আমার শান্তিনিকেতন

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

মোরাম বিছানো পথ, বৃষ্টিভেজা ফুলের সৌরভ, হোস্টেলের টানা বারান্দা, বারান্দায় দাঁড়ালেই দেখা যায় শালবীথি, আম্রকুঞ্জ। আরো দূরে খোয়াই। সব মিলিয়ে শব্দে শব্দে ভেসে থাকা শান্তিনিকেতন। প্রাণের বাংলায় সেই শান্তিনিকেতনের জীবন নিয়েই লিখতে শুরু করলেন কলকাতা থেকে অমৃতা ভট্টাচার্য। একদা শান্তি নিকেতনের ছাত্রী, এখন চারুচন্দ্র কলেজে অধ্যাপনা করছেন।

অমৃতা ভট্টাচার্য

অনেক ছোটোবেলাতেই বাড়ি ছেড়ে এসেছিলাম। হোস্টেল জীবনটাই কেমন করে জানি জীবন জুড়ে বসলো। হয়ে উঠলো আমাদের দ্বিতীয় বাড়ি। বাড়ির নানা অনুষঙ্গ এখানেও দেখা দিলো সদর, অন্দরে। আর ছিলো পড়ে পাওয়া চৌদ্দ আনার মতো কিছু নিভৃত নিরালা ব্যক্তিগত পরিসর। যেমন বাড়ির চিলেকোঠার ঘরটি ভালোবাসে কেউ, কেউ বা বাগানের বকুলতলা! এইসব নিয়ে দিন কেটে যাচ্ছিলো নিজের নিয়মেই। তবু, শুধুই কি পড়াশোনা? শুধুই কি গান? মাটির কাজ? নন্দন মেলা? এসবের বাইরে গিয়ে আমাদের জীবনকে যারা সহজ করে তুলেছিলো তাদের কাছে ফিরে যেতে ইচ্ছে করে আবার। তারা নির্মলা মাসি, রামদেব’দা,বিশু’দা, নকুল’দা, ভবানী’দা আরও কত কত জন! তারা আমাদের এতটাই আপন হয়ে উঠেছিলেন যে, আমরা কে ক’হাতা ভাত খাই তারা জানতেন। কার কেমন করে শ্যাম্পু করে দিলে আরাম লাগে তারা জানতেন। আমাদের কৈশোরের অমূল্য দিনগুলি তারা এমন ভাবে ঘিরে ছিলেন, তেমন ভাবে বোধহয় আমাদের অভিভাবকরাও পারতেন না!

সন্তোষালয়ের দিনগুলোর সঙ্গে যেন ভারী নির্দিষ্ট করে জড়িয়ে আছে নির্মলা মাসি। ডানদিকে আঁচল, মাথায় ঘোমটা দেওয়া সদাহাস্যময়ী। কেমন যত্নে তেল মাখিয়ে দিতো। আমায় আদর করে ডাকত, ‘অমৃতাঞ্জন’! রাতে খাওয়ার লাইনে, যেতে যেতে কতো গল্পই যে করতো! কোনো কোনো দিন সব্বার মশারি দিতো টানিয়ে। আমরা জানতাম এই কাজটা নির্মলা মাসির না করলেও চলে। তবু করে দিত। মা যেমন অনেক অতিরিক্ত কাজ করে দেন স্নেহবশত!

আমাদের শৈশব ঘিরে তাই শেফালি মাসি যত না আছে তার চেয়ে বেশি আছে নির্মলা মাসি। শেফালি মাসিও হয়তো মন্দ ছিলো না কিন্তু তাকে আমরা ভয় পেতাম কিঞ্চিত। তার নামে নালিশও করেছি নির্মলা মাসির কাছে। ঠিক যেমন রামদেব’দা! প্রতি বুধবার বিকেলে মলিন ধুতি পরে, সাইকেল চালিয়ে আমাদের নখ কেটে দিতে আসতো তার নুরুণটি হাতে। আমরা হাত মেলে পা মেলে বসতুম। কোনোদিন চুলও কেটে দিতো অসামান্য দক্ষতায়। ঝাপসা চোখে চশমা পরে বুঝে নিতে চাইতো মাপ। হাতের চামড়ায় বয়সের ছাপ পড়লেও আন্তরিকতায় সে ছিলো আশ্রমিক। সেকেণ্ড গেটের পাশে রামদেব’দার কুড়েঘরখানি আজ আর নেই। দেওয়ালের মাটি গলে মিশে গেছে মাটিতে। যারা তাকে চেনে না তারা তো জানতেও পারলো না, সেই কোন একদিন একটা ছোট্ট মেয়ের চুল কাটতে গিয়ে কান অল্প ছড়ে গিয়েছিলো বলে সেই দুঃখে রামদেব’দা এক রাত ভাতই খায়নি! সেই কোথায় বিহারের কোন জেলায় তার বাড়ি আমরা কোনোদিন তার খোঁজও নিইনি। তবু আমার খালি মনে হতো, কাবুলিওয়ালার মতো সেও হয়তো দূর দেশে তার ছোট্ট মেয়েটিকে ফেলে এসেছিলো এক যুগ আগে! আমাদের জেদ, আমাদের দুষ্টুমির জন্য কোনোদিন তো সে বিরক্ত হয়নি!

এরকমই মনে পড়ে বিশু’দার কথা। কোনো এক মেঘলা সকালে বারান্দার কোণে বসে আমাদের ছেড়া জুতো, ছাতা সেলাই করছে। বড় শান্ত, করুণ। রোগা, রোগে ভোগা বিশু’দা বাঁচেওনি বেশিদিন। তারপর কাজে বহাল হলো তারই জামাই। জগদীশ’দা। অদ্ভুত ভাবে তাকে আমরা বিশু’দা বলেই ডাকতাম। কিন্তু কেন? এমন তো আমরা আর কারোর সঙ্গে করিনি! আমরা তখন তৃতীয় শ্রেণী, ফ্রয়েডিয়ান স্লিপ কি আমরা বুঝি? বিশু’দার সেই শান্ত অভিযোগহীন অবয়বখানি আমাদের ছেলেবেলার গল্পকথার দুয়োরানির সঙ্গে মিলে মিশে যেতো। তাই কি আমরা তাকে অমন করে ভালোবেসেছিলুম? জানিনা। এই সব না জানা জমতে জমতে কবে সব বিস্মৃতির অতলে ডুবে যেতে থাকে তার হিসেব কেইবা রাখে?

ভবানী’দা আমাদের কাপড় কেচে দিতো মাত্র। তার কাছেও আমাদের আব্দারের অন্ত ছিলো না। মাড় কতটা হবে, দোলের পর শাড়ির রঙ কীভাবে তুলে দেবে তার হিসেব রাখতো ভবানী’দাই। তার সেই দীর্ঘ ব্যবহারে জীর্ণ সাইকেল কে না চালিয়েছে! অনেকদিন ভেবেছি লালবাঁধের পাড়ে গিয়ে একদিন ওদের কাপড় কাচা দেখে আসবো। সে আর হয়নি। জীবনে কত কিছুই তো হয় না। তার জন্য আফসোস থাকে, বা – থাকে না। রামদেব’দার ঘরের মতো সেইসব আফসোস ধুয়ে মুছে যায় কত অনায়াসে। সন্তোষালয়ের চানঘরখানি কেমন ভূতুড়ে বাড়ির মতো স্থবির হয় আছে, সেদিন দেখি। সেই স্থবিরতার সামনে নতজানু হই, করুণা প্রার্থনা করি। যা ছিলো, যা আজ নেই তার জন্য ত্রিভুবনের সহানুভূতি না থাক, তাকে হারিয়ে ফেলার ভয়টুকু যেন থাকে। ওইটুকুই ব্যক্তিগত। বাকি আর যা কিছু সবই তো বারোয়ারি। তাই না?

ছবিঃ কনকলতা সাহা

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]