আমার শহরে শারদোৎসব

কাকলি পৈত

(দিল্লী থেকে): আমার শহরে শরতের আগমন শিউলির গন্ধ মাখা ভোরে নয়,কাশের আদিগন্ত হিল্লোলে নয়।পদ্মের রক্তিমাভা রামচন্দ্রের শরতকালীন অকাল বোধনের কথা মনে করায় না।পদ্মবিল ততো দূর,বাজারে ও পদ্ম বিরল।তবু ও নীলাকাশে ভেসে বেড়ায় সাদা মেঘের ভেলা, ইট কাঠ পাথরের আড়াল থেকে ভেসে আসা ইতি-উতি শিউলির গন্ধ, টগরের শ্বেত শুভ্র আলোয়,হালকা হিমেল হাওয়ার পরশে কোথাও যেন প্রকৃতির পালা-বদল টের পাওয়া যায়।আকাশের দিকে তাকালে মন আপনা থেকেই বলে ওঠে ‘আজি কি তোমার মধুর মূরতি হেরিনু শারদ প্রভাতে’।বুকের ভিতর এক আনন্দ-লহরী ,আর ক’দিন বাদেই শারদীয়া দূর্গোৎসব আর নবরাত্রি। দীর্ঘদিন বাংলার বাইরে থাকার সুবাদে দূর্গোৎসবের আনন্দ ও যেমন উপভোগ করেছি তেমনই অবাঙালি বন্ধুদের সঙ্গে নবরাত্রির আনন্দ ও খুব পেয়েছি।

                    আমার শহর দিল্লিতে বাঙালিদের আধিক্য অনেক বেশী আর দূর্গাপূজো অনেক হয় তবে কলকাতার পূজোর সঙ্গে এখানকার পূজোর অনেকটাই তফাৎ। অর্থের প্রাচূর্য, থিম নিয়ে মাতামাতি বা লক্ষ লক্ষ মানুষের ঢল নামে না রাস্তায়।অর্থের বাহুল্য থাকলেও ঘরোয়া পূজোর আন্তরিকতার ছোঁয়ায় পরিপূর্ণ থাকে। পূজো এখানে মিলনমেলা। পূজোর সঙ্গে প্রতিটি পরিবারের লোকজন অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত থাকেন। আমাদের মনে হয় যেন নিজেদের বাড়ির পূজোতে আছি। এখানে ওখানে ঠাকুর দেখতে যাবার কোনো তাড়া নেই বরং সবাই মিলে সারাদিন মণ্ডপে পূজোর কাজ ,আড্ডা,নানারকম প্রতিযোগিতা, প্রসাদ বিতরন, সকলে মিলে একসঙ্গে হৈ-হৈ করে পূজোর ক’টা দিন  খাওয়া-দাওয়া এসব কিছুর মধ্যে দিয়ে

কিভাবে দিনটা কেটে যায় বোঝাই যায় না। বাড়ি গিয়ে  একটু বিশ্রাম নিয়ে আবার পূজোমণ্ডপে। সান্ধ্যকালীন নানারকম সাংস্তৃতিক অনুষ্ঠান তো পঞ্চমী থেকে দশমী পর্যন্ত থাকেই। কলকাতা মুম্বাইয়ের কত বিশিষ্ট শিল্পীরা আসেন গান গাইতে। এছাড়া নানারকমের বিচিত্রানুষ্ঠান  দেখতে দেখতে রাত ভোর হয়ে যায়। এসময় দিল্লি শহর সেজে ওঠে দূর্গাপূজো আর নবরাত্রির আলোকসজ্জায়।

জায়গায় জায়গায় রামলীলা বা রামায়নের নানা কাহিনীমূলক অনুষ্ঠান , বৃহৎ মেলার আয়োজন করা হয়।অবাঙালিরা ও যেমন বাঙালিদের দূর্গাপূজোয় সামিল হতে ভালোবাসেন,বাঙালিরাও তাদের সঙ্গে নবরাত্রির নানা অনুষ্ঠানের ষোল-আনা আনন্দ উপভোগ করেন।সারা দেশ জুড়ে সব সম্প্রদায়ের মানুষ নারীশক্তির আরাধনায়  ব্রতী হন,শান্তি ও শক্তি অর্থাৎ দশভূজা ও সর্বংসহা ,সবরকম আসুরিক শক্তির বিরুদ্ধে জেগে ওঠা নারীশক্তির আরাধনা করা হয়। নারী আজ দূর্গার প্রতিভূ, সমাজের সকল স্তরে শুধু শক্তিরূপে নয়,বিদ্যায় বুদ্ধিতেও পুরুষের সমানাধিকারে বিরাজমান।এই ভাবনা নিয়েই দূর্গোৎসবের মাহাত্ম্য।এই ভাবনা থেকেই একদিন সমাজে নারীজীবনে আমূল পরিবর্তন হবে,সুস্থ্য সমাজ তৈরী হবে এই শুভ কামনা রাখি।বাঙালিরাও ন’দিন ধরে নবরাত্রির ব্রত পালন করেন অ-বাঙালিদের মত।কুমারী পূজো হয় ঘরে ঘরে।এছাড়া সব ধার্মিক আচার -অনুষ্ঠান একটা কথাই মনে করিয়ে দেয় ,শারদোৎসব জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে আমাদের সকলকে এক ছাতার তলে দাঁড় করিয়েছে।যেখানে আমরা বলতে পারি ‘নানা ভাষা নানা মত নানা পরিধান,বিবিধের মাঝে দেখো মিলন মহান।’ প্রবাসে দূর্গোৎসব বাংলার বাইরে বাংলার ঐতিহ্য সংস্কৃতিকে হৃদয়ে সুরক্ষিত রাখার এবং পরবর্তী প্রজন্মের কাছে বাংলা ভাষা ,বাংলার নানা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, লেখক কবিদের পরিচিত করাবার ঐকান্তিক প্রচেষ্টা।দিল্লির বেশীর ভাগ পূজোই সাবেকীয়ানা আর আধুনিকতার মেলবন্ধন এবং এক প্রজন্ম থেকে পরবর্তী প্রজন্মের হাত ধরে এগিয়ে চলেছে দীর্ঘকালীন ।মণ্ডপে মণ্ডপে প্রসাদ বিতরন এবং মেলার আয়োজন ,ভরপুর লোক সমাগম এখানকার পূজোর বৈশিষ্ট। মায়ের মূর্তি নিয়ে নানারকম পরীক্ষা-নীরিক্ষা হয়না।মণ্ডপসজ্জা আলোকসজ্জা কোনটাতেই খুব চটকদারিতা বা অর্থের আতিশয্য নেই,তবে সব পূজোতেই প্রাণের ছোঁয়া আছে, ঘরোয়া পরিবেশ ,মায়ের রূপে মন ভরে যাবার একটা ব্যাপার থাকে যা অনেকবছর আগে কলকাতার পূজোতে পেতাম। 

         বিজয়া দশমী ও খুব ধূমধাম করে পালন করা হয়। এইদিন রাবণের কুশ-পুত্তলিকা পোড়ানে হয় আর সেটা তৈরী হয় আতসবাজী দিয়ে। প্রচুর টাকার বাজী পোড়ানো হয় সেদিন।সব অশুভ শক্তির বিনাশ ঘটিয়ে অন্তরে শুভ শক্তিকে গ্রহন ও তার জয় ঘোষনা এই উৎসবের বার্তা।এই দিন দশেরা বা দশমীকে কেন্দ্র করে মেলার আয়োজন,  কবি সন্মেলন, ও নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।দশমীর সকালে মণ্ডপে সিঁদূর খেলা , প্রতিমার বরণ অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। যমুনার ঘাটে বিসর্জন হয়, পুরুষ নারী নির্বিশেষে আমরা সকলেই বিসর্জনে সামিল হই। নাচ গান আরতির ছন্দে বিসর্জনের বেদনার সঙ্গে আনন্দ ও কিছু কম থাকেনা।

বিসর্জনের পর মণ্ডপে ফিরে এসে মিষ্টিমুখ ,বিজয়ার কোলাকুলি , বড়দের প্রণাম, রাতে সবাই মিলে একসঙ্গে খাওয়া এসব কিছুর মধ্যে দিয়েই উৎসবের সমাপ্তি। আবার এক বছরের প্রতীক্ষায় দিন কাটানো। সারাবছরের উৎসাহ উদ্দীপনা , রোজকার একঘেয়েমির মাঝে যেন অনেকখানি প্রাণসঞ্চার করে দিয়ে যায় উৎসবের আনন্দ।উৎসবের প্রেক্ষাপট যাই হোক না কেন উৎসব মানুষের আনন্দ প্রকাশ ও লাভের মাধ্যম। তাই উৎসব বাঁচুক মানুষের সমাজে চিরকালীন ,তার মনন ঐতিহ্য সংস্কৃতির ধারক ও বাহক হয়ে।

ছবি: গুগল