আমার শান্তিনিকেতন

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

অমৃতা ভট্টাচার্য

মোরাম বিছানো পথ, বৃষ্টিভেজা ফুলের সৌরভ, হোস্টেলের টানা বারান্দা, বারান্দায় দাঁড়ালেই দেখা যায় শালবীথি, আম্রকুঞ্জ। আরো দূরে খোয়াই। সব মিলিয়ে শব্দে শব্দে ভেসে থাকা শান্তিনিকেতন। প্রাণের বাংলায় সেই শান্তিনিকেতনের জীবন নিয়েই লিখতে শুরু করলেন কলকাতা থেকে অমৃতা ভট্টাচার্য। একদা শান্তি নিকেতনের ছাত্রী, এখন চারুচন্দ্র কলেজে অধ্যাপনা করছেন।

কলকাতা থেকে যখন বোলপুর যেতাম তখন অজয় পেরোতাম। লম্বা ব্রিজ। চওড়া নদী।জলশূন্য প্রায়। বালিতে ঢাকা তার বুক। এক পাশে হয়তো চাষ করেছে কেউ। ছোটো ছেলেরা অল্প জলেই লাফাচ্ছে সারাদিন।রোদে তেতেপুড়ে কখন তারা বাড়ি ফিরবে কে জানে! বর্ষায় এই অজয়েই লাল, ঘোলা জলের প্রবাহ। চড়া তখন জলের তলায় অদৃশ্য। নেচে নেচে ঘুরে ঘুরে যে জলের ধারা চলেছে সে উদ্দাম, সে বড় সুন্দর। ঘোলা জলের নদী তখন যেন গলিত স্বর্ণ সুবর্ণরেখা। আর আছে কোপাই। সেই শান্ত মেয়েটি। জলজ শ্যাওলা খুঁটে খায় ছোট ছোট মাছ।

আমরা গোয়ালপাড়ার পথ ধরে নদীর ধারে গিয়ে বসি। বনভোজনের দিন আমরা শিক্ষক ছাত্র একসঙ্গে কোপাইয়ের পাশে বসে মুড়ি খাই, পাত পেড়ে খিচুড়িও। কেউ কেউ হাঁটুজলের নদী পেরিয়ে ওপাড়ে সর্ষেক্ষেতে গিয়েছে হয়তো। আমরা তখন আমাদের ফাল্গুনী’দাকে ঘিরে ধরে গল্প শুনছি। তন্ময় হয়ে যাচ্ছি। তখন অনেক ছোটো। শুধু ভাবছি ফাল্গুনী’দা কেমন অসামান্য মুন্সিয়ানায় গল্প বলেন। পুঁইমাঁচা, ছোটোবাবু …শুনতে শুনতে চোখে জল আসে। কোপাইয়ের হাঁটুজল পেরিয়ে তখন চোখ চলে যায় ওই দূরে। ঝাপসা হয়ে আসে দূরের বর্ণমালা।

বনভোজন শেষে আমরা ফিরে আসি বটে মন খানি ফেলে আসি নদী তীরে যেখানে শৈবালদামে ছোটো মাছেরা খেলে বেড়ায় অবাধ। এভাবেই অজয় আর কোপাই আমাদের শৈশব জুড়ে গল্প রচনা করতে থাকে। উপন্যাসের চলনের মতো কতো কতো বাঁক সেখানে। মানুষের বৃহৎ জীবনকে আধার দিতে চায় যেন তারা। আমরা তখন কিশোরীবেলায়। উপন্যাস পড়ি বটে, তবে বয়স তার নিজের স্বভাবে জাগে। আমাদের বয়ঃসন্ধি জুড়ে প্রতি প্রতি দিন কতো কতো ছোটোগল্প ওঠে আর পড়ে। এই সব মুহূর্তের কথামালারা ধানসিড়ি, জলঙ্গির ঢেউ-এ ঢেউ-এ হারাতে চায়। কিন্তু চাইলেই বা পাচ্ছে কোথায়? তবু সাধ বড় বিষম বস্তু। ময়ূরাক্ষীর ক্যানেল তখন তাই ধানসিঁড়ি হয়ে উঠতে চায়। তার দু’পাশে পা ডুবিয়ে থাকা সোনাঝুরিরা যেন কতো কতো অসমাপ্ত গল্পের হারিয়ে যাওয়া অধ্যায়।

মাটি ধোয়া জলের ক্যানেল তাই আমাদের শৈশব কৈশোর জুড়ে নদী হয়ে উঠতে চায়। এই চাওয়া বড় স্বাভাবিক। বয়ঃসন্ধির মতো। রতন কুঠী পেরিয়ে বাঁ হাতে উত্তরায়ণ ছাড়ালেই আর কিছুটা পথ। তারপর শ্যামবাটি। ঢালু রাস্তা বরাবরা নেমে গেলেই ফুলডাঙ্গার মোড়। আমাদের সাধের ক্যানেল সেখানে দুদিকে দু’হাত মেলে বুক পেতেছে মিতালি করবে বলেই। সাইকেল থামিয়ে ঘন ঘোর বর্ষার দুপুরে আমরা জল দেখি। আর কিছু নয়! ঝরে পড়া অনন্ত জলরাশি আমাদের স্থাণু করে দিতে পারে তার আশ্চর্য যাদুমন্ত্রে। সামান্য মানুষের হাতে গড়া সেচ প্রকল্প কেমন নায়াগ্রা হয়ে ধরা দেয় আমাদের শ্রাবণ দিনে। এই জল দেখতে দেখতে অজয়, কোপাইয়ের কথা কোনো দিন বা ভুলেই যাই। এই ভোলায় তো কোনো অন্যায় নেই! মানুষের হাতে কাটা খাল তবু তার অ-গৌরবকে আমরা ভুলতে চেয়েছি বার বার। আমাদের নিতান্ত নাগালের মধ্যে এই পাওয়াটুকু বড় বিস্মিত করতো।

ওই যে বললাম, উপন্যাস পড়ার চেয়ে ছোটোগল্পে তখন ডুবে আছি নিশিদিন। তেমনই এক দিনে মেঘ করেছে দুপুর জুড়ে। আমাদের সহপাঠী, আমাদের চেয়ে সামান্য বড় সমরেশ’দা সেদিন ওই লাল জলে ভেসে গেল কেমন অকারণ অবাধে। তার দেহখানি এল গৌরপ্রাঙ্গনে। ফ্রকের কোচড় ভরে আমরা তুলে এনেছিলাম টগর, বৃষ্টি ভেজা কামিনী, গুলঞ্চ। আশ্রম গিরে ঘিরে আমরা গাইলাম, আমরা হাঁটলাম।গুঁড়ো গুঁড়ো বৃষ্টি আমাদের ভিজিয়ে দিলো নিঃশব্দে। এমনই কোনো এক শ্রাবণে রগুরুদেবের প্রয়াণবার্তা এসে পৌঁছেছিলো বোধহয়! রেলিঙে বুক চেপে ধরে ক্যানেলের জল দেখতে দেখতে ভাবি এই অনন্ত জলরাশি কতো কতো বুদবুদ নিয়ে ভেসে চলেছে। যেন অনন্ত কথামালা হারিয়ে যাবে বলেই পণ করেছে। দেখতে দেখতে আমি স্থির জানি, আজ বৃষ্টি পড়বেই। আজ বাইশে শ্রাবণ।

ছবিঃ কণকলতা সাহা

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]