আমার শান্তিনিকেতন

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

অমৃতা ভট্টাচার্য

মোরাম বিছানো পথ, বৃষ্টিভেজা ফুলের সৌরভ, হোস্টেলের টানা বারান্দা, বারান্দায় দাঁড়ালেই দেখা যায় শালবীথি, আম্রকুঞ্জ। আরো দূরে খোয়াই। সব মিলিয়ে শব্দে শব্দে ভেসে থাকা শান্তিনিকেতন। প্রাণের বাংলায় সেই শান্তিনিকেতনের জীবন নিয়েই লিখতে শুরু করলেন কলকাতা থেকে অমৃতা ভট্টাচার্য। একদা শান্তি নিকেতনের ছাত্রী, এখন চারুচন্দ্র কলেজে অধ্যাপনা করছেন।

আমাদের প্রত্যেকের জীবনেই শৈশবের একটু বিশেষ তাৎপর্য আছে। সারা জীবনের আখর যেন সুনিপুণ হাতে সাজিয়ে দিতে চায় কেউ ওই শৈশবেই। শান্তিনিকেতন তাই আমার বা আমার মতো আরও অনেকের কাছেই নিছক বিদ্যায়তন নয়, বরঞ্চ মৃৎশিল্পীর মতো সে আমাদের জীবন কে গড়েছে নানা বিভঙ্গে।
বাইশে শ্রাবণ এলেই সেই কথাখানি বিশেষ করে মনে পড়ে যায়। গুরুদেবের মৃত্যুদিনে এই বৃক্ষরোপণের সংযুক্তিকে তখন গভীর আবেগে চিনে নিতে শিখি আমরা। কদমের গুঁড়ো গুঁড়ো রেণু ঝরে অবিরাম। আমরা তার উপর দিয়ে হেঁটে যাই, কদমের গন্ধ মাখি শরীর জুড়ে। মাখতে মাখতে কখন মেঘ হয়ে উঠি যেন! আমার জঙ্গম দেহাবয়বখানি তখন নিতান্ত তুচ্ছ মনে হয়। মানবজীবনের বিবিধ সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে, বাইশে শ্রাবণ আমাকে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড় করিয়ে দেয়।
যখন এত কিছু তলিয়ে ভাবার বয়স হয়নি, তখন লাল পাড় হলুদ শাড়ি পরে বৃক্ষরোপণের অনুষ্ঠানে নেচেছি। লাল কাঁকরে রাঙিয়েছি পা-দু’খানি। তখন মৃত্যু নিছক জীবনাবসান হয়েই আমার চৈতন্যকে আচ্ছন্ন করেছিলো। দ্বিতীয় শ্রেণীর আর ক্ষমতাই বা কতটুকু? পঞ্চভূতের ব্যঞ্জনাই বা সে কতটুকু বোঝে? এই সমস্ত বোঝা, না বোঝা নিয়ে আমার শৈশবের তরীখানি ভেসেছিলো সেদিন। এখনও বর্ষা এলে কাঁঠাল পাতায় মেঘের ছায়া পড়ে। গাঢ় সবুজ পাতা দিয়ে আমরা ফুলের গয়না বানাতাম। সাদা টগরের কুঁড়ি আর লাল রঙ্গনের বিন্যাসে শ্রাবণের অনাড়ম্বর লাবণ্যখানি আত্মস্থ করতে চাইতাম বোধহয়। এই রঙের বিন্যাস, এই আলপনার আদল শান্তিনিকেতন নিজের মতো করে নির্মাণ করেছে। গৌরী ভঞ্জের হাতের কাজ দেখতে দেখতে ভাবি, তিনি শিল্পী ছিলেন বটেই আরও বেশি করে ছিলেন আশ্রমকন্যা। রবীন্দ্রনাথের এই আশ্রমভাবনাকে তাঁরা বুঝেছিলেন গভীর আশ্লেষে। রঙের ব্যবহার, তুলির টান, আলপনার বিন্যাস সর্বত্রই সেই অনুপাত, সেই কড়ি-কোমলের অবস্থান এক ভাবে নির্ধারিত। ভালো-মন্দের বিতর্কে না গিয়ে বলা যায়, তা শান্তিনিকেতনী। বিশেষ দিনে উদয়ন বাড়ির সামনের আলপনায়, সমাবর্তনে আম্রকুঞ্জের আলপনায় বা বৃক্ষরোপণের ফুলের গয়নায়, চতুর্দোলার সজ্জায় সেই শিল্প-আত্মাটি আমরা দেখেছি, চিনেছি। রঙ এবং রেখা কীভাবে চৈতন্যকে আচ্ছন্ন করে তা টের পেয়েছি প্রতিদিনের যাপনে। ক্ষমা’দির হাতের কাজের ক্লাস করতে করতে ওনার আঁকা ছবি দেখেছি মুগ্ধ হয়ে। তখন ওনার প্রৌঢ়দেহ, তবু কী সাবলীল! রঙের ব্যবহার সেই নির্ধারিত বিন্যাস ফিরে ফিরে আসে। আমাদের হোস্টেলের সিলিঙ জুড়ে সেই কত সব ফ্রেস্কো। কোথাও রঙের বাড়াবাড়ি নেই। তাতে আবেগের খামতি নেই এতটুকু! এই চিত্রনৈপুণ্য এই শিল্প-দর্শন তো ঠিক নিক্তি মেপে শেখার নয়! দেখার চোখ তৈরি করে দিতে চেয়েছিলেন আমাদের মাস্টারমশাইরা। বর্ষার দিনে এই সব মনে পড়ে যায় অকারণে। বাইশে শ্রাবণ হয়ে উঠতে চায় কত কত শ্রাবণ দিন। এমন সব দিনে কোন সুদূর বিদিশা নগরী জুড়ে মেঘের ঘনঘটা, রেবা নদীতে মেঘের ছায়ারা গা এলিয়ে দিয়েছে হয়তো! আমাদের উপাসনা মন্দিরে কে যেন গাইছে – ‘ভরা বাদর মাহ ভাদর শূন্য মন্দির মোর’…। সেই কোন বিদ্যাপতির পদ আর উপনিষদের বাণী মিলেমিশে যাচ্ছে শ্রাবণ ধারায়।
আমাদের কিশোরীবেলা এমন দিনে ফলসা রঙা শাড়ি জড়িয়েছে তন্বী দেহখানি ঘিরে। অবিন্যস্ত বেণীর প্রান্তে দোলন চাঁপার গুচ্ছ। লাল জলস্রীত ঠেলে ঠেলে তারা চলেছে। রঙের এতটুকু বাড়াবাড়ি নেই। ক্ষমা’দির ছবির মতো শান্ত, নিরুদ্বেগ।আজ আর চাইলেই বা ফিরে যাব কী করে? এমন শ্রাবণ দিনে তাই যখন কালো মেঘের ওপাড় থেকে অরুণ আলো দেখা দেয়, তখন জীবন মৃত্যুর পার্থিব গণ্ডীটুকু মুছে যায়। রঙ আর রেখার আশ্চর্য বিন্যাসে অসিত হালদারের ছবি হয়ে ওঠে এই চরাচর। আমার ফলসা রাঙা শৈশবখানি যেন কোন অনন্ত বিরহের ওপাড়ে এসে থমকে দাঁড়ায়। সেখানে সশরীরে উপস্থিত হওয়া যায় না! শ্রাবণের বিকেল জুড়ে তখন মেঘ ভেসে যায় হাওয়ায় হাওয়ায়। যেন সে কোন পাল তোলা নৌকা। মেঘছেড়া রোদ্দুরের মনে হয় যেন ঠিক একখানি সোনার তরী। সে চলেছে, কেবলই চলেছে।

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]