আমার বাচ্চাটিকে, আমার বোনটিকে একবার দেখতে চাই

সুমন সুপান্থ

(ইংল্যান্ড থেকে): তারা খসায় কোনওদিনও বিশ্বাস ছিলো না আমার, তবু এই জীবনে অসংখ্যবার তারাদের খসতে দেখেছি আমি। প্রথমবার দেখেছিলাম এক টলটলে স্বচ্ছতোয়া জোছনার রাতে। উঠোনে মৈন মৈন খেলছিলাম আমরা। আমি, বেলভী আপা, লিপি আপা, সেলিম ভাই, হাসনা খালা। আর আম্মাও বোধকরি। বাড়ির বড়দের মধ্যে আমার তরুণী মা’ই একমাত্র জন, যিনি

সন্দীপন বসু

সব সময় ছোটদের সব আয়োজনে যুক্ত থাকতেন। বড়চাচী ছিলেন প্রথাগত। এসবে তাঁর ঘোরতর আপত্তি ছিলো। চাচারা তো একেকজন যমের মতো ভীতিজাগানিয়া। তবে এসব কোনো প্রতিবন্ধকতাই পূর্নিমার রাতগুলিতে আমাদের মৈন খেলার বাধা হতে পারেনি কোনোদিন।

অদ্ভুত কল্পনামদির খেলা এই মৈনমৈন। ভারী সুন্দর তার কেতাব কায়দাও। থইথই জোছনারাতে খেলতে হয় মৈন মৈন। খেলোয়াড়দের মধ্যে যিনি বয়োজ্যেষ্ঠ আর খানিকটা নিরপেক্ষ বলে বিবেচিত, তিনি হতেন মৈনওয়ালা। মানে তিনি উঠোনের মাঝখানটায় দাঁড়িয়ে ছড়া বলতে বলতে হাতের মৈনগুটি ছুঁড়বেন কোন এক দিকে। ছোঁড়া শেষ হলে ছড়ায় ছড়ায়ই আবার ধারনা দিয়ে দিবেন যে কোনদিকে তিনি হাতের মৈনগুটিটি ছুঁড়েছেন। তার আগ পর্যন্ত বাকী প্রতিযোগীরা জোড়ায় জোড়ায় মুখোমুখি দাঁড়িয়ে হাত দিয়ে প্রতিপক্ষের চোখ বন্ধ করে রাখবে। মৈনওয়ালা ঘোষণা দেবার আগে চোখ খোলা বারণ। কেবল গুটি পতনের শব্দ আর মৈনওয়ালার ছড়া শুনে ধারণা যেটুক করা যায়, সেটুকু সম্বল করেই চাঁদের আলোয় মৈনগুটি খুঁজতে যাবে বাকী সবাই। যিনি পাবেন, তিনি হবেন পরের রাউণ্ডের মৈনওয়ালা। কিন্তু যেহেতু আম্মাই একমাত্র বড়দের প্রতিনিধি, এই খেলায়। দাদীর ধমক যেহেতু আম্মারই সামাল দিতে হয় — আর সবচেয়ে বড়কথা মৈন-ছড়া যেহেতু আম্মার সবেচেয়ে বেশি মুখস্থ; কাজেই আম্মা সব রাউণ্ডেরই অনারারী মৈনওয়ালা। এটাই অঘোষিত নিয়ম ছিলো।
বহুদিন পর একটা কবিতাও পড়া হয়েছিলো কোথাও, মৈন মৈন খেলা, আর খেলার শ্লোক নিয়ে —

” পুবে গেলে পাবে চান পুন্নিমার।
দক্ষিণে গেলে হাওয়া।
উত্তরের মৈনগুটি, পশ্চিমে যাবে না পাওয়া!”

আশ্চর্য, এই কবিতার লেখকের নামও সুমন সুপান্থই!

অমন এক ঢুলুঢুলু রাত। যেরকম রাতের ‘চন্দনী’ মানুষকে অকারণেই অচেনা আর স্বপ্নাচ্ছন্ন করে তোলে। ক্ষণিকের জন্য তার পাপ-তাপ শুষে নেয়। তার উপর যদি থিরথির হাওয়া বইয়ে দেয়। তখন মৈন খেলায় মগ্ন কোনো সরল আর গ্রাম্য কিশোরের হঠাৎই মনে হতে থাকে রাজকুমার সিদ্ধার্থ তো বটেই, এই যে ‘বি কম চাচা’ বহুদুরের নিজের গ্রাম ছেড়ে এই বাজারে এসে পড়ে রইলো সারাটি জীবন, তাকে ঘরছাড়া করায় এই চান্নি-পসর রাইতের প্ররোচনা নিশ্চয়ই কম নয়!
তেমন আরেক ঢুলুঢুলু রাতেই, মৈনগুটি খুঁজতে গিয়ে প্রথমবার স্পষ্ট করে তারা খসতে দেখি। তখন সাথীর শেখানো কথা মনে পড়ে আমার। সাথীদের বাড়ি ছিলো গ্রামের একেবারে উত্তরে। বিকেলে আমাদের সঙ্গে খেলতে আসতো। আর আমাদেরই স্কুলে এক ক্লাস নিচে পড়তো। তার বাবা কাকারা ভিটেমাটি ফেলে ইণ্ডিয়া চলে গিয়েছিলো হঠাৎ একরাতে। সে অন্য এক গল্প। আরেকদিনের জন্য তোলা থাক্। তো, খুব গোপন কিছু শেখাচ্ছে এমন এক ভঙ্গিতে সাথী বলছিলো অনেকদিন আগে, “কোনদিন তেরা পড়ি যাইতে দেখলে মনে মনে কিছু চাইবে। যা চাইবে, ওটাই পাইবে”। বিশ্বাস করেছিলাম। কিন্তু ওই মুহূর্তে দ্রুত পতনোন্মুখ উজ্জ্বল খন্ডটি দেখেও কিছু চাইতে ইচ্ছে হয় নি কেন জানি। মানুষের জীবন কখনো সখনো হয়তো এতোটাই ভরপুর থাকে, এতোটাই উপচানো, মনে হয় চাইবার আর কিইবা থাকতে পারে! তারপর যতো বড় হতে থাকে কিংবা বুড়ো, তার চাইবার লোভ যায় বেড়ে। সব কিছু শুন্য হতে থাকে। হাহাকার বাড়ে। তখন নিশ্চয়ই কেউ কেউ গোপনে অমন জোছনা প্লাবিত রাতে বারবার আকাশে তাকায়। ইশ যদি একটা তারা খসতো!

খুব সুন্দর একটা চাঁদ উঠে আছে ভিক্টোরিয়া রোডের মাথায়। অনেকগুলো তারাও ফুটে আছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। দূরে গাড়ি পার্ক করে হেঁটে হেঁটে বাড়ি ফিরছিলাম। মার্চের যে হিম মিশে থাকবার কথা হাওয়ায়, তা নেই। হাঁটতে মন্দ লাগছে না। শুঁড়িখানায় কিছু মানুষের হল্লা শোনা যাচ্ছে। গান গাইছে কেউ বেসুরো গলায়। কেউ চিৎকার করে থেরেসা মে র চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করছে ব্রেক্সিট ইস্যুতে। আর দূরে প্রস্পেক্ট কারপার্কের খোলা চত্বরে বুকে হাত দিয়ে, চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে মাতাল বৃদ্ধ লোকটি। বিড়বিড় করে বলছিলো কিছু। তবে কি একটু আগেই খসে গেছে কোনো তারা? লোকটি তাঁর জীবনসায়াহ্নে এসে নিজের রিক্ততা টের পেয়ে মনে মনে চেয়ে নিয়ে নিলো কিছু?
আমি কেন দেখতে পেলাম না! কেন মিস হয়ে গেলো! আবার কী একটা তারা খসবে?
অনতিদূরে আমিও ঠিক ওঁর মতো করেই বুকে হাত জড়ো করে দাঁড়িয়ে পড়ি। আকাশে তাকিয়ে থাকি দু জন ভেতর-ফাঁকা মানুষ। আমাদের একই রকম ভঙ্গি। একই বাসনা। তবে এবার আর ভুল হবে না আমার। এবার চাইবার আছে আমার। শুধু তারাটা পড়ুক,বৃদ্ধ লোকটি কিছু চাইবার আগেই আমি দিব্যি চেয়ে নিবো — আমার বাচ্চাটিকে, আমার বোনটিকে একবার দেখতে চাই!

ছবি: লেখকের ফেইসবুক ও সন্দীপন বসু