আমার শান্তিনিকেতন

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

অমৃতা ভট্টাচার্য

মোরাম বিছানো পথ, বৃষ্টিভেজা ফুলের সৌরভ, হোস্টেলের টানা বারান্দা, বারান্দায় দাঁড়ালেই দেখা যায় শালবীথি, আম্রকুঞ্জ। আরো দূরে খোয়াই। সব মিলিয়ে শব্দে শব্দে ভেসে থাকা শান্তিনিকেতন। প্রাণের বাংলায় সেই শান্তিনিকেতনের জীবন নিয়েই লিখতে শুরু করলেন কলকাতা থেকে অমৃতা ভট্টাচার্য। একদা শান্তি নিকেতনের ছাত্রী, এখন চারুচন্দ্র কলেজে অধ্যাপনা করছেন।

শরৎ আমাদের উৎসবের কাল। মহালয়া মানে আমরা বুঝি আনন্দবাজার। চলতি কথায় যাকে বলি আনন্দমেলা। সে কি সামান্য উৎসব? তার প্রস্তুতি সেই কবে থেকে! মনে পড়ে, আষাঢ়ের ভিজে হাওয়ায় বসে বসে রুমাল বানাচ্ছি, পুতুল বানাচ্ছি, বানাচ্ছি সুতলির শিকে। মাধুরি‘দি ঘুরে ঘুরে তদারকি করছেন। পুরনো নরম হয়ে যাওয়া বইয়ের পাতা উল্টে ক্রসস্টিচের ডিজাইন ঠিক করে দিচ্ছেন। এমন সব টুকরো ছবি নিয়ে আনন্দবাজার একটা সম্পূর্ণ ছবি হয়ে উঠতে চায় বারবার। এই হয়ে উঠতে চাওয়ার সঙ্গে কেমন জানি বিশেষ ভাবে জড়িয়ে যেতে চায় করবী হোস্টেলের দিনগুলো।
আমরা নিজেদের সাধ্য মতো কত রকমের যে হাতের কাজ করতাম তার ইয়ত্তা নেই। কেউ বানাচ্ছে ব্যাগ, কেউ বা তাতে ফুল তুলছে, কেউ বা পুরনো টুকরো কাপড় জোড়াতালি দিয়ে কাপড়ের কোলাজ বানানোর চেষ্টা করছে নিপুণ হাতে। দুপুরে ঘুম নেই, ছুটির দিনে উদাস হওয়ার অবকাশ নেই। আগত আনন্দযজ্ঞে আমায় যে সামিল হতেই হবে! এমন একটা প্রত্যয় নিয়ে আমরা সকলে ব্যস্ত। মাধুরী‘দি, কেতকী‘দিও। কেতকী‘দিই প্রথম আমাদের শিকে বানাতে শেখালেন। গৌরীপুরী সরু সুতলি বেঁধে বেঁধে ,পুঁতি গেঁথে গেঁথে আমরা নতুন একটা কাজে মত্ত হলাম। কে কত তাড়াতাড়ি বুনে ফেলতে পারে তার একটা অদৃশ্য প্রতিযোগিতাও চললো কিছুদিন। শরতের রোদ্দুর যতো আলো ছড়ালো ততো তার আভা লাগলো আমাদের দেহে, মনে। শিশির ভেজা ভোরে আমরা শিউলি কুড়োতে শুরু করলাম। শরতের রোদ্দুরে গা ডুবিয়ে অকারণ ভালোলাগায় শিহরত হলাম। বুধবারের উপাসনা শেষে তোষক বালিশ রোদে দিলাম। কোনোদিন বা, সেই গরম তোষকের উপরেই ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখলাম, – কোথায় যেন চলেছি… ক্রমে ক্রমে শারদোৎসব শুরু হলো। রোজ রোজ কত গান, কত নাটক, কত রকমের কথকতা! তবু, সব উৎসবেরই তো অন্ত থাকে! দেখতে দেখতে তাই মহালয়া এসে পড়ে। আমরা মহালয়ার আগের সন্ধ্যে থেকে খেলার মাঠের গ্রিল টানা শুরু করি। টেনে টেনে হোস্টেলের ভিতরে এনে রাখি, যদি সকালে না পাই! কী হবে তখন! আমাদের তো হাত ঘড়ি নেই! মহালয়া শুনবো কী করে? মাধুরী‘দি বলেছিলেন পাখি ডাকবে যখন, সেই কাকভোরে আমাদের উনি তুলে দেবেন। আমরা তখন পঞ্চম শ্রেণী, মাধুরী‘দির কথায় আমাদের প্রত্যয় হবে কেন? আমরা কান পেতে সজাগ হয়ে থাকি। প্রহর বদল হলো, জানান দিতেই আমাদের জানলার পাশের বিলিতি আমড়ার ডালে কোনো পাখি ডেকেছিলো বোধহয়। আমরা ডাকাডাকি করে মাধুরীদির ঘুম ভাঙিয়ে দিলাম। আলো জ্বেলে মাধুরী‘দি বললেন – এখন তো সবে রাত দুটো ঘুমাও তোমরা। অগত্যা হতাশ চিত্তে শয্যা নিতে হলো। যথা সময়ে ঘুম ভাঙলো বটে কিন্তু শিরশিরে হাওয়ায় আলসেমি তখন শরীর ঘিরে ধরেছে। আধো ঘুমে আধো জাগরণে মহালয়া শোনা হলো। শেষ হতেই দৌড়। গন্তব্য, শান্তিনিকেতন বাড়ি। ওখানেই তো খুঁটির জন্য বাঁশ দেওয়া হবে! এক দল গেলো বাঁশ আনতে, অন্যদল গ্রিল টেনে নিয়ে চললো পুরনো ঘণ্টা তলায়। আরে, ওখানেই যে করবী’র দোকান হয়! বাঁশ আর গ্রিল পেতে জমি আগলে বসে থাকা ছাড়া উপায় কী! দোকান তো বানিয়ে দেবে দাদারা। সেই যখন ঢাকিরা আসবে, পার্থ‘দা, নিমাই‘দা ঢাক বাজাবেন ওঁদের সঙ্গে সঙ্গে – তখন একে একে সব দোকান তৈরি হবে। বিছানার চাদরের উপর পাতা দিয়ে, ফুল দিয়ে, কাগজের শিকল দিয়ে সাজানো হবে দোকান। আমাদের দোকানের নাম ‘করবী’। বাকিদেরও কত কত সব নাম!
ওদিকে হোস্টেলে তো যজ্ঞিবাড়ির আয়োজন! খাবার তৈরি করতে হবে না? করবী স্পেশাল, ঝালমুড়ি আর আলু কাবলি। মাধুরী‘দি দুই বালতি আলু সেদ্ধ করতে দিয়েছেন। কিচেন থেকে বয়ে বয়ে সেই আলু আনতে হবে, তেঁতুলের চাটনি বানাতে হবে, ছোলা সেদ্ধ হবে তবে না! আমাকে আর শিঞ্জিনীকে মাধুরী পাঠিয়েছেন তালপাতা জোগাড় করতে। আলু কাবলির চামচ চাই তো! দু’জনে দুটো ব্লেড হাতে চলেছি, আমাদের মতো দীর্ঘদেহী তালগাছের খোঁজে। পাই কোথা? অবশেষে দেখি, মালঞ্চে একখানি হ্রস্বদেহী তালগাছ। ব্লেড দিয়ে কি পাতা কাটা যায় সহজে? তবু, এ তো সেই, কিশোরের রক্তকরবী খুঁজে আনার মতো বিষয়। তাই , কষ্ট তখন আনন্দ হয়ে ঝরছে আমাদের চোখে মুখে। অবশেষে দুপুর পেরোয়, মেলা জমে ওঠে। আমরা পাকা ব্যবসায়ীর মতো দরদাম করি। কিছুতেই রাজি না হলে অনুনয় করি। বলি, ‘খুব কমে দিয়ে দেবো। কিনুন না, এই পুতুলটা।‘ …কেউ বা কেনেন, কেউ বা মুখ টিপে হাসেন। আমরা গর্বিত মুখে দোকান সামলাই। নিজের ডিউটি সেরে এক চক্কর মেলায় ঘুরেও নিই। কাদের দোকানে সস্তায় মালপোয়া পাওয়া যাচ্ছে, কাদের দোকানের ঘুগনিতে এবার বেশি তেঁতুলজল দিয়েছে সে’সব খবর চর মারফত শীঘ্রই ছড়িয়ে পড়ে। তবু, বিস্ময় যেন কাটেই না। এবার আশ্রম সম্মীলনীর কোন খাবারের ছদ্মনাম কী , সে নিয়ে জল্পনা চলতেই থাকে। যেবার পুলক‘দা ছাত্র সঞ্চালক ছিলেন, সেবার ‘নাড়ু’র নাম দেওয়া হয়েছিলো ‘ছাত্র সঞ্চালক’। মনে পড়ে, আবু সৈয়দ আয়ুবের জন্ম শতবর্ষে বাংলা বিভাগ চা’য়ের নাম দিয়েছিল – ‘পান্থ জনের সখা’। এমন কত কত ব্যক্তিগত ছোঁয়ায় মহালয়ার সন্ধ্যে জুড়ে আবেগের স্রোতে ভাসে গৌরপ্রাঙ্গন। মেলায় ভিড় বাড়ে, আলো বাড়ে। শমীন্দ্র শিশু পাঠাগারের সামনে সন্তোষালয়ের বোনেরা লোক দেখলেই ডাকাডাকি করে। অভিভাবকদের পেলে তো কথাই নেই! পাঁচ টাকার জিনিস দশ টাকায় কিনিয়ে তবে ছাড়ে। এমন বাজারে লাভ লোকসানের হিসেব মেলাতে কেইবা আসে! ধীরে ধীরে আলো নিভতে শুরু করলে সকলে বাড়ির পথ ধরে। আমরাও, হোস্টেলের। জনশূন্য গৌরপ্রাঙ্গন তখন অমাবস্যার আঁধার মাখে। লালনের গানের মতো তার ভিতরে ভিতরে তখন জন্ম নেয় একখানি ‘আনন্দবাজার’। সেখানে ক্রেতা নেই। বিক্রেতা নেই। সময়ের অখণ্ড প্রবাহ সেখানে আলো মেখে পড়ে আছে। পাঠাগারের সামনের পথখানি তখন বেতসিনী নদী হয়ে উঠতে চায়। সে যেন, আনন্দের ঋণশোধ করতে চায় সঙ্গোপনে। এমন রাতে শিউলি, শিশির মাখে। তাকে ঝরে যেতে হবে অচিরেই। তবু মাখে।সে যে কিসের আনন্দে, কে জানে!

ছবিঃ লেখক

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]