আমার শহর নিউইয়র্ক

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শিবব্রত দেচৌধুরী

মনে হয় এইতো সেদিন অথচ জীবনের অর্ধেকেরও বেশি সময় কাঁটিয়ে দিলাম এই শহরে, এযে আমার আরেক মা। সাত সমুদ্র তের নদী পেরিয়ে এসেছিলাম এই শহরে, ভাগ্যান্বেষণে,
এ শহর আমাকে সেই প্রথম দিন থেকেই বুকে টেনে নিয়েছে, কখনো বুঝতে দেয়নি আমি ওঁর আশ্রিত সন্তান, বরং যতো দিন যাচ্ছে ততোই ওঁ আমাকে আরো বেশী করে আপন করে নিচ্ছে। আমার জন্ম যেখানে, আমার বেড়ে উঠা যেখানে, সেই মায়ের জন্য টান তো আমার আজীবন থেকে যাবেই, তাই বলে আমি যেন আমার ফেলে আসা মাকে নিয়ে অনুশোচনা না করি তার জন্যে নিউইয়র্ক তিলে তিলে আমাকে সেই পরিবেশ

জ্যাকসন হাইট

তৈরি করে দিয়েছে।
যখন এখানে প্রথম এলাম, উঠেছিলাম কুইন্সের সানিসাইডে, তখন মাত্র দু তিনটে বাঙালী পরিবার ছিল ওই এলাকায়, তাছাড়া সমগ্র নিউইয়র্ক শহর জুড়ে বাঙালীর সংখ্যা ছিল হাতে গোনার মতো।
দেশী খাবার, দেশী সংস্কৃতি আর আপনজন দের জন্য মনটা ছটফট করতো। ২১শের বইমেলা, পহেলাবৈশাখ, আর বিভিন্ন পুজো পার্বনের সময়  মনের অজান্তেই দুচোখ জলে ঝাঁপসা হয়ে উঠতো, মনটা পড়ে রইতো ফেলে আসা অতীতের আঙিনায়!

মনে পড়ে Astoria তে তখন বাংলাদেশী একমাত্র গ্রোসারি ষ্টোর ছিল -মেঘনা গ্রোসারি আর ম্যানহাটানের ডাউন টাউনে ইন্ডিয়ান স্পাইস নামে আরেকটা বাংলাদেশী গ্রোসারি স্টোর ছিল তাই সুযোগ পেলেই ওই দুটি গ্রোসারি ষ্টোরেই প্রথম যেতাম –

ম্যানহাটন

দেশী স্বাদের অন্বেষণে ,তার পরের গন্তব্য স্থান ছিল জ্যাকসনহাইটসের পেটেল ব্রাদার্স, যেখানে Indian গ্রোসারিস পাওয়া যায় । তো দেশ থেকে সহস্র মাইল দুরে এসেও একেবারেই যে জলের মাছ ডাঙায় উঠে আসার মতো অবস্থা, তা হয়নি কখনো।
তার পরেও সর্ষে ইলিশ , ভাঁপা পিঠে, শিম বিচির ডাল , লাল শাক , গন্ধরাজ লেবু এসব দেশী খাবার আর মায়ের হাতের রান্নার জন্য মনটা আনচান করতো!

স্থানীয় রেডিওতে সপ্তাহে একদিন পদ্মার ঢেউ নামে একটা অনুষ্ঠান সমপ্রচারিত হতো, কান পেতে দেশের খবর শুনতাম আর মনে মনে ছবি আঁকতাম। তখন সেলফোনের যুগ ছিলনা, ল্যান্ড ফোন ই ছিল একমাত্র ভরসা ,
ওভারসিজ কলে খরচ ও ছিল প্রচুর , মনে আছে একমাসে টেলিফোন বিল এসেছিল এগারশো ডলার !
ডাইভারসিটি ভিসার কল্যানে ধীরে

কীন ব্রিজ ও আলী আমজাদের ঘড়ি সিলেট

ধীরে দেশী লোকের বসতি বাড়তে লাগলো এখানে । কমিউনিটি ভিত্তিক ব্যবসা বানিজ্যের ও প্রসার শুরু হলো। জন্ম হলো ‘প্রবাসী’র , প্রথম বাংলা পত্রিকার ।
এখন এই শহরে প্রতি সপ্তাহে অন্তত: পাঁচ থেকে ছয়টি বাংলা সংবাদ পত্র প্রকাশিত হয়! বাংলা শিল্প কলা ও বাংলা বর্নমালাকে নতুন প্রজন্মের সঙ্গে পরিচিত করার প্রয়োজনেই জন্ম হলো বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পারফঁরমিং আর্টস -বিপার,
যার নিরলস প্রচেষ্ঠা এখনো অব্যাহত আছে। বলা বাহুল্য , বিপার মতো – উদিচী, সদারঙ, সঙ্গীত পরিষদ এমনি অনেক গুলো আন্তর্জাতিক মান সমপন্ন বাংলা সাংস্কৃতিক সংগঠন এখন নিউইয়র্কে রয়েছে।

বাঙালীরা এখানে বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনায় পালন করে নিজ নিজ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ! ঈদ, পুজা, বড়দিন, বইমেলা ,পহেলা বৈশাখ, রবীন্দ্র- নজরুল জয়ন্তী, বসন্ত উৎসব, থিয়েটার, কবিতার আসর, নৃত্যনাট্য, পথের ধারে ঝালমুড়ি, আজ কী নেই এখানে ?! আমার সংস্কৃতি, আমার প্রিয় খাবার এমনকি আমার আপনজন সবইতো আমি এখানে পাচ্ছি। জ্যাকসনহাইটস, জামাইকা, এষ্টরিয়া, ব্রোকলেইনের চার্চম্যাকডোনাল্ড এলাকায় গেলে এখন মনেই হয়না আমি আমার জন্মভূমি ছেড়ে বিদেশ বিভূঁইয়ে পড়ে আছি।
ইষ্ট রিভারে নাও ভাসিয়ে আমি স্পষ্ট দেখতে পাই আমার সুরমা নদীকে, আমার প্রীয় Kean Bridge কে , আমার প্রানের বাঙলাকে!
বাউল মন গুন গুন করে গেয়ে উঠে – “মিসিসিপীর সুরে ভাটিয়ালী গান, একই সুর হয়ে বাঁজে, বাঁজে মনেপ্রাণ । যদিও ভাষা এক নয় , মনের ভাষাতো এক। Time and time again……..”
জন্মভূমি ছাড়া এমন সুখ আর কোথায় গেলে খোঁজে পাবো বলো? আমি তোমায় অনেক,অনেক ভালোবাসি নিউ ইয়র্ক!

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]