আমার ভালোবাসার আয়না,আমি তোমাদের ভালোবাসি

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শিল্পী কনকচাঁপা এবার গানের পাশাপাশি প্রাণের বাংলার পাতায় নিয়মিত লিখছেন তার জীবনের কথা। কাটাঘুড়ির মতো কিছুটা আনমনা সেসব কথা, হয়তো কিছুটা অভিমানিও। কিছুটা রৌদ্রের মতো, খানিকটা উজ্জ্বল হাসির মতো।

যে গল্প ধারাবাহিক ভাবে বলে যাচ্ছি সেই সময়ের হিসাব ধরলে তখন ৯৮ সালের শেষের দিকের গল্প এটা।ছবির গানের জন্য মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছি আলহামদুলিল্লাহ। কিন্তু যারা আমার গান শোনেন তারা কতটুকু ভালোবাসেন, কতটুকু পছন্দ করেন, তাদের কোন প্রশ্ন, খটকা আছে কিনা আমি কিছুই জানিনা।কারণ তখন তো এক ল্যান্ডফোন ছাড়া আর পোস্ট করে চিঠি লেখা ছাড়া আর কোন উপায় সেভাবে ছিলো না।আর আমি? গানের জন্য এবং পারিবারিক রক্ষণশীলতার জন্য মোটামুটি বাক্সবন্দি রাজকন্যা!আমার ফোন নম্বর কেউ জানেনা এমনকি পরিবারেরই অনেকের ফোন আমি ধরিনা,না সাংবাদিক না মিউজিক ডিরেক্টর! আমার তাতে কোন অসুবিধা নাই,আমিই আরও রিল্যাক্স থাকি।কারণ প্লেব্যাক, মঞ্চ, টিভি, ক্যাসেট এগুলোর শিডিউল মেলানো আমার পক্ষে কখনো সম্ভব ছিলো না।আমি দর্শক শ্রোতাদের কাছে একদম অস্পৃশ্য অদৃশ্য। তারমধ্যেও হঠাৎ হঠাৎ বাসায় দর্শনার্থী চলে আসে।আমি খুব বুঝে শুনে তাদের সামনে ফর্মালি যাই আবার অল্প সময় কথা বলেই সরে আসি। এমন অবস্থায়ও মাঝেমধ্যে চিঠি আসে আমার বাবার বাড়ির, বোনের বাড়ির ঠিকানায়।কখনো আমার বাড়ির ঠিকানাতেও।অনেক চিঠি আমার হাতে পড়ে,কতক বাদ পড়ে যায়।তো একটা চিঠি এলো সিরাজগঞ্জ থেকে। প্রায় তিরিশ পাতার চিঠি।আবেগ ভালোবাসা ভক্তি শ্রদ্ধা বিস্ময় ভরা সে চিঠি। আমি এবং আমার পরিবারের সবাই আবেগাপ্লুত হয়ে গেলাম। আমার আব্বা বললেন চিঠির উত্তর দাও মাগো।এমন ভালোবাসা স্বর্গীয়। বাসার বাকি সবার একই অবস্থা। আমার সাহেব বললেন শোন তোমাদের সিরাজগঞ্জেরই তো মেয়ে, চলো চিঠির উত্তর না দিয়ে সরাসরি ওদের বাড়িই যাই! আমি চমকিত। যেই ভাবা সেই কাজ।আব্বা আম্মা সহ রওনা দিলাম। সিরাজগঞ্জে শহরেরই আমার চেংটু কাকা থাকেন, তার বাসায় উঠলাম। কিন্তু চিঠি সঙ্গে নিতে ভুলে গেছি! আমার মনে পড়ছিলো, মেয়েটার বাসা শাহজাদপুর। আমরা দুপুরের খাওয়া দাওয়ার পরে রওনা দিলাম। মেয়েটার জন্য একটা গিফট আর কিছু ফল মিষ্টি নিলাম। তারপর শাহজাদপুর পৌঁছালাম । সেখানে গিয়ে মেয়েটির নাম ধরে খুঁজে খুঁজে হয়রান হয়ে গেলাম। আমাদের অসহায় অবস্থা দেখে গাড়ির আশেপাশে লোক জমায়েত হয়ে গেলো। সারা পাড়া এক হয়ে গেলো,গাড়িতে কনকচাঁপা বসা! কিন্তু তারা কিছুতেই মেলাতে পারছেনা এই কনকচাঁপা সেই কনকচাঁপা কিনা আর সত্যিই যদি সেই কনকচাঁপাই হয় তো সে কি এতো বড় শিল্পী হয়ে ভক্তের খোঁজে আসবে! পাড়ার ছেলেরা আমাদের জোর করে একটা বাসায় বসালো আর অদেখা মেয়েটাকে বারবার বকছিল যে এতো বড় শিল্পীকে কেউ ভুল ঠিকানা দেয়! কারণ পুরো এলাকায় ওই নামের কেউ নাই! আমরা নিয়ে যাওয়া ফল মিষ্টি ওই বাড়িতে দিলাম। অনেক বাসা থেকে অনেক নাস্তা চলে এলো। পুরো সন্ধ্যা তাদের আপ্যায়নে কাটিয়ে তাদের অনেক বিস্ময় উপহার দিয়ে আবার সিরাজগঞ্জ ফিরে এলাম এবং পরদিন ঢাকা ফিরলাম। ঢাকা ফিরে সেই চিঠি হাতে নিয়ে বেকুব হয়ে গেলাম। চিঠিতে ঠিকানা লেখা জানপুর–সিরাজগঞ্জ, আমি স্তম্ভিত, আমি পরিষ্কার পড়েছি শাহজাদপুর! আমার সাহেব বকলেন যে কেন আমি এতো শিওর হয়ে ঠিকানা বললাম। আমি ও রাগ করলাম যে আমি তো যেতে চাইনি।তুমি যেতে চাইলে আর ঠিকানা নিলে না! এখন দোষ আমার!এর মাস দুয়েক পরে আবারও আমরা বগুড়া যাচ্ছি, এবার আমি বলি চলো, এবার ঠিক ঠিকানায় যাই।আবারও যেই কথা সেই কাজ।আবারও উপহার ফল মিষ্টি নিয়ে গেলাম সেই ভক্তের বাসায়। একটা বাচ্চা নাম শুনে বাড়ির দরজা দেখিয়ে দিলো।দরজা খুললো মেয়েটির ছোট ভাই।আমি জাস্ট একটা চিৎকার শুনলাম।

আমার ভেতর ও বিদ্যুৎ খেলে গেলো।এ যেন বিদ্যুৎ শক্তি! ভক্তরা আসলেই শিল্পীর আয়না। আমি এখন আমার আয়নায় আমার প্রতিফলন দেখবো, আমার গা শিরশির করে উঠলো। আমরা তার ঘরে ঢুকে দাঁড়িয়ে আছি।মেয়েটি এসে দ্বিধান্বিত হয়ে, আবেগশূন্য হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো স্থানুবৎ! আমি হাত বাড়াতেই সে আমার বুকে ঝাপিয়ে পড়ে কাঁপতে কাঁপতে অনুচ্চস্বরে কাঁদতে লাগলো। উত্তেজনায় ঘেমে একদম ভাঁপা পিঠার মতো হয়ে গেছে। আমি বুদ্ধি করে তাকে ছাড়ালাম।তার মাকে বললাম ওকে একটু হাত মুখ ধুতে বলেন, পানি খাওয়ান।তারপর আমিও এক গ্লাস পানি চাইলাম কারণ ওর আবেগ আমাকে ছুঁয়ে গেছে অনেক গভীর ভাবে। আমি অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে রেখেছি।তারপর সবাই ধাতস্থ হলাম।অনেক প্রশ্ন অনেক আগ্রহ, অনেকগুলো চোখ আমাকে ঘিরে। বিস্ময় তাদের কাটেই না। এরমধ্যেই চা নাস্তার পালা চুকিয়ে রান্নার আয়োজন চলছিলো। কাছের স্টুডিও থেকে ক্যামেরা ম্যান তার ব্যাকগ্রাউন্ড পর্দা সহ চলে আসলো। বেশ কিছু ছবি তোলা হলো। যদিও আমার মনে খচখচ করছিলো যে এই ছবি হয়তো স্টুডিওতে টাঙানো থাকবে।আমার সাহেবকে বললাম কানে কানে, উনি বললেন কিছু করার নাই তবুও আমি স্টুডিওম্যান কে বললাম ভাই এই ছবি আপনার স্টুডিওতে টাঙ্গাবেন না প্লিজ।

আমরা দুপুরের খাবারের পরই রওনা দিলাম। ফেরার পথের মায়া আমাকে সবসময় টানে। মেয়েটার জন্য খুব মায়া হচ্ছিলো। সেই প্রথম আমি বুঝলাম আমি মানুষের ভালোবাসার পাত্র আর ভক্তরা আমার কাছে মনিমুক্তার চেয়েও দামী, তারা অবশ্যই আমার আয়না, কিন্তু অবশ্যই সাধারণ মানের পারদ মাখা কাঁচ না। তারা আছে বলেই আমি তাদের আলোয় আমার আমিকে দেখি,আমার আমিকে যত্ন নেই,ঘষিমাজি,ভালোবাসি। আমি এইসব অসম্ভব রকমের অমূল্য ভালোবাসাকে খ্যাতির বিড়ম্বনা না বলে নামকরণ করি ভালোবাসার ব্যারোমিটার। তাদের মাপকাঠিতেই আমি আমার ওঠানামা বুঝতে পারি এবং খুব বিস্ময় নিয়ে দেখি বছরের পর বছর সেই মিটারের কাঁটা চড়চড় করে উঠছে তো উঠছেই। স্রষ্টা! তোমার কাছে আমার কৃতজ্ঞতার অন্ত নেই।আলহামদুলিল্লাহ।

ছবি:লেখকের ফেইসবুক থেকে

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]