আমার যাবার বেলায় পিছু ডাকে

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শিল্পী কনকনকচাঁপা কচাঁপা এবার গানের পাশাপাশি প্রাণের বাংলার পাতায় নিয়মিত লিখছেন তার জীবনের কথা। কাটাঘুড়ির মতো কিছুটা আনমনা সেসব কথা, হয়তো কিছুটা অভিমানিও। কিছুটা রৌদ্রের মতো, খানিকটা উজ্জ্বল হাসির মতো।

পরিবারের সদস্য পরিবেষ্টিত আমরা চোখের জলে বিদায় নিয়ে আমেরিকার লস এঞ্জেলস শহরে সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনস এ রওনা দিলাম। দোয়া কালাম পড়ে সীটবেল্ট বেঁধে ধাতস্থ হয়ে বসলাম। বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠছিলো।ভয়ংকর রকম খা খা করছিলো। কতক্ষণ পরেই ফ্লাইটে ব্রেকফাস্ট দিলো যখন তখন কান্নাকাটি শুরু করলাম। আমার জীবন সঙ্গী বললেন চলো সিঙ্গাপুর থেকে ফিরে যাই।আমি ভাবি তা কি করে হয়! এমন দোটানায় পড়ে ফ্লাইটে দম আটকানোর উপক্রম। বাসায় সবাইকে বলেছিলাম আমাকে চিঠি লিখবে, আমি ফ্লাইটে বসে পড়বো।সেই কথামতো পাওয়া চিঠি বের করলাম। সেসব সাধারণ চিঠিই পরিবেশ গুনে মর্মস্পর্শী হয়ে উঠলো। আমি কেঁদেকেটে একাকার হয়ে অসুস্থ হয়ে গেলাম। আমার স্বামী এবার রেগে গেলেন। চিঠি গুলো সব নিয়ে হ্যান্ড লাগেজ এ ভরে রেখে বললেন শক্ত হও নাহলে আমরা সিঙ্গাপুর থেকে ফিরে যাবো দেশে।কান্না থেমে গেলো, হাহাহা।

এবার জানালায় চোখ রাখি।কান্না এবার মেঘের সঙ্গে মিতালি করে সমানতালে জমতে থাকে। ছোট বেলায় একবার জিয়া শিশু পরিষদ থেকে বাচ্চাদের বিদেশে নেয়ার কথা ঠিক হয়েছিলো। আমি তো নিয়মিত নানা সংঘ, সংস্থা ইত্যাদিতে গান গাই।জিয়া শিশু পরিষদ এ আমি অনেক গেয়েছি।আমি সিলেক্ট হলাম।তখন আমার এক আত্মীয় আম্মা আব্বাকে বললেন তোমার মেঝোমেয়েও তো গান গাইতে পারে।ওর নাম ও ঢুকাও।আব্বা আম্মা ইতস্তত করে নাম দিলেন। তারপর কতদিন রিহার্সাল করলাম অন্য বাচ্চাদের সঙ্গে।রত্না’পা আর আমি কোরিয়া যাবো এই স্বপ্নে বিভোর, প্লেনে তো কখনও চড়িনি। ভেতরের পরিবেশ কেমন তাও জানিনা কিন্তু প্রায়ই স্বপ্নে দেখি, দেখি মশারীর ভেতরটাই যেন প্লেন,কি সুন্দর বাতাসে সারা দেহমন জুড়িয়ে যায় আর আমি রত্নাপা উড়ে উড়ে কোরিয়া যাচ্ছি।কোন এক দুর্ভাগা সকালে খবর এলো আমরা কোথাও যাচ্ছিনা।আমার তখন নিজের চেয়ে রত্না’পার জন্যই বেশি মায়া হতে লাগলো। সেই দুঃখ আজও, তখনও, এখনো আমার ক্কলবে মেখে আছে।আমি মেঘের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে রত্না’পার কাছে ক্ষমা চাচ্ছিলাম আর কাঁদছিলাম।কিন্তু এতো লম্বা সময়, কতো আর কাঁদা যায়,আমি সামনে টিভির স্ক্রিন খুলে নিয়ে ডিজনি ওয়ার্ল্ড এর কার্টুন দেখতে মন দিলাম।

সিঙ্গাপুর চাঙ্গি এয়ারপোর্টে আমাদের মধ্যবর্তী যাত্রা বিরতি ছিলো আঠারো ঘন্টা। আমরা এয়ারপোর্ট হোটেলে রাত পার করলাম। এতো সুন্দর হোটেল, সব কিছু ছবির মতো, সিনেমার মতো। তরুণ দম্পতির হানিমুন হওয়ার কথা, অথচ মন ভয়াবহ বিষন্নতা মাখা।দু’জন দু’জনকে জড়িয়ে রাত পার করলাম। বাচ্চাগুলো কি করছে, মাশুক কেন এতো কাঁদলো, কতদিন থাকবো, কিভাবে থাকবো আর মানুষ আমার গান কেমন পছন্দ করবে এগুলো চিন্তায় ঘুম টুম উড়ে গেলো।লস এঞ্জেলস বাংলাদেশ থেকে অনেক বেশি রকম দূরের পথ।ঘন্টা গুনতে গুনতে জীবন পার হয় পথ ফুরায় না।এমনিতে ভালোই থাকি।যেইমাত্র নাস্তা লাঞ্চ ডিনার দেয় অমনি কান্না পায়! আহারে এতো সুন্দর ছবির মতো গোছানো নানারকম মজাদার খাবার অথচ বাচ্চাগুলিকে দেখানো যাচ্ছেনা। মাখন পনিরের মিনিপ্যাক, চকলেট যা দিচ্ছে সবই ব্যাগে ভরছি।এভাবে একসময় পৌঁছে গেলাম। ইমিগ্রেশন পার হতে অযথাই দোয়া পড়তে পড়তে পাগল হওয়ার দশা।

কাস্টমস ফেস করে লাগেজ নিয়ে শেষমেশ প্রবেশ করলাম স্বপ্নের দেশ আমেরিকা!

 আমেরিকার আলোকিত উজ্জলতায় পা দিয়ে মুগ্ধ হয়ে দেখলাম মিতু ভাই, বাচ্চুভাই, সিদ্দিক ভাই সবাই ফুল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন সাদরে সম্ভাষণ জানাতে।বের হয়ে কিছু স্ন্যাকস, কফি খেয়ে গাড়িতে চড়ে কতদূরে যাওয়ার পর আমার স্বামী আবিষ্কার করলেন ওনার পাসপোর্ট কাগজপত্র সম্বলিত পুরো প্যাকেট উনি যেখানে এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে সিগারেট ধরিয়েছিলেন সেখানে ফেলে এসেছেন! আল্লাহ গো!

ছবি : লেখকের ফেইসবুক থেকে

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]