আমার মায়ের একটি-ই জামদানী শাড়ী ছিলো

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

প্রভাতী দাস

(ভার্জিনিয়া থেকে): চন্দন রঙা সেই জামদানী শাড়ীটি পুজোতে মায়ের জন্য কেনা হয়েছিলো। সেদিনের কথা আমার এখনও স্পষ্ট মনে আছে।

আমরা তখন বরিশালে থাকি। সে বছরই সম্ভবত রংপুর থেকে বদলি হয়ে বাবা বরিশালে এসেছেন, জেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা হিসেবে। বরিশালের বগুড়া রোডে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা’র অফিস কাম বাসা। পুরনো জমিদার বাড়ির নীচের তলায় বাবার অফিস, আর উপরের পুরোটা জুড়ে আমাদের বাসা। আমি ক্লাস এইটে পড়ি, সদর গার্লস স্কুলে, দিদি দাদা কলেজে, ছোট ভাই কুট্টি জিলা স্কুলে ক্লাস সেভেনে। বরিশাল বাবার ছাত্র-জীবন এবং চাকুরী জীবনের প্রথমদিক থেকেই জানাশোনা জায়গা, এসেই পুরনো বন্ধুদের খুঁজে নিলেন, আমরা স্কুল-কলেজের সঙ্গে দ্রুতই মানিয়ে নিলাম; আমাদের সবার এই জায়গাটা খুব তাড়াতাড়ি-ই ভালো লেগে গেলো। সেই ভালো লাগার পিছনে অন্য আরো একটি কারণ ছিলো। আমার সরকারী চাকুরে বাবার সেটি-ই বলতে গেলে প্রথম ভাল পোস্টিং। ‘৭৫-এ বাংলাদেশের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর আমার সংখ্যালঘু বাবাকে চাকুরী ক্ষেত্রে যে কতটা নিপীড়ন সহ্য করতে হয়েছে, সে শুধু আমরাই জানি। এই নিপীড়নের একটি ছিলো অনেকবার বদলী করা, তাও যেখানে সেখানে নয়, যেসব জায়গায় কেউ পোস্টিং নিতে চাইতো না, যেসব জায়গার পরিবেশ ভালো নয়, সেখানে চাকুরীর বেতনের টাকার বাইরে অন্য কোনোরকম সুযোগ সুবিধা ছিলো না সেসব জায়গাতেই বাবাকে বদলী করা হতো, তাও ঘন ঘন। ব্যাপারটা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিলো যে, একই বছর বাবাকে তিনবার বদলী করা হয়েছিলো। ক্লাস ফোর আমি তিনটি শহরের তিনটি ভিন্ন ভিন্ন স্কুলে পড়েছিলাম। বড়‘দি-বড়‘দা ছয়মাস কোনো স্কুলে ভর্তি হতে পারেনি, বছরের মাঝামাঝি বদলি করে দিয়েছিলো বলে। বছরের শেষটায় আরো একবার বদলি হলে ওদেরকে শেষ পর্যন্ত একটা স্কুলে ভর্তি করা হয়েছিলো। এতো ঘন ঘন বদলির কারনে স্কুলে কারো সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তোলাও আমাদের জন্য বেশ কঠিন হয়ে গিয়েছিলো। আমরা ভাইবোনরাই একে অন্যের খুব ঘনিষ্ট বন্ধু হয়ে উঠেছিলাম।

সেই সময়গুলোতে আমাদের অর্থনৈতিক অবস্থা কেমন ছিলো আন্দাজ করে নিতে খুব অসুবিধা হবার কথা নয় কারোরই। বাবা অত্যন্ত সৎ চাকুরে ছিলেন। বেতনের টাকার বাইরে তাঁর অন্য উপার্জন যা হতো, সেসব কৃষি সম্প্রাসারনের কাজে ট্যুর করে। কিন্তু বেছে বেছে বাবাকে এমন জায়গাগুলোতে পোষ্টিং দেয়া হতো যেখানে ট্যুরের সুবিধা থাকত না। তার মধ্যে বাবা তখন আমাদের চার ভাইবোনের সংসার শুধু নয়, ছোট কাকুর ইউনিভার্সিটির পড়ার খরচ চালাতেন। বড় ছেলে বলে বাড়ীতে দাদুকে দেখাশোনার ভারটুকুও তাঁরই উপরে। মা কেমন করে বেতনের সেই সামান্য টাকাগুনে সংসার চালাতেন, আমরা সেসব জানতাম না, বুঝতেও পারতাম না। আমাদের জানতে বা বুঝতে দিতেন না তাঁদের দু’জনের কেউই-ই। আমাদের কাজ ছিলো পড়াশুনা করা, ক্লাসে ভালো রেজাল্ট করা। প্রয়োজনীয় জিনিসের অভাবে কখনো কাটাতে না হলেও বিলাসিতার সুযোগ ছিলো না তেমন আমাদের। বিলাসিতা বলতে আমরা বুঝতাম, মাসের প্রথম বেতনের টাকা পেয়ে বড় একটি মাছ কিনে বাবার বাড়ী ফেরা আর অনেক রাতে সদ্য রান্না করা মাছের ঝোল দিয়ে সবাই মিলে হই চই করে ভাত খাওয়া। অথবা দাদা বা বড়দি বৃত্তি পেলে বাবার এক হাঁড়ি রসগোল্লা কিনে বাড়ি ফিরে আসা। এর চাইতে বেশী বিলাসিতা কেমন বুঝতাম না বলেই হয়তো তার অভাব বোধটাও আমাদের ছিলো না, আমরা বেশ আনন্দেই বেড়ে উঠছিলাম। চাকুরী জীবনের এই কঠিন সময়গুলোতেও পুজোতে আমাদের চার ভাইবোনের জন্য নতুন জামা কেনা বা বানানো হতো প্রতিবছর, মায়ের শাড়ী বা বাবার শার্ট…! সে আর হয়ে উঠতো না।

যেমন বলছিলাম, বরিশালের পোস্টিংটা যখন হয়, তখন বাবা চাকুরী ক্ষেত্রে কিছুটা সুদিনের মুখ দেখতে শুরু করেছেন। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা’র সারা জেলা জুড়ে ট্যুর করার সুযোগ রয়েছে, টিএ/ডিএ পান। আমাদের অর্থনৈতিক সচ্ছলতা কিছুটা বেড়েছে। তাই সেবার পুজোয় মায়ের জন্য-ও শাড়ী কেনা হবে, বাবা বলে দিলেন। মা প্রথমে কিছুতেই রাজী হচ্ছিলেন না, তিনি আমাদের জন্য এটা, বাসার জন্য সেটা কিনবার অজুহাতে শাড়ী কেনার কথা প্রথমে এড়িয়ে যেতে চাইলেও শেষ পর্যন্ত আমরা ভাইবোন এবং বাবার পীড়াপীড়িতে রাজী হলেন। এবং জানালেন, তিনি একটি জামদানী শাড়ী কিনবেন।

মা, বাবা, বড়‘দি, আমি ছোট ভাই সহ আমরা সবাই পুজোর বেশ কয়েকদিন আগে চক বাজারের ‘স্বদেশী বস্ত্রালয়’-এ গিয়েছিলাম। দোকানের মালিক বাবাকে চিনতেন, চিনতেন কর্মচারীরাও। তারা মহা উৎসাহে একের পর এক জামদানী শাড়ী’র ভাঁজ খুলে আমাদের দেখাচ্ছিলেন। কতগুলো শাড়ী দেখেছিলাম আজ আর মনে নেই, তবে এটা মনে আছে, মায়ের পছন্দ হলে বাবার হচ্ছিলো না, বাবার হলে আমাদের নয়, আবার সবার পছন্দ হলে দামে ঠিক মিলছিলো না। অবশেষে চন্দন রঙা একটি জামদানী শাড়ী সব মিলিয়ে আমাদের পছন্দ হয়েছিল, ‘স্বদেশী বস্ত্রালয়’ ছাপানো একটি কাগজের প্যাকেটে করে সেই শাড়ীটি কিনে বাড়ী ফেরার আগে, আমাদের সবাইকে চা আর মিষ্টি খাইয়েছিলেন দোকান মালিক। সেটি-ই মায়ের সেই সময়ের সবচেয়ে দামী শাড়ী, যদিও দামটা আমার এখন আর মনে নেই। শাড়ীর সঙ্গে ম্যাচ করে ব্লাউজ আর সায়া কিনে এনেছিলাম আমরা পরে একদিন। সেবারের অষ্টমি পুজোতে মা তাঁর শাঁখা-পলা-সিঁদুরের সঙ্গে চন্দন রঙা নতুন জামদানী পরে পুজো দেখতে বেরিয়েছিলেন। পুজোতে ছবি তোলার বিলাসিতা তখনো আমাদের ছিলোনা, তবুও সেদিনের মাকে আমি আজও স্পষ্ট দেখতে পাই।

মা তাঁর চন্দন রঙা সেই জামদানী শাড়ীটিকে বহুবার পরেছেন। পরা শেষ হলে শাড়ীটিকে মেলে রেখে বাতাসে শুকিয়ে তারপর অনেক যত্নে ভাঁজ তুলে রাখতেন। মায়ের এই জামদানী শাড়ীটির প্রতি বড়দি এবং আমার দু’জনের কী আশ্চর্য রকমের একটা আকর্ষণ ছিলো। দু’জনেই এটি পরতে চাইতাম, কিন্তু গুছিয়ে শাড়ী পরতে পারতাম না বলে মায়ের খুব প্রিয় শাড়ীটি ছিঁড়ে ফেলার ভয়ও ছিলো খুব আমাদের। বড়দি কবে ঠিক শাড়ীটি পরেছিলো আমার আর মনে পড়ে না। কিন্তু আমি এটি কবে প্রথম পরেছিলাম সে দিনটিও আমার খুব স্পষ্টই মনে পড়ে। আমি তখন কলেজে, সেকেন্ড ইয়ারে পড়ি। ততোদিনে আমরা বরিশাল ছেড়েছি, এবারে বাবার পোস্টিং হয়েছিলো টাংগাইলে। আমি টাংগাইলের কুমুদিনি কলেজে সেকেন্ড ইয়ারে এসে ভর্তি হয়েছিলাম, কলেজ পিকনিকে যাবো বলে মায়ের প্রিয় জামদানী শাড়ী পড়ে সেজেগুজে তৈরি হয়ে রিক্সা করে কলেজে এসে জানলাম, পিকনিক হবে না, রাস্তায় একটা অ্যাকসিডেন্ট বা অন্য কিছু একটা কারণে পিকনিক বাতিল হয়ে গেছে। বেশ একটু ক্ষুণ্ণ মনে আবার রিক্সা করে বাসায় ফিরতে ফিরতে শাড়ীটাতে লেগে থাকা ‘মা মা’ ঘ্রাণটি টের পেয়েছিলাম…।

বহুবছর পর্যন্ত মায়ের একটি-ই জামদানী ছিলো। স্বদেশী বস্ত্রালয় থেকে কেনা চন্দন রঙা সেই জামদানী। বরিশালের পর থেকে বাবার চাকুরী জীবন বেশ ভালোই কেটেছে, দেশের রাজনৈতিক পট তারপর আরও অনেকবার বদলালেও বাবা নিজের ব্যক্তিগত নিষ্ঠা এবং সততার কারণেই কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগে বিশেষ একটা জায়গা করে নিয়েছিলেন। আমরা স্কুল ছাড়িয়ে কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করে চাকুরীতে ঢুকতে শুরু করেছি ততোদিনে। আমরা বেশ সচ্ছল, হঠাৎ হঠাৎ কারণ ছাড়াই বাবা মায়ের জন্য শাড়ী কিনে আনেন। ততোদিনে আমরাও শাড়ী পরতে শুরু করেছি, শাড়ীর প্রতি আমার বেশ আগ্রহ জন্মেছে, মা তার জন্য কিনে আনা শাড়ী কখনও বড়দিকে, কখনও আমাকে দেন। আমি মেডিক্যাল কলেজের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে প্রায়ই শাড়ী পরি বলে মা আমার জন্যও নতুন শাড়ী কিনতেন। প্রতিবার পুজোতে তখন আমাদের জামা কাপড়ের সঙ্গে সঙ্গে মায়ের জন্য-ও শাড়ী কেনা হতো, বড়দি আর আমি বেশীর ভাগই সময়ই মায়ের সঙ্গে শাড়ি কিনতে যেতাম। মা কোনোবার রাজশাহী সিল্ক, কোনোবার গরদ, কোনোবার টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ী কিনতেন… আর কোনো জামদানী তিনি কিনেছিলেন বলে মনে পড়ে না। বড়‘দা বুয়েটের শিক্ষক হিসেবে চাকুরীতে যোগ দেবার পর প্রথম মাসের বেতনের টাকা পেয়েই মায়ের জন্য আরেকটি জামদানী শাড়ী কিনে এনেছিলো। মায়ের স্টিলের আলমারীতে যত্ন করে ঝুলিয়ে রাখা প্রিয় শাড়ীগুলোর পাশে, চন্দন রঙা সেই প্রথম জামদানীর পাশে মেরুন পাড়ের সাদা এই জামদানীটিও স্থান করে নিয়েছিল। মেডিক্যাল কলেজ থেকে ছুটিতে বাড়ী এলে মাঝে মাঝে মায়ের শাড়ীগুলো নেড়েচেড়ে দেখতাম। বন্ধুদের সঙ্গে বেড়াতে যাবার সময় মাঝে মাঝে পরতামও, মায়ের সব শাড়ীতেই ‘মা মা’ ঘ্রাণটি লেগে থাকতো, যেনো শাড়ীর সঙ্গে মা-ও জড়িয়ে থাকতেন আমাকে। বিয়ে করে দেশ ছাড়ার সময়ও মায়ের প্রিয় শাড়ীটি তাঁর আলমারীতেই ছিলো, আমেরিকা থেকে দেশে গিয়েও যখন মায়ের শাড়ীগুলো নেড়েচেড়ে দেখতাম, প্রিয় সেই চন্দন রঙা শাড়ীটি তখনও অনেক যত্নে আলমারীতেই রাখা ছিলো, মা যখন চলে যান, তখনও শাড়ীটি তেমনি যত্নে করা ভাঁজে আলমারীতে ঝুলছিলো…। মায়ের কয়েকটি শাড়ী আমি সঙ্গে করে নিয়ে এলেও, সেই চন্দন রঙা জামদানীটি কেন যেন আনতে পারিনি…।

মা চলে গেছেন আজ অনেকগুলো বছর। বড়‘দি আর আমি দু’জনেই শাড়ীতে অনুরক্ত, তবে আমারটি প্রায় নেশার পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে। কারণে তো বটেই অকারণেও আমি অনেক শাড়ী কিনি। বড়দি’র মেয়েরা দু’জনেই শাড়ী পরে, আমার মেয়েরা একদমই নয়। আমার শাড়ীগুলোর কী হবে মাঝে মাঝে ভাবি। আমার একটি দুটি নয়, অনেক গুলো জামদানী। কোনো কোনো বছর পুজোতে আমারও, জামদানী পরা হয়, ছবিও তোলা হয় অনেক। মায়ের মতোই পরা শেষ করে শাড়ীগুলো মেলে রেখে বাতাসে শুকিয়ে ভাঁজ করে ঝুলিয়ে রাখা আমারও অভ্যেস। ক্লজেটের শাড়ীগুলো আমার মেয়েদের কাছে বিশেষ কোনো আবেদন এখনও তৈরী করেনি, ওরা তাই শাড়ী ধরেও দেখেনা, কোনটি জামদানী বা কোনটি তাঁত তাও বোঝেনা। আমি নিজেই মাঝে মাঝে ক্লজেটে ঝোলানো জামদানী শাড়ীগুলো নেড়েচেড়ে দেখি। জামদানী কিনতে বা পরতে গিয়ে অথবা ক্লজেটের জামদানীগুলো নেড়েচেড়ে দেখতে দেখতে মায়ের প্রিয় জামদানীটির কথা মনে পড়ে প্রায়ই…।

আমার মায়ের একটি-ই জামদানী শাড়ী ছিলো বহুবছর…সেটি চন্দন রঙা। আমি এখনও চন্দন রঙা কোনো জামদানী কিনিনি…।

ছবি: সজল

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]