায় সৃষ্ট অস্থিরতাকে নিস্ক্রীয় করে মনকে নিয়ে আসে জীবনের ধনাত্মক সুখের আর ভোগের বলয়ে। কি নেই তা ভুলে কি আছে তাকে ভোগ করে ডুবে যাই সুখের অতল সাগরে। গত চৌদ্দ পনেরো বছর এভাবেই পার করেছি। নিজেকে সুখী মানুষ হিসেবে মনে করেছি, প্রকাশও করেছি এভাবে আপনাকে সবার মাঝে। কষ্টের মাঝেও সুখ খুঁজে পেয়েছি। একবার ফেবুর এক পোস্টে এমন বলাতে সবাই তারিফ করলেও দু’একজন ‘বেশী ভাল ভাল না’ মনে করিয়ে দিতে ছাড়েননি। কারো কুনজরের কারনে না, সৃষ্টির অলংঘনীয় নিয়মে জীবন চক্রে আবারো পড়েছি শনির বলয়ে। অহেতুক কৃত্রিম দুঃখ তৈরী করে অসহ্য যন্ত্রণাকে সাদরে লালন করেছি। দুধ কলা দিয়ে সেই বেদনাকে পুষে হাত পা গজিয়ে বড় করেছি। দুঃসহ যন্ত্রণাকে সইতে না পেরে যখন প্রাণ যায় যায় অবস্থা। তখন অতীতের মত সকল সৃষ্টির একমাত্র অবলম্বন সৃষ্টিকর্তার স্মরনাপন্ন হয়েছি। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ভোজবাজির মত আবারো গ্লাসের অর্ধেক পূর্ণতাকে ফিরে পেয়েছি। আমার জন্য তৈরী দুঃখের বাড়িতে সফর ইতি টেনেছি।

পাঁচ ছ’মাস দুঃখের সমুদ্রে নিমজ্জিত থেকে যখন সুখের তীরে উঠে জীবনের প্রতিটি মূহুর্তকে উপভোগ করতে শুরু করেছি, তখনই এলো আমার সুদীর্ঘ উনত্রিশ বছরের পেশা জীবনের উপর সম্পুর্ন অপ্রস্তুত অবস্থায় অকল্পনীয় আঘাত। আমারতো প্রাণহীন দেহ নিয়ে চলমান পাথর হয়ে যাওয়ার মত অবস্থা। অনেকেই জানতে চাইলো এমত অবস্থায় আমি শান্ত আছি কিভাবে! ওঁদের অমন হলে কি যে করতেন! এরপর সবাই ব্যস্ত নিজ নিজ কর্মকান্ডে। এটাই স্বাভাবিক। জীবন চলমান। কারো জন্য কিছু থেমে থাকতে পারেনা। তবে আমি আশ্চর্য হয়ে লক্ষ করলাম যে আশংকাকে দীর্ঘ পেশাজীবনে ভয়ে কখনো মনে স্থান দিতে সাহস পেতাম না, এমন হলে কি হবে, কি করবো এসব ভেবে! তাই ঘটে যাওয়ার পর আমার মন অস্থিরতাকে বেশীক্ষণ প্রশ্রয় না দিয়ে স্থিরতা ও শান্ত চিত্তকে বসিয়ে দিলো পাহাড়াদারের আসনে। যাত্রার বিবেকের মত কেউ আমার মনকে বাড়ে বাড়ে বাধ্য করে চলছে এই বলে – ‘জীবন অনেক ছোট। দুঃখ টুঃখ না খুঁজে, যা আছে তাই নিয়ে উপভোগ কর প্রতিটা ক্ষণ। কাল কি হবে জান না, তাই অযথা ভয় না করে বর্তমানের পাওয়া অমূল্য সম্পদগূলো উপভোগ কর।’

আমিও বাধ্য ছেলের মত তাই করছি। জীবনে বহুবার এমন হয়েছে যে মনে করেছি, এটাই শেষ। আর আগানোর কোন উপায় নেই। কিন্তু প্রতিবারই আল্লার অশেষ রহমতে অকল্পনীয় কোন পথ তৈরী করেছেন তিনি। তাই আমি আর এখন নৈরাশ্যবাদী নই। ঘুটঘূটে অন্ধকারেও আলোর সন্ধান পাওয়ার আশা ছাড়িনা। নিজেকে ছাড়া কাউকে দোষারূপ করিনা। এতেই মঙ্গল আমার বিশ্বাস। মনে পড়ে সেই ছোট্ট দীপংকর বিশ্বাসকে, যে আমাকে ভয় মুক্ত করা শিখিয়েছিলো। এই জীবনে আরেকবার দেখা হলে ওকে জানাতাম আমি তোর শিক্ষাকে কাজে লাগাতে পেরেছি। তুই পারছিস না কেন?

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]