আমার শান্তিনিকেতন

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

অমৃতা ভট্টাচার্য

মোরাম বিছানো পথ, বৃষ্টিভেজা ফুলের সৌরভ, হোস্টেলের টানা বারান্দা, বারান্দায় দাঁড়ালেই দেখা যায় শালবীথি, আম্রকুঞ্জ। আরো দূরে খোয়াই। সব মিলিয়ে শব্দে শব্দে ভেসে থাকা শান্তিনিকেতন। প্রাণের বাংলায় সেই শান্তিনিকেতনের জীবন নিয়েই লিখতে শুরু করলেন কলকাতা থেকে অমৃতা ভট্টাচার্য। একদা শান্তি নিকেতনের ছাত্রী, এখন চারুচন্দ্র কলেজে অধ্যাপনা করছেন।

একেকটা শহরের ভিতর যেমন একেকটা শহর লুকিয়ে থাকে, তেমনই শান্তিনিকেতনের ভিতরে যেন আরেকটা শান্তিনিকেতন আত্মগোপন করে থাকে। সেই শান্তিনিকেতন আন্তরিক হয়েও নিতান্ত ছাপোষা জীবন কাটায় বট পাকুড়ের ছায়ায় ছায়ায়। সেখানে ভাদ্র মাসের সন্ধ্যে জুড়ে ভাদুগানের দল বেরোয়। ভাদুর মূর্তি গড়ে দেন মহেন্দ্র’দা। আমাদের সহপাঠী আবাসিক ছেলেরা এ বাড়ি সে বাড়ি ঘুরে, মেয়েদের হোস্টেলে ঘুরে ঘুরে গান গায়, নাচে। কেউ বা শাড়ি পরে, কেউ বা ঘাগরা । গান বেঁধে দেন আমাদেরই কোনো মাস্টার মশাই। সুর দেন আরও কেউ। ওরা এক মাস ঘুরে ঘুরে গান শোনায়, পরিবর্তে চাল পায়, আলু পায়, পয়সাও কখনও বা।
আমরা বাজনা শুনেই পড়া ফেলে ছুটে আসি। মুখ টিপে হাসি। আরেক বার হোক, বলে আবদার জানাই। ওরাও হয়তো একটু লজ্জা পায়। কে জানে! আমরা রাত্তিরে খেতে যেতে যেতে ভাদুর গল্প বলাবলি করি। প্রসঙ্গ ক্রমে টুসুর কথাও এসে পড়ে। এভাবেই আঞ্চলিক লোকগানের সঙ্গে, লোককথার সঙ্গে আমরা পরিচিত হতে থাকি। মাসের মধ্যে এক এক দিন দান-সংগ্রহে যাই। সীমান্ত পল্লী, গুরু পল্লী , রতন পল্লী এক এক দিকে গন্তব্য একেক বার। বাড়ি বাড়ি ঘুরে অনুদান সংগ্রহ করি। কেউ দেন, কেউ বা দেন না। না দিলে বয়ঃসন্ধিজাত ক্রোধ মাথা চারা দিয়ে উঠতে চায়। মাস্টার মশাইরা আমাদের বুঝিয়ে শান্ত করেন নানা কৌশলে।
সমস্ত অনুদান জমা পড়লে আরেকদিন হয় গ্রাম পরিদর্শন। নিকটবর্তী কোনো অনুন্নত পল্লীতে আমরা আসর বসাই। বাড়ি বাড়ী ঘুরে জানতে চাই তোমাদের কী কী চাই। তারা হয়তো লজ্জা পায়। আমাদের ভাব ভঙ্গি দেখে মজা পান কেউ বা। সব শেষে গ্রামের প্রান্তে আমাদের সভা বসে। আমরা তাদের গান গেয়ে শোনাই, নাচ দেখাই। তাঁরাও কোচড় ভরে মুড়ি খাওয়ান, জল খাওয়ান। পেট ভরে মুড়ি খেয়ে আমরা আবার ফিরতি পথ ধরি। পার্থ’দা, অভীক’দার সঙ্গে গলা মিলিয়ে আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে জানিয়ে দিই, …’আমাদের ক্ষেপিয়ে বেড়ায় ক্ষেপিয়ে বেড়ায় ক্ষেপিয়ে বেড়ায়…’ । এই ক্ষ্যাপামি তখন আমাদের তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়। আমরা তখন মাটির সঙ্গে মিশে মাটি হতে চাই। আমরা চিনতে চাই নিরন্ন গ্রাম ভারতে কঙ্কালটিকে। গুরুদেবের শ্রীনিকেতনের ভাবনাটি তখন আমাদের ভাবায়। আমরা ছোটো তবু যেন বুঝতে চাই পল্লীশিক্ষা ভবনের ভিতরের কথাটিকে। হাতে কলমে কাজ, কারিগরি শিক্ষার মধ্য দিয়ে স্বদেশের আত্মাকে কী ভাবে ছোঁয়া যায় তার ভাবনা আমাদের তখন তাড়িত করে।
হোস্টেলে ফেরার পরেও দেখি এক গভীর বিষাদ মিশ্রিত আনন্দ আমাদের গ্রাস করে। আমরা স্বল্পবুদ্ধি দিয়ে গ্রামের সমস্যা সমাধানের কথা ভাবি। বিজলী মাসি যখন ঝাঁট দেয় তখন তার হাতের অপূর্ব উল্কি দেখতে দেখতে তার গ্রামের কথা জানতে চাই। মানুষের মধ্যে থেকে পল্লী বাংলাকে চিনতে চেষ্টা করি। আজ ফিরে দেখতে বসলে মনে হয়, রবীন্দ্রনাথ তাঁর শেষবেলাকার মাটির বাড়িটির নাম রেখেছিলেন শ্যামলী। সেই যেখানে অন্দর গিয়ে মিশেছে পথে।কোনো কোনো বিকেলে গ্রাম পরিদর্শনের পর আমারও অমন করে গ্রামে ফিরে যেতে ইচ্ছে করে। বালি পাড়া, বনের পুকুর ডাঙ্গা আমায় তখন হাতছানি দিয়ে ডাকে। আমি তখন ভিতরে ভিতরে টের পাই তিন পাহাড় পেড়িয়েই, কাঁচ মন্দির পেড়িয়ে রতন কুঠী পেড়িয়ে আমরা ইস্কুলের চৌহদ্দি তখন শাল পিয়ালের বনে হারিয়ে গেছে। এই সব ভাবতে ভাবতে উপাসনার ঘণ্টা পড়ে। মাটি, মানুষ আর গাছগাছালির মধ্য দিয়ে যেতে যেতে আমি প্রণত হই।

ছবি: লেখক

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]