আমার শান্তিনিকেতন

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

মোরাম বিছানো পথ, বৃষ্টিভেজা ফুলের সৌরভ, হোস্টেলের টানা বারান্দা, বারান্দায় দাঁড়ালেই দেখা যায় শালবীথি, আম্রকুঞ্জ। আরো দূরে খোয়াই। সব মিলিয়ে শব্দে শব্দে ভেসে থাকা শান্তিনিকেতন। প্রাণের বাংলায় সেই শান্তিনিকেতনের জীবন নিয়েই লিখতে শুরু করলেন কলকাতা থেকে অমৃতা ভট্টাচার্য। একদা শান্তি নিকেতনের ছাত্রী, এখন চারুচন্দ্র কলেজে অধ্যাপনা করছেন।

অমৃতা ভট্টাচার্য

মহালয়া, আনন্দবাজার ফুরোলেই বাড়ি ফেরার তাড়া। করবী, মাধবী, শ্রীসদনের সামনে তখন রিক্সাকাকুদের ভিড়। বাড়ি ফেরার আনন্দে উজ্জ্বল মুখগুলো চকচক করছে। কেউ বা কিছুটা ম্লান মুখে দেখে নিচ্ছে সাধের চালতাতলা। এক মাসের জন্য ফেলে যাওয়া হোস্টেল জীবন। সে কি কম কিছু? নিজের অজান্তেই প্রতি দিনের যাপনে কখন জানি এইসব গাছ, রাঙা ধুলো আর ছিট্ কোকিলের পালক নিজেদের সংসার গুছিয়ে বসেছে আমাদের দিনে রাতে। এই মায়াটুকু যে কী ভীষণ রকম সত্যি তার হিসেব মেলাতে বসলে আজ বিষন্ন হই। আর কোনোদিন সেখানে ফিরে যাওয়া হবে না ভেবেই এক গভীর অবসাদ কখনও কখনও আমায় গ্রাস করে।

কোনো এক বিশেষ সকালের কথা আমার বারবার মনে পড়ে তখন। সেটাও কোনো এক মহালয়ার পরের দিন। গৌরপ্রাঙ্গন আগের রাতের মুখরতা মেখে পড়ে আছে। উৎসব ক্লান্ত আম্রকুঞ্জ, বকুলবীথি। সেবার আমরা দশম শ্রেনি। কোনো বিশেষ কাজে কেন যে থেকে গিয়েছিলাম আর মনে নেই। মাধবী হোস্টেলের শূন্যতা পেরিয়ে, সবুজ গেট পেরিয়ে চলেছি পাঠ ভবন অফিসের দিকে। কোলাহল নেই, শান্ত চারিপাশ। ইতিহাস ঘরের উপরে,পিচচট মোড়া ঝুলবারান্দাখানি আশ্বিনের রোদ্দুর মেখে বসে আছে। ক্লাসের দিনে এই বারান্দায় বসে আমরা গল্প করি, উপর থেকে গৌর প্রাঙ্গনের দিন যাপন দেখি। আজ সে সব নেই। পুঁথি ঘরের সেই আবাল্যের চেনা গন্ধটি পেরিয়ে, পায়রাদের কলরব পেরিয়ে আজ শূন্য বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছি। এক ফালি রোদ্দুর গিয়ে পড়েছে ঊর্মিলাদির ঘরে। উনি বসে বসে খাতা দেখছেন এক মনে। পায়ের শব্দে চমকে তাকালেন। অনেক সময় ধরে আমার লেখাগুলি পড়লেন। যতক্ষণ উনি পড়ছিলেন ততক্ষণ আমি দেখছিলাম উত্তরের জানলা কেমন কাগজফুলে ঢেকে গেছে। আমি দেখছিলাম সাদা ঘের দেওয়া শাড়ি পরা ঊর্মিলাদি কেমন কঠিনের আবরণে নিজেকে মুড়ে ফেলেন। অথচ, গতকালই আশ্রম সম্মিলনীর কাজে উনার বাড়ি গিয়েছিলাম। আমাদের উপর ভার পড়েছিল নাড়ু বানানোর। বানাবেন ঊর্মিলাদিই, আমরা সাহায্যকারী। ওনার বাড়ি পৌঁছতেই দেখি আমাদের জন্য জলখাবার সাজিয়ে বসে আছেন। খাওয়া শেষ হলে দেখি নারকেল আর কুড়ানি প্রস্তুত। কাজে হাত লাগিয়েছি, অনভ্যস্ত অপটু হাত। হয়তো একটা নারকেল কোরাতেই অনেক সময় নিচ্ছি, উনি কিন্তু বিরক্ত হচ্ছেন না! একরাশ ব্যস্ততার মধ্যেও রান্না করছেন অক্লান্ত হাতে। রান্না শেষ হলে আমাদের প্রায় হাতে ধরে শেখালেন নাড়ুর পাক কী ভাবে ঠিক করে করতে হয়। শেখা হলো, হাতে কলমে তো বটেই, কিছুটা খেয়েও। তারপর আমাদের জন্য দেখি এলাহি আয়োজন। আমরা হোস্টেলে থাকি, সারা বছর ভালোমন্দ খাবার তাও জোটে না! তাই, কত যত্ন করে কত কী যে রান্না করেছেন! নিজে বেড়ে খাওয়ালেন।

আমাদের সেই রাগী ঊর্মিলাদিকে আমরা কেমন ভুলেই যাচ্ছিলাম ক্রমশ। ইতিহাস ঘরের চারিদিকের দেওয়ালে কত সব প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান। আশ্বিনের আলোয় সেই অতীতের না জানা কত গল্প যেন সত্যি হয়ে উঠতে চাইছিল ক্রমে। ঠিক যেমন ঊর্মিলাদির মধ্যে এক স্নেহশীলা মা’কে দেখছিলাম ! ইতিহাস ঘরের সেই গন্ধটা এখনও আছে কী না কে জানে! ঊর্মিলাদির চেয়ারেই বা এখন কে বসেন, আর জানি না! পূর্বপল্লীর রাস্তায় যেতে যেতে উনার বাড়িখানি চোখে পড়ে যায় কদাচিৎ। বাড়ির নাম জীবন স্মৃতি। শান্ত, বন্ধ গেট। আমি ঠিক জানি এই গেটখানি পেরোলেই ঊর্মিলাদির হাস্যোজ্জ্বল মুখখানি আশ্বিনের রোদ্দুর হয়ে ধরা দেবে। উৎসব ক্লান্ত গৌরপ্রাঙ্গনখানি দেখলে, তার উচ্ছ্বসিত মেজাজখানি টের পাওয়া যায় কি? ঊর্মিলাদির মতোই সেও যেন চশমার আড়ালে তার স্নেহ, তার আবেগকে সংযত করে রাখে। খাতা দেখা শেষ হলে একা একা হোস্টেলে ফিরি। বাড়ি যাব, যেতেই হবে। তবু, এই শালবীথি, এই আশ্রম মাঠ আর আশ্বিনের রোদ্দুর আমার আঁচলখানি টেনে ধরে। দু’দণ্ড বসতে বলে। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি ইতিহাস ঘরের বারান্দাখানি রোদ্দুরে ভাসছে।

ছবি: লেখক

 

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]