আমার বাবা-মা…

আশিকুজ্জামান টুলু,মিউজিশিয়ান

আমার বাবা

আমার বাবা ওস্তাদ মুন্সী রইসুদ্দিন।আমি আমার বাবাকে পেয়েছিলাম তাঁর ৬৪ থেকে ৭৩ বছর পর্যন্ত। মাত্র ৯ বছর আমি পেয়েছিলাম আব্বাকে । এই নয় বছরের মধ্যে নিজের অস্তিত্বকে বুঝতেই হয়তো পার হয়েছিলো আর ৩ বা ৪ বছর, অর্থাৎ মাত্র ৫ বছর আব্বাকে ছুঁয়ে দেখার সুযোগ ছিল।আজ পর্যন্ত উনার সঙ্গের প্রতিটা স্মৃতি কড়কড়ে নতুন নোটের মতো মনের পকেটে সযত্নে ভাজ করে রেখে দেয়া আছে । চোখ বন্ধ করলেই দেখতে পাই আব্বার প্রতিটা বিষয় । আম্মার জন্য কান্না আসে, কাঁদা যায় অশ্রুজল বিসর্জন দিয়ে কিন্তু আব্বার জন্য কান্নাটা বুকের ভিতরেই থেকে যায়, বের হয় না । জানিনা কেন এমন হয়!

গত বছর জানুয়ারি মাসে যখন দেশে গেলাম, তখন আমাদের গ্রামের বাড়ী নাকোলে খুব যেতে চেয়েছিলাম কিন্তু পারিনি । আশে পাশের সবাই এতো প্রতিকুলতা দেখালো যে যাওয়া হয়ে উঠলো না । তবে যদি আবার যেতে পারি, যাওয়ার পর ঘণ্টা খানেক আব্বার ভিটায় কোন একটা ঘরে চুপ করে এবং চোখ বন্ধ করে বসে থাকবো, মন ভরে নিতে চেস্টা করবো ইনার পিসের প্রশান্তিটা ।

খুব নিভৃতচারী ছিলেন আব্বা । পুরান ঢাকার ১৩৬/২ হাজী ওসমান গনি রোডের বাসায় উপুড় হয়ে বুকের উপর শুয়ে শুয়ে সারাদিন লিখতেন মোটা মোটা খাতায় আর আমি ঠিক উনার পাশে শুয়ে বসে খেলা করতাম, ছবি আকতাম । আব্বা হুক্কা খেতেন আস্তে আস্তে টেনে টেনে । বাজার থেকে কিনে আনা হতো তামাক ও কালো কালো টিকা, যেগুলি দেখতে কিছুটা ছোট ছোট বিস্কুটের মতো ছিলো । ফুলতারা কল্কির ভিতরে একটা ছোট্ট ইটের টুকরা দিয়ে ফুটা বন্ধ করে প্রথমে তামাক দিতো । ঐ তামাকটাকেও মাঝে মাঝে বাজার থেকে কেনা তামাকের জন্য ব্যবহৃত এক ধরনের স্পেশাল গাঢ় ঝোলা গুড় দিয়ে মাখানো হতো । এই কাজটা দোকানেই ওরা করে দিতো । সেই তামাক কল্কির মধ্যে দিয়ে তার উপর ৪/৫ টা টিকা দেয়া হতো, একটা টিকাতে আগুন লাগিয়ে দেয়া হতো এবং সেটাই বাকীগুলিকে জ্বালাতো । হুঁকাটা ছিলো পুরানো আমলের, হুঁকাটার মাথায় কল্কিটা লাগানো হতো, একটা লম্বা পাইপ ছিলো সঙ্গে, সেই পাইপটা আব্বার হাতে থাকতো । আব্বা হুঁকাটাকে গড়গড়া বলে ডাকতেন । উনি লেখার ফাঁকে ফাঁকে মাঝে মাঝে টানতেন আর ধোঁয়া ছাড়তেন । আমি সেই ধোয়ার মধ্যে হাত চালাতাম, গন্ধ শুকতাম, ভালো লাগতো গন্ধটা । তখনকার ঐ ধোয়াটায় হাত চালানো কি এক নিশ্চিন্ত জীবনের আনন্দময়তায় পরিপূর্ণ ছিলো । যখনই উনার হুকা খাওয়া দরকার হতো উনি বলতেন, ফুলতারা, একটু তামাক দে ।ফুলতারা আমাদের বাসায় কাজ করতো ।

আব্বা আম্মাকে ‘জামানের মা’ বলে ডাকতেন । জামান আমার বড় ভাইয়ের নাম । আম্মা আব্বাকে ডাকতেন ‘জনাব’ বলে এবং আপনি করে সম্বোধন করতেন কারন আব্বার সঙ্গে আম্মার বয়সের বিরাট একটা ব্যবধান ছিলো । আব্বার ৬৪ বছরের সন্তান আমি এবং আব্বা জন্মেছিলেন ১৯০১ সালে । আম্মার সঙ্গে বয়সের ডিফারেন্স কমসে কম ২৫/৩০ বছর ছিলো । সে কারনে আম্মাকে আব্বা খুব আদর করতেন ছোট মানুষ হিসাবে এবং কথাও কম বলতেন । আম্মার সঙ্গে উনার একেবারে কথাই হতোনা বলা যায় । হয়তো ভাবতেন (আমার ভাষায়) ‘পোলাপানের সঙ্গে বেশী কথা বইলা লাভ নাই, কমু এক, বুঝবো আরেক।’

মা আর আমি

আম্মা শান্তিনগর নিটিং স্কুলের টিচার ছিলেন, সেখানে উনার অনেক ছাত্রী ছিলো । আমাদের বাসায় বিভিন্ন ধরনের সেলাই মেশিন ছিলো । ঐ আমলে আমাদের বাসায় সোয়েটার বোনার মডার্ন নিটিং মেশিন ছিলো, যা দিয়ে আম্মা আমাদের চার ভাই বোনের সোয়েটার নিজের হাতে বানিয়ে দিতেন । আমরা ছেলেবেলায় সোয়াটার বা জামা কাপড়  সব আম্মা সেলাই করে দিতেন । উনি বিরাট বিরাট বোয়াম ভর্তি করে আচার বানাতেন এবং সারা বছর চলতো ঐ আচার দিয়ে । ৩/৪ রকমের আচার বানাতেন- আমের ঝাল আচার, আমের রেগুলার আচার এবং আমের মোরোব্বা । ঐ মোরব্বাটা আমার ভালো লাগতো, বাকীগুলি মুখেও দিতাম না ।

আমার মা

আম্মা উনার সেই কালো বোরখাটা পরে সারা শহর চষে বেড়াতেন, বাড়ী ভাড়া তুলতেন ভাড়াটিয়াদের কাছ থেকে, অফিস আদালতে যেতেন, সবার সঙ্গে হাসি মুখে কথা বলতেন । এছাড়া উনি আবার যখন কোন দাওয়াতে যেতে হতো, সুন্দর করে শাড়ি পরে সেজে গুজে রওনা দিতেন আমাদের নিয়ে । তখন বোরখা পরতেন না । যেখানে উনি মনে করতেন বোরখা দরকার, সেখানে পরে যেতেন । একটা ব্যালেন্স ছিলো সব কিছুর মধ্যে ।উনাদের সময় আজকের মতো গোঁড়ামি বিষয়টা ছিলোনা । আজকালকার অনেক টার্ম আমরা তখন শুনি নাই । উনি ছিলেন একজন Contemporary স্মার্ট স্বয়ংসম্পন্ন মহিলা, যিনি তাঁর দীর্ঘ বৈধব্যকে খুব স্বাভাবিক ভাবে নিজের জীবনের সঙ্গে মিশিয়ে নিয়েছিলেন । আমাদের একদিনের জন্যেও মনে হয় নাই আমার আম্মা বিধবা, আসলে বিধবা বিষয়টা বুঝতেও পারিনি । আমাদের সবাইকে উনি মানুষ করেছেন অসম্ভব স্বাধীনতা দিয়ে যেহেতু উনি নিজেও ভীষণ স্বাধীনচেতা ছিলেন এবং স্বাধীন একটা জীবন যাপন করেছেন ।

সত্তর দশক ।ঐ সময়ের আমাদের বাসাকে বাসা বলা ভুল হতো, বরং ক্লাব ঘর বললেই বেশী মানাতো । বোনের বিয়ে হয়ে গিয়েছিলো ১৯৬৯ সালে । তার পরে সত্তর দশকে আমরা তিন ভাই আর আম্মা – এই ছিলো আমাদের জীবন । কি এক হুলুস্থুলে ভরপুর বাসা, আহা কি সময় । মেঝ ভাই এবং আমি একটা ঘর শেয়ার করতাম,  উনি বেশীর ভাগ সময় শহিদুল্লাহ হলে থাকতেন । বাসায় রাত্রি যাপনের জন্য কালে ভদ্রে আসতেন । আড্ডার সময় শেয়ার করতে হতো উনার সঙ্গে কারন রাতে হলে থাকলেও দিনের কিছুটা আড্ডা উনি বাসায় মারতেন ।উনার ৫/৬ জন বন্ধু নিয়ে আড্ডা শেষ হলে আমার শিফট শুরু হতো। আমার ৫/৬ জন বন্ধু নিয়ে বাসায় তুলকালাম করা । ঐদিকে বড় ভাই উনার ছেলে বন্ধু এবং মেয়ে বন্ধু নিয়ে হৈচৈ করতো উনার ঘরে । আম্মা সেই ছেলে বেলা থেকেই আমাদের বাসায় আমাদের মেয়ে বন্ধুদের অ্যালাও করতেন, কোনদিনও কোন প্রশ্ন করতেন না । এতো স্বাধীনতা, এতো হৈচৈ, এতো আড্ডা, এতো কিছুর পরেও আমরা সব ভাই বোনরা মানুষ হয়েছি, কেউ অমানুষ হই নাই । কথাটা এই কারনে বললাম যে স্বাধীনতা সবকিছু নষ্ট করেনা বরং অনেক সুন্দর সুন্দর জিনিস গড়েও ।আজ যখন এসে আব্বা কিংবা আম্মার কথা ভাবি, খুব সুন্দর সুন্দর স্মৃতি মনের আকাশে এসে জমা হয় আর খুব ইচ্ছা করে আরেকবার ফিরে পেতে আব্বার কোলে চুপ করে বসে থাকার জন্য কিংবা আম্মার কাছে পয়সা চেয়ে ঘ্যানর ঘ্যানর করার জন্য । বাবা মা ছাড়া জীবনটা হাজার আড়ম্বরের মধ্যে থেকেও ভীষণ অসহায় । এই বিষয়টা একমাত্র সে জানে যে হারিয়েছে বাবা মা । তাও একটা কথা ভেবে মনে ভীষণ শান্তি পাই যে অনাদিকালের যাত্রায় আবার যদি দেখা হওয়ার সুযোগ হয়, তাহলে হয়তবা এখনকার মতো হারানোর ভয়টা আর থাকবেনা, যুগ যুগান্তরের জন্য আব্বার পিঠে শুয়ে কিংবা আম্মার কোলে বসে থাকতে পারবো ।

ছবি: লেখক


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box