আমার লন্ডনের বন্ধুরা

ঊর্মি রহমান

লেখক, সাংবাদিক উর্মি রহমান প্রাণের বাংলার জন্য লিখছেন দূরের হাওয়া বিভাগে জীবনস্মৃতি; ‘মনে পড়ে’। তার শৈশব, কৈশোর জীবনের বয়ে চলা পথের গল্পগুলো এই ধারাবাহিক জুড়ে থাকবে। উর্মি রহমান দীর্ঘ সময় বাংলাদেশে সাংবাদিকতা করেছেন। কাজ করেছেন বিবিসি বাংলা বিভাগেও। এখন বসবাস করেন কলকাতায়।

লন্ডনে গিয়ে অনেককে পেয়েছি। পূর্ব পরিচিত ছাড়ারও অনেকের সাহায্য-সহযোগিতা পেয়েছি, যাদের কথা না লিখলে অন্যায় হবে। বুলু ভাবীর মেজবোন বেবী আপার কথা আগেই লিখেছি।

বিবিসির পাবলিসিটি ছবিতে আইডিয়াল হোম এক্সিরিশনে মানসী বড়ুয়া ও আমি।

তাঁদের সবার বড় বোন রাবেয়া আপাও লন্ডনে থাকেন। তাঁর বাড়িতেও আপনজন হিসেবে গিয়েছি ও সমাদর পেয়েছি। তাঁর বড় ছেলের বিয়েতে খুব মজা করেছিলাম। বিদেশে এমন দেশী স্টাইলের বিয়ে পরেও অনেক দেখেছি। সেসব খুব ভাল লেগেছে। অনেক পরে সঙ্গীতশিল্পী গৌরী চৌধুরীর বিয়েতে গিয়েছিলাম। তখন আবহাওয়া খুব উষ্ণ না হওয়া সত্ত্বেও জামাইকে খালি গায়ে কলা গাছ পোঁতা মেক-শিফট ছাদনা তলায় ধূতি ও খালি গায়ে চাদর জড়িয়ে বসতেও দেখেছি। আবার অনেক বিয়েতে নারী ও পুরুষের আলাদা বসার ব্যবস্থাও দেখেছি। এক মন্ত্রী না এমপি যেন তার প্রতিবাদে এক বিয়ের আসর ছেড়ে চলে যান এবং সমালোচনার মুখে পড়েন। কিন্তু তাঁর যুক্তি আমি বুঝতে পেরেছিলাম। তিনি ও তাঁর স্ত্রী সেখানে কাউকে সেভাবে চেনেন না, বিশেষ করে তাঁর স্ত্রী নারী মহলের কাউকেই চেনেন না। সে ক্ষেত্রে তাঁর একা একা বসে থাকাটা কতটা বেদনাদায়ক হতে পারে, সেটা সহজেই বোধগম্য।

একবার আমাদের অফিসের এক বাংলাদেশেী মেয়ের বিয়েতে আমরা আমিন্ত্রিত হই এবং আমাদের দলে এক তরুণ বাংলাদেশী সহকর্মী ছিলো। সে অসহায়ের মত বলেছিলো, ‘আমি তো কাউকে চিনি না। আমি একা একা বসে থাকবো কি করে?’ আমি কথা দিয়েছিলাম, আমরা যেখানে বসবো, সেখানেই ও যাতে বসতে পারে, সে ব্যবস্থা আমি করবো। সে বিয়েতে গিয়ে অবশ্য দেখলাম, একসঙ্গে বসার ব্যবস্থা আছে, আবার মেয়েদের আলাদা বসার ব্যবস্থাও আছে। কেউ চাইলে সেখানেও বসতে পারে। যাহোক, খানিকটা প্রসঙ্গান্তরে চলে গিয়েছি। লন্ডনে আমার ফুফাতো বোন চুণি আপা ও ভাই ফয়েজ ভাই থাকে। তাদে সঙ্গে যোগাযোগ হলো। তালেয়া আপার সঙ্গে আসার আগে ঢাকায় আলাপ হয়েছিলো। তিনি অনেক সাহায্য করেছেন। ড. শফিউল্লাহ নামে একজন ছিলেন, তাঁকে আমরা ‘মামা’ ডাকতাম। তিনি আমার বড় চাচীর সহকর্মী হিসেবে আমাদের পরিবারের খুব ঘনিষ্ঠ ছিলেন। তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ হলো। তাঁর সঙ্গে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় আমরা কিছু কাজ করেছিলাম, সেকথা আগেই লিখেছি। এছাড়া সহকর্মীদের কাছ থেকে প্রচুর সহায়তা পেয়েছি। যাঁরা সে সময় সার্বক্ষণিক কর্মী ছিলেন না, কিন্তু নিয়মিত অনুষ্ঠান করতে আসতেন, তাদের মধ্যে মানসী বড়ুয়া, শামীম চৌধুরী আমার সব বিপদে আপদে পাশে দাঁড়িয়েছিলো।

সহকর্মী বন্ধু দীপায়ন চট্টোপাধ্যায়, ওর স্ত্রী জয়শ্রী আর কন্যা স্বীয়া।

তাদের বাড়িতে রাত কাটিয়ে প্রচুর আড্ডাও দিয়েছি। শামীমের ছেলে রঞ্জন আর মানসীর মেয়ে রুম্পা রূপকের বন্ধুতে পরিণত হয়। মুশতাক খান নামে এক তরুণ তখন কেম্ব্রিজে উচ্চতর অধ্যায়নে ব্যস্ত ছিলো। তার সঙ্গে আলাপ হবার পর সে ঘনিষ্ঠ বন্ধুতে পরিণত হয়। আমার দীর্ঘ লন্ডনবাসে তাদের সকলের সাহায্য-সহযোগিতা পেয়েছি, সেজন্য আমি, আজীবন কৃতজ্ঞ থাকবো। মনে পড়ে, একবার রূপকের খুব জ্বর, ওকে একা রেখে বেরোতে পারছি না, এদিকে ঘরে অনেক কিছুই নেই। মানসীর স্বামী সরোজ বড়ুয়া এসে সেসব কিনে দিয়ে যায়। দীপায়নের স্ত্রী জয়শ্রী আর একবার একই রকম সাহায্য করেছিলো। তখন আমি অসুস্থ, বরফ পড়ছে। দীপায়ন বাড়ি নেই, মেয়ে স্বীয়া বা মামনির বয়স আড়াই বছর। জয়শ্রী মেয়েকে পুশচেয়ারে বসিয়ে বরফ ঠেলে আমাকে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস দিয়ে গেছে। ততদিনে দীপায়ন আমার ঘনিষ্ঠতম বন্ধুতে পরিণত হয়েছে। আমার বিপদে- আপদে সবসময় পাশে থেকেছে। হিন্দি সেকশনের অচলা শর্মার সঙ্গেও বন্ধুত্ব হলো। তারও পরে তামিল, বার্মিজ, উর্দূ, পশতু এবং বিবিসির ৩৬টি ভাষা বিভাগের অনেকের সঙ্গেই বন্ধুত্ব হয়েছিলো। ইস্টার্ণ সার্ভিসের আওতায় ছিলো বাংলা, হিন্দি, উর্দূ, তামিল, বর্মিজ, পশতু সেকশন।

এবার নিমাই’দার কথা একটু বলি। সামান্য গুরুগম্ভীর দেখতে ছিলেন, কিন্তু তাঁর রসবোধ তুলনাহীন ছিলো। আমরা সপ্তাহান্তে দিনের বেলা ডিউটি পড়লে বাচ্চাদের সঙ্গে নিয়ে যেতাম। ওরা একসঙ্গে খেলতো, ছবি আঁকতো। নিমাই’দা রূপককে দেখলে বলতেন, ‘এই মেয়েটা আবার এসেছে।’ তাতে স্বভাবতই রূপক রেগে যেতো। নিমাইদা সাহিত্য-সংস্কৃতি নিয়ে অনুষ্ঠান করতেন। সেগুলো খুব উঁচুদরের হতো। যে কোন কারণেই হোক, তিনি আমাকে খুব পছন্দ করতেন। অবসর নেবার পরও যোগাযোগ রাখতেন। পরে তিনি দেশে ফিরে যান। শান্তিনিকেতনে তাঁর একটি বাড়ি আছে, যেটার নাম ‘প্রত্যাবর্তন’। মুর্শিদ ভাই ঠাট্টা করে বলতেন, ‘নিমাইদা, বাড়ির নামে একটা মিথ্যা লিখে রেখে এসেছেন!’ কিন্তু নিমাইদা সেটাকে সত্যি করে ফিরে গিয়েছিলেন সেখানে। আমরা সে বাড়িতে গিয়েছিও। যখনই লন্ডনে আসতেন, আমাকে ফোন করতেন। পরে তাঁর স্ত্রী জয়াদি মারা গেলে তিনি তাঁর ঈর্ষণীয় রেকর্ড ও ছবির সম্ভার টেট গ্যালারীকে দান করে দেন। খুব দু:খজনকভাবে তিনি একা লন্ডনের বাড়িতে মারা যান এবং বেশ কয়েকদিন পরে তাঁর মরদেহ আবিস্কৃত হয়। তবে নিমাইদা আমার মত অনেক মানুষের স্মৃতিতে বেঁচে আছেন।

ছবি: লেখক


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box