আমার শান্তিনিকেতন…

অমৃতা ভট্টাচার্য

মোরাম বিছানো পথ, বৃষ্টিভেজা ফুলের সৌরভ, হোস্টেলের টানা বারান্দা, বারান্দায় দাঁড়ালেই দেখা যায় শালবীথি, আম্রকুঞ্জ। আরো দূরে খোয়াই। সব মিলিয়ে শব্দে শব্দে ভেসে থাকা শান্তিনিকেতন। প্রাণের বাংলায় সেই শান্তিনিকেতনের জীবন নিয়েই লিখতে শুরু করলেন কলকাতা থেকে অমৃতা ভট্টাচার্য। একদা শান্তি নিকেতনের ছাত্রী, এখন চারুচন্দ্র কলেজে অধ্যাপনা করছেন।

দু’পাশে লম্বা করিডরের মাঝখানে,আমাদের একফালি স্টাডিরুম। দুপুর আর বিকেলের ঠিক মধ্যিখানে যখন একদল ছাতারে গলা ফাটিয়ে ঝগড়া করে,তখন আমাদের পড়তে বসতে হয়। আসন পেতে,স্যুটকেস পেতে আমরা বাড়ির কাজ করি, পেনসিল কাটতে কাটতে বারবার শিস ভেঙে ফেলি।আমরা পড়ি সহজ পাঠ,ছড়া সঞ্চয়ন।দিদিরা পড়ে ছেলেদের মহাভারত,বেটার ইংলিশ – আমরা বিষ্ময়ে দেখি! স্টাডি শেষ হতেই বিকেলের রোদ আমাদের হাতছানি দেয়।

এককালে সকলকে যেতে হতো সাঁতার পুকুরে। নন্দন হোস্টেলের গা ঘেঁষে ওই সাঁতার পুকুরে এখন সবুজ শৈবাল আর জল-ঝাঁজিদের ঘর বসতি। তাই আশ্রমমাঠ নীল আকাশ তলে আমাদের ডাক দেয়। বুড়ো বটের নীচ দিয়ে আমাদের লাইন চলে একেবেঁকে। নেপাল রোডের পেট চিরে মেয়ের দল কিচেনে পৌঁছোয়। কোনো মতে খাবার খেয়েই দৌড় দেয় খেলার মাঠে। কোনোদিন খো-খো, কোনোদিন কাবাডি খেলি আমরা। যারা খেলতে চায়না তারা গলা ফাটিয়ে উৎসাহ দেয়। তবে, এই খেলা শুরুর আগে গা-গরম করতে হয় নিয়মিত। সেইটিই নিয়িম। নমিতা’দি, সাগরিকা’দির চোখ এড়ানো মুশকিল।অগত্যা, হাত পা নেড়ে, ঘাড় ঘুরিয়ে আমরা নানাবিধ কসরৎ করি। ঘাড় ঘোরাতে ঘোরাতে দেখি শ্রীসদনের সামনে বাবলু’দার চপের গাড়ি এসে দাঁড়িয়েছে। নিষিদ্ধ বাসনা সব!

     চৈত্রের হাওয়ায় ওই দূরে মুচকুন্দ ফোটে তখন। তার পাপড়ি ঝরে,গন্ধ ঝরে। সবুজ ঘাসের গালচে জুড়ে ঝরা পাপড়ির মাঝে অবিন্যস্ত সূর্য-শিশির তার শরীরখানি মেলে ধরে। আমি আর শুক্লা উবু হয়ে বসে দেখি, কী চমৎকার মুন্সিয়ানায়  পোকা ধরে খায় এই আশ্চর্য উদ্ভিদ! কোনোদিন বা ভাগ্যক্রমে পেয়ে যাই দু’একটা ভেলভেট পোকা। নিজেকে তখন বিত্তবান বলে বোধহয়। করতল পেতে দিলে ভেলভেট পোকা গুটিগুটি পায়ে হাঁটে। সুড়সুড়ি লাগে। বিকেল পড়ে আসে ধীরে। পশ্চিমের আকাশ লাল হয় তার নিজস্ব নিয়মে, লালমেঘ হাতিপুকুরের জলে তার ছায়া ফেলে। মেঘের ছায়ায় ঘাড় নুইয়ে বাসন্তী পলাশ প্রতি,প্রতিদিন তার মুখ দেখে। এই অপরূপকথার সাক্ষি থাকে অরুণাচল পেরুমলের হাতি। সে অবিচল বলে, তার দেখাটও যেন স্থির হয়ে থাকে।

   খেলার মাঠের পশ্চিমপ্রান্তে এই যে আলোক বৃত্তখানি রচিত হয়, তার প্রতিবিম্বখানি পড়ে চা-চক্রে। কেউ বলে চা-চক্র, কেউ বা দিনান্তিকা। গোলাকৃতি দোতলা বাড়ি গুলঞ্চের ছায়া মাখে। সিড়ি জুড়ে পড়ে থাকা ফুল আলপনা হয়ে ফোটে। দীনেন্দ্রনাথ আর কমলাদেবীর স্মৃতি বিজড়িত বাড়িখানি দীর্ঘদিন বৈকালিক আসরে মেতে উঠতো। চায়ের কাপে তুফান তুলতেন শিক্ষক, কর্মী, আশ্রমিকেরা। চক্রটি ভেঙে গেছে বহুদিন। পড়ন্ত রোদ্দুর তবু তার শেষ পরশটুকু বুলিয়ে দেয় দীর্ঘ অভ্যাসে। আষাঢ়ের দু’একটা ভেজা সকালে আমাদের ক্লাস বসে এর একতলায়। সৌরেন’দা কবিতা পড়ান, গল্প শোনান। খাতা দেখেন নিবিষ্ট মনে। আমরা তখন গুঁড়ো গুঁড়ো পেনসিলের খোসা তাঁর নরম কোঁকড়ানো চুলের উপর ছড়িয়ে দিয়ে আমোদ পাই। আমরাও হাসি, উনিও। দোতলায় ক্লাস নেন লেবুদা – পূর্ণানন্দ চট্টোপাধ্যায়।ধুতিখানি গুছিয়ে পা তুলে বসেন। রবীন্দ্রচর্চার ক্লাস নেন। এইসব বিগত দিন বড় বেশি করে মনে পড়ে আজ। যাঁরা নেই, যাঁরা ছিলেন তাঁদের আজও দেখি দিনান্তের শেষ আলোটির মতো জীবনের প্রান্ত জুড়ে। সিলিঙ জুড়ে, ফ্রেস্কোগুলি বড় অপূর্ব, নিরাভরণ।

  প্রাচ্যের টি-মাস্টারদের সঙ্গে যাঁদের পরিচয় আছে, তারা রিকিউ আর জীয়াকে চেনেন। চা তো শুধু পাতা আর জল নয়! তার জন্যেও প্রয়োজন একটি বিশেষ ঘরের। সে ঘর নিরাভরণ, সে ঘরের সজ্জা বলতে নির্মেদ একেবানায়।ছবিগুলি দেখতে দেখতে আমার সেই একেবানয়ের কথা মনে পড়ে যায়।শেষ রোদ তখন আলতো হাতে তার স্পর্শখানি বুলিয়ে দেয় ছবিগুলির উপর। যে দিন গেছে, যে আর ফিরবে না কখনও সেই লেবু’দার কথা, সৌরেন’দার কথা আমি সযতনে ওই শেষ রোদ্দুরটির মতো তোরঙ্গে তুলে রাখি। দিনান্তিকা ধীরে ধীরে আঁধার মাখে। হাতিপুকুরের জলে নেমে আসে সন্ধ্যাতার। পাখিরা তো এমনই সন্ধ্যায় ঘরে ফেরে। তাই না?

ছবি:কনকলতা সাহা