আমার শান্তিনিকেতন

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

অমৃতা ভট্টাচার্য

মোরাম বিছানো পথ, বৃষ্টিভেজা ফুলের সৌরভ, হোস্টেলের টানা বারান্দা, বারান্দায় দাঁড়ালেই দেখা যায় শালবীথি, আম্রকুঞ্জ। আরো দূরে খোয়াই। সব মিলিয়ে শব্দে শব্দে ভেসে থাকা শান্তিনিকেতন। প্রাণের বাংলায় সেই শান্তিনিকেতনের জীবন নিয়েই লিখতে শুরু করলেন কলকাতা থেকে অমৃতা ভট্টাচার্য। একদা শান্তি নিকেতনের ছাত্রী, এখন চারুচন্দ্র কলেজে অধ্যাপনা করছেন।

সন্তোষালয়ের দক্ষিণ দিকের বারান্দাখানি ভারী প্রশস্ত। বর্ষার দিনে ছায়া মেখে থাকে। বুলবুল‘দি বাংলা পড়ান এই বারান্দায়। রানি‘দিও ইতিহাস পড়ান, গান শেখান। কোনো কোনো দিন অসুস্থতার কারণে ইস্কুল কামাই করলে, শুয়ে শুয়ে বুলবুল‘দির পড়ানো শুনি। শুনতে শুনতে কখন যেন ঘুমিয়ে পড়ি আবার। এগারোটা বাজলেই কলকল শব্দে মুখরিত ডর্মেটরি। আমরা সব ধুলো উড়িয়ে, আসন লুটিয়ে ঘরে ফিরি। এখন আবার একখণ্ড মগে পাতা, আমাদের নিপাট সংসার ভেঙে চানঘরে যেতে হবে। বাহুল্য বর্জিত এই স্নানযাত্রায় সঙ্গী কেবল মগ, গামছা আর বেনিয়ান। পথ সামান্যই কিন্তু ওই বারান্দায় তৃতীয় শ্রেণীর দাদারা ক্লাস করছে। অতএব এক দৌড়ে পার হতে হবে ওই পথটুকু। দ্বিতীয় শ্রেনী বলে কি লজ্জাটুকুও থাকতে নেই মানুষের?

চানঘরখানি দেখলেই বাদশাহী হামামের কথা মনে পড়ে যেত আমার। সামান্য পাঁচিল দিয়ে ঘেরা তেঁতুল গাছের ছায়ায় এই সামান্য চৌবাচ্চাখানি তখন যেন আব্দুল মাঝির গল্পের মতো এক লাফে পাড়ি দিতে চাইতো অচিনপুরে। কখনও বা হয়ে উঠতে চাইতো জলপরীদের নিভৃত পরিসর। চৌবাচ্চার চারিধারে দাঁড়িয়ে আমরা চান করতাম, জল ছুড়তাম, নির্মলা মাসিকে ভিজিয়ে একশা করতাম। সমবেত স্নানের আনন্দে আমরা ভুলে যেতাম আমাদের ফেলে আসা বাড়ি, ব্যক্তিগত চানঘরের গন্ধ। প্রতি প্রতিদিন নিতান্ত প্রত্যূষে চৌবাচ্চা ধুয়ে, নালির মুখে ঝিম মেরে বসে থাকা কুনোব্যাঙকে বিতাড়িত করে জল ভরা ছিল এক ঝক্কি। ক্লান্তিহীন ভাবে নাজিয়া আর শিঞ্জিনী প্রতিদিন আমাদের জন্য জল ভরে দিত। তখন হয়তো আমরা কেউ কেউ উওরমুখী বারান্দার গোবর পরিষ্কার করতাম। এসব নিয়ে আমাদের কোনো ক্ষোভ ছিলো না। যাপনের মধ্যে আনন্দ ছিলো বলেই অনাবশ্যক ভার বোধ করিনি আমরা।
বৃষ্টি ভেজা ছাগল, গরুদের সঙ্গে আমাদের মিতালি ছিলো নিত্যদিনে। তাদের আমরা আপনজন বলেই জানতাম। তবু, এতো সব নিপাট রূপকথার মধ্যেও কুহকের ডাক তো মিলেমিশে থাকে! তেমনই ছিলো কাঁঠাল তলার অন্ধকার বাথরুম আর পাতা জমা এক চৌবাচ্চা। চৌবাচ্চার কালো জল যে কী অন্ধকার! আমরা ভাঙা ডাল ডুবিয়ে ডুবিয়ে পাতার কঙ্কাল তুলতাম কৌতূহলে। যেন কোন নিষিদ্ধ নগরীর প্রেতাত্মার মতো সেসব গভীর বিষাদে ঘেরা। বিষাদের মধ্যে কি কখনও কৌতূহল বা জিজ্ঞাসা মিলেমিশে থাকে? কে জানে! শুনশান দুপুরে সেই নির্জন কাঁঠালতলা আজও বিষাদময়ী জলকন্যার মতো উঠে আসতে চায় মগ্ন চৈতন্যের কোন অতল থেকে।
এমন সব দুপুরে দেবদারু গাছের অন্ধকার উঁচু ডালে ছিট্‌ কোকিল বসে থাকতো। আমাদের ইজের, বেনিয়ান শুকোতো বাগানের তারে। সেই যেখানে একটা বড় গন্ধরাজ ফুলের গাছ ছিলো না? গাছখানি আর নেই। মুকুটঘরের পিছনে আমাদের নানারঙে ঘেরা বাগানখানি এখন বিবর্ণ, মলিন। পাখিরা সে বাগানে আর আসে না। অন্ধকার কাঁঠালতলার বাথরুমখানিও ভেঙেচুরে মিলেমিশে গেছে। সময়ের কররেখায় তার দাগটুকুও মিলিয়ে যাবে ক্রমে। মালিভাইরাও কোথায় যে গেলো!
আমাদের শীতের রোদ্দুরমাখা সিঁড়ি এখন দিনান্তের অপেক্ষায় অখণ্ড অবসর যাপন করে। দিন ফুরোলে সে মনে মনে শুনতে পায়, এই বারান্দায় উপাসনার মন্ত্রোচ্চারণ। তারপর আবার সব অন্ধকার। সেই অন্ধকারে স্মৃতির পুনর্জন্ম হয়। ছিন্নমূল মানুষের ভিটেখানির মতো সে যেন স্মৃতি আগলে পড়ে থাকে আজও। অনেক দিন পর ঝুরিনামা বটগাছ পেরিয়ে, বয়রা পাতা মাড়িয়ে আবার কেউ যখন তার দাওয়ায় এসে বসে, তখন যেন লিলুয়া বাতাস বয়। শিতলপাটি বিছিয়ে দেয় কেউ। ছিট্‌ কোকিল আর ছাতারেরা ফিয়ে আসে আবার। বিগত জন্মের কথকতার মতো এই রোমন্থন একই সঙ্গে আনন্দে বিষাদে ভরিয়ে দিতে চায় মন। গন্ধরাজে আবার ফুল ফোটে, কেয়ারি করা বাগানের দু‘পাশে দোপাটি তার পাপড়ি ঝরিয়ে দেয় নির্দ্বিধায়। সাজিখানি ভরে ওঠে ক্রমে। সেই বারান্দা পেরিয়ে, কাঁঠালতলা পেরিয়ে, চানঘর পেরিয়ে যেতে যেতে কেবল মাত্র এইটুকুই তাকে বলে যেতে ইচ্ছে করে… সুধা তোমায় ভোলেনি’…

ছবিঃ লেখক

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]