আমার শান্তিনিকেতন

অমৃতা ভট্টাচার্য

মোরাম বিছানো পথ, বৃষ্টিভেজা ফুলের সৌরভ, হোস্টেলের টানা বারান্দা, বারান্দায় দাঁড়ালেই দেখা যায় শালবীথি, আম্রকুঞ্জ। আরো দূরে খোয়াই। সব মিলিয়ে শব্দে শব্দে ভেসে থাকা শান্তিনিকেতন। প্রাণের বাংলায় সেই শান্তিনিকেতনের জীবন নিয়েই লিখতে শুরু করলেন কলকাতা থেকে অমৃতা ভট্টাচার্য। একদা শান্তি নিকেতনের ছাত্রী, এখন চারুচন্দ্র কলেজে অধ্যাপনা করছেন।

বর্ষার গল্প একবার শুরু হলে যেন থামতেই চায় না। একেকটা বাদল-ঝরা দিনের মতো স্মৃতির বৃষ্টি ভিজিয়ে দিয়ে যায় বিগত দিনের কথামালা। সেই যখন মেঘ মাখা দুপুরে লাল টুকটুকে করমচা মেঘের ছায়ায় গাঢ় বর্ণ ধারণ করতো! আমি আর প্রীতিকণা ভেজা ছাতার ভিতর করমচা নিয়ে সন্তর্পণে উঠোন পেরোতাম! কেউ টের পেলে বকুনি বরাদ্দ ছিলো কি না জানিনা, তবে গোপনীয়তায় শিহরণ আছে। সে কি কম! আর ছিলো এক জামির লেবুর গাছ। সেই মাধবী হোস্টেলে। যার পিছনে ট্যাঙ্কের জল উপচে পড়তো। তুলতুলে মাটি আর দোলনচাঁপার স্বর্গরাজ্য ছিলো সেই নিভৃত পরিসরে। আমরা দোলনচাঁপার গন্ধ মাখতাম। চুলে ফুল লাগিয়ে বর্ষা-কবিতা পাঠের উৎসবে যেতাম। সেই কবিতার আসরে কত কত মেঘ তুলোট কাগজ হয়ে ছড়িয়ে যেতো মনে মনে। ভিড় ঠেসা সভাতেও নিজেকে তখন একলা মনে হতো। আমার চারিধারে তখন অনন্ত জলরাশি। এই বর্ষাযাপনের মধ্যেই বাইশে শ্রাবণ পেরিয়ে এসে পড়তো রবীন্দ্র-সপ্তাহ। সারা সপ্তাহ জুড়ে গান, কবিতা আর আলোচনা। তার সবটুকু যে বুঝতাম তা নয় কিন্তু এই না বোঝা, না জানার যে কতো গভীর ব্যাপ্তি সে কথা জেনেছিলাম সেদিন। আর ছিল বর্ষামঙ্গল। গানের হিল্লোলে নীলনবঘন শাড়ি পরা মেয়ের দল যখন নাট্যঘরে পায়ের ছন্দে তুফান তুলতো তখন মেঘমেদুর বিষাদ ভুলে আমিও হতে চাইতাম ভানু সিংহের নায়িকা। তবু, উৎসবেরও তো অন্ত আছে! শ্রাবণের দিন তাই নিত্যদিনের অভ্যাসে দরজায় এসে দাড়াতো। আমাদের প্রতিদিনের অভ্যাসে কোনো বিচ্যূতি ছিলো না। ছিলো নিত্য নতুন আস্বাদন। মেঘলা মাঠে, গাঢ় সবুজ ঘাসে আমরা ভেলভেট পোকা কুড়তাম। লাল মখমলে পোকা হাতের তালু বেয়ে গুটিগুটি পায়ে চলতো। এই দেখাটুকু ভালোলাগায় ভরিয়ে দিতো মন। তখন কি আর ছাই বুদ্ধদেব বসুর মেঘদূত পড়েছি! ভেলভেট পোকার মেঘদূত সম্পৃক্ততা তখনও বুদ্ধির অগোচরে। অত শত গভীর কথা না জেনেই বর্ষার গভীরতাকে আমরা ধারণ করতে শিখছিলাম শৈশব, কৈশোর জুড়ে। বর্ষা পেরোলেই যে শরৎ ! শারদোৎসব-এর মহড়ার সঙ্গে কেমন শ্রাবণ বিকেল গুলো মিলেমিশে এক হয়ে আছে। শিশু বিভাগের স্টাডিরুমে সৌরেনদা ব্যস্ত কচিকাঁচাদের নিয়ে। কোনোবার ঘ্যাগাসুর, কোনোবার বা ক্ষীরের পুতুল! বয়েসে বড় ছাত্ররা যদিও ‘শারদোৎসব’ বা, ‘রাজা’র মহড়া দিচ্ছে গভীর অনুধ্যানে। আমরা দল বেঁধে এইসব কর্মকাণ্ডের সাক্ষি থাকি। রোজ রোজ দেখি। কী যে ভালো লাগে কী বলবো! যেবার অভিনয়ের ডাক পাই সেবার যেন বর্তে যাই। আর না পেলেও ক্ষতি নেই। জানলায় পা উঁচু করে দেখি উপনন্দ কেমন গভীর মনযোগে পুঁথি নকল করছে। পুঁথি নকল করায় যে কী সুখ তা সেদিন অনেক চেষ্টায় বুঝতে চেয়েছি। সব কি আর সব বয়সে বোঝা যায়? না বোঝা উচিত? সন্ধ্যে নামতেই ছেলেমেয়েরা বাড়ি ফেরে, হোস্টেলে ফেরে। মাস্টার মশাইরা তখন আবার আসর সাজিয়ে বসেন। শুরু হয় শিক্ষক দিবসের নাটকের মহড়া। বেশির ভাগ সময়েই চিরকুমার সভা বা লম্বকর্ণ পালা। আর হতো ভুষুণ্ডীর মাঠে। মাস্টার মশাইরা তখন খোলস ছেড়ে অন্য মানুষ। আড়াল আবডাল থেকে আমাদের কৌতূহল নিবৃত্ত করতে চাইতাম। বংশলোচন ব্যনার্জীর বৈঠকখানা ঘরটি আমাদের যেন টানতো। আমাদের হিন্দী পড়াতেন পাণ্ডেজী। সেবার লম্বকর্ণ পালায় উনি চুকন্দর সিং সাজলেন। আমরা সবে দ্বিতীয় শ্রেনি, আমরা কি আর জানি? রাস্তায় ওনাকে দেখেই শুক্লা বলে বসলো ‘চুকন্দর সিং নমস্কার’। মাস্টারমশাইদের দেখলে নমস্কার বলাই যে আমাদের রীতি! পাণ্ডেজী কিন্তু রাগেননি এতটুকু। হেসেছিলেন সস্নেহে। কৌতুক বোধ করেছিলেন হয়তো বা! শুয়ে থাকা আশ্রম মাঠে আজও যখন মেঘের ছায়া পড়ে, কচি ঘাসের রঙ গাঢ়তর হয়, …তখন আমি ফিরে যাই সেই বৃষ্টিভেজা মহড়ার দিনগুলিতে। সাহিত্যের মধ্য দিয়ে আমার কৈশোর তখন বড় হতে থাকে স্নেহে, আদরে, উপনন্দের সঙ্গে সঙ্গে। যে বেতসিনী নদী আমি দেখিনি কখনও , তাকেও তখন পরিচিত বলে বোধ হয়। দেখি, মেঘদূতের বিরহ পেরিয়ে কখন যেন শরতের মেঘে আকাশ গিয়েছে ভরে। আর আমার সেই ফেলে আসা দিন কেবলই যেন তার আনন্দের ঋণ শোধ করছে।

ছবি: কনকলতা সাহা