আমার শান্তিনিকেতন-দুই

অমৃতা ভট্টাচার্য

মোরাম বিছানো পথ, বৃষ্টিভেজা ফুলের সৌরভ, হোস্টেলের টানা বারান্দা, বারান্দায় দাঁড়ালেই দেখা যায় শালবীথি, আম্রকুঞ্জ। আরো দূরে খোয়াই। সব মিলিয়ে শব্দে শব্দে ভেসে থাকা শান্তিনিকেতন। প্রাণের বাংলায় সেই শান্তিনিকেতনের জীবন নিয়েই লিখতে শুরু করলেন কলকাতা থেকে অমৃতা ভট্টাচার্য। একদা শান্তি নিকেতনের ছাত্রী, এখন চারুচন্দ্র কলেজে অধ্যাপনা করছেন। 

পূর্বপল্লীর ঘনসবুজ গাছগাছালির পর উঁচু পাড়। তার কোল ঘেঁষে রেলগাড়ি যায় ঝমঝমিয়ে। বন-বনানীর মাথার উপর দিয়ে সূর্যদেব দেখা দেন কোন প্রত্যূষে। হস্টেলে হস্টেলে তখন ঘণ্টা বাজে। শেফালি মাসি হাঁক পাড়ে – ‘উঠে পড়ো মেয়েরা!’ আমরা চোখ কচলিয়ে উঠে বসি, জানলা দিয়ে দেখি ঊষার শান্ত বৃক্ষরাজি। হলুদ স্কার্ট, সাদা সার্ট মেয়ের দল এখন এখন লাইন করবে, কিচেনে যাবে, কোকো-বিস্কুট খাবে। নেড়ি কুকুর আর অভূক্ত  কাকের দল ভিড় জমাবে বিস্কুটের প্রত্যাশায়। হাতে টিনের স্যুটকেশ দোলাতে দোলাতে লাইন আবার এগোবে।

   এতক্ষণে গৌর-প্রাঙ্গনে ভিড় জমতে শুরু করেছে। বৈতালিকের জমায়েত। গৌরগোপাল ঘোষ ছিলেন পুরনো আশ্রমিক, কর্মী। তিনি নেই আর। ভোরের আলোয় ছেলেমেয়েদের কলতানে প্রাঙ্গনটি মুখর হয়ে ওঠে। কোনোদিন বা কুয়াশায় একচোট লুকোচুরিও খেলে নেওয়া যায়। ক্রমে, সিংহসদনে ঘণ্টা পড়োবে। তালে তালে চারটি করে ঘণ্টা। ঘণ্টা বলছে, – তৈরি হও, এসো। পায়ের গতি বাড়ছে কারো বা কেউবা প্যাডেল ঘোরাচ্ছে জোর কদমে। সূর্য এখন সন্তোষালয়ের সামনে ঝাকড়া মাথার বটগাছটির উপর পরিদৃশ্যমান। সেই আদি আলোকপুরুষের সম্মুখে আনত দৃষ্টি ছেলেমেয়েরা বলে উঠছে, ওঁ পিতা নোহসি নোবধি নমস্তেস্তু … তুমি আমাদের পিতা পিতার ন্যায় আমাদিগকে জ্ঞানশিক্ষা দাও তোমাকে নমস্কার করি। গানে গানে মুখরিত হচ্ছে গৌর-প্রাঙ্গন। ওই দূরে স্থানুবৎ দু-চারজন। গান শেষ হতেই ক্লাসের ঘণ্টা পড়ে। কোনোদিন বকুলবীথিতে, কোনোদিন বা শালবীথির প্রান্তে আমাদের ক্লাস বসে। নরম রোদ্দুর তার করপরশ বুলিয়ে দেয় সযতনে। আমরা আলো মাখি, ছায়া মাখি, ঋতুতে ঋতুতে দেখি ফুলের বাহার। অঙ্ক খাতার উপর আমের মঞ্জরী ঝরে পড়ে। তখন কী আর হিসাব মেলে?

ক্লাস শুরু – শেষের ঘণ্টা পড়ে সিংহসদনে। দীর্ঘ মাথায় সিংহসদন যেন সারাক্ষণ তার নজরদারি চালিয়েই যাচ্ছে। ঘড়িখানি জানিয়ে দিচ্ছে, – সময় বসে নেই, সে কেবলই বয়ে চলেছে। সেই কবে রায়পুরের জমিদার লর্ড সত্যপ্রসন্ন সিংহ দিলেন অর্থ, অপূর্ব নক্সায় বাড়িটি বানালেন সুরেন্দ্রনাথ কর। নাম হলো, সিংহসদন। ১৯৪০’এ অক্সফোর্ড ডি লিট দিল গুরুদেবকে। সে তো এই ঘরেই! সেদিন কত ভিড়, কত অভ্যর্থনা! কোনো কোনো দিন সাহিত্যসভা বসে সিংহসনে। সেদিন তার জানলাগুলি খুলে দেওয়া হয়। ঘুলঘুলিতে বাসা বাঁধা পায়রা গুলো ডানা ঝাপটায় অযথা। এত কিছুর মধ্যেও সেই চিরকেলে কামিনীগাছ কিন্তু সিংহসদনের এক কোণে দাঁড়িয়েই থাকে! বর্ষারাতে সে পাপড়ি ঝরায় অক্লেশে। তখন গন্ধে ভরে যায় তার চিরপরিচিত শরীরখানি। ফুল ঝরানোর খেলায় সিংহসদনকেও সে সঙ্গী করে নিতে চায় বুঝি বা।

       বেলা গড়িয়ে এলে স্কুল শেষের ঘণ্টা পড়ে। ছেলেমেয়েরা যে যার ঘরে ফেরে, হস্টেলে ফেরে। কোলাহল মুখর প্রাঙ্গনটি এবার নৈশঃব্দের আবেশ মাখে। সিংহসদন দাঁড়িয়েই থাকে। সে ঘাড় উঁচু করে দেখে, ইতিহাস ঘরের মাথা কেমন চমৎকার কাগজফুলে ছেয়ে গেছে। ছাতাকলে জল খাচ্ছে ক্লান্ত কিশোর। পাঠভবন অফিসের গায়ে কাঁচে ঢাকা ফ্রেস্কোগুলি সে কত কত দিন ধরে দেখছে! নিমাইয়ের জন্মকাথার কী অপূর্ব চিত্রকথা! দেখতে দেখতে তার মনে পড়ে যায়, ফাগুন দিনের জোছন মাখা গৌর-প্রাঙ্গন। একলা বসে সময়ের জোব্বা খসিয়ে সে তখন চির কিশোরী সেই কামিনীর সঙ্গে সখ্যে মাতে। কে বলে কামিনী নির্বাক? ‘আমার চলা যায় না বলা আলোর পানে প্রাণের চলা’ – একথা তো কামিনীই বলেছিলো! কেবল মাত্র, আকাশই বোঝে আনন্দ তার, বোঝে নিশার নীরব তারা। সিংহসদন এমন রাতে সময়ের হিসেব ভুলে যায়। ঘণ্টা বাঁধা দড়িখানি দুলতেই থাকে।(চলবে)

ছবি:কনক লতা সাহা