আমার শান্তিনিকেতন

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

অমৃতা ভট্টাচার্য

আশ্বিন ফুরোতেই রোদ্দুরে কেমন শীতের রঙ লাগে। নরম রোদে গা এলিয়ে পুজোর ছুটির দুপুরে বই পড়ি, ছবি আঁকি, কখনও বা চিঠি লিখি বন্ধুদের। দু’একদিন দুপুরে সাইকেলের ঘণ্টি বাজিয়ে গৌরাঙ্গকাকু চিঠি বিলি করে যায়। বন্ধুদের চিঠি এসে পৌঁছোয়, শান্তিনিকেতনের গন্ধও আসে এক পশলা বৃষ্টির মতো। হেমন্তের রোদ্দুর তখন মেদুর হয়ে আসে আরও। এবার হোস্টেলে ফেরার পালা। আবার বাক্স গুছিয়ে, নিরালা গৃহকোণটি ছেড়ে বেরিয়ে পড়তে হবে। এক মাসের ছুটি শেষে হোস্টেলে ফিরলে চারিদিক কেমন জানি নতুন নতুন মনে হয়। এই শালবীথি, এই আম্রকুঞ্জ সব যেন নিপাট সজ্জায় দাঁড়িয়ে আছে আমারই অপেক্ষায়, এমনটাই মনে হয়।
বেলা পড়ে আসে, শিরশিরে হাওয়া দেয়। ঠিক তখনই ভারী হয়ে আসে ছাতিমের গন্ধ। আমাদের হোস্টেলের আশেপাশে কত কত ছাতিম গাছের ডাল ফুলের ভারে নুয়ে আসে। এতদিনের বন্ধ ঘরের গন্ধ আর ছাতিমের গাঢ় গন্ধে আমাদের ঘোর লাগে। রাতে, খাবারের লাইনে তখন হাফ সোয়েটার পরে যেতে হয়। গাছেদের গায়ে হিম পড়ে তখন সারারাত।একেকটা ঋতুর গন্ধের সঙ্গে এইভাবে আমরা জড়িয়ে যেতে থাকি। আশ্রম মাঠে চাঁদের আলো পড়ে। হেমন্তের রাতে জ্যোৎস্না আর কুয়াশা মিশে চরাচর তখন জীবনানন্দের কবিতা হয়ে উঠতে চায়। লাবু’দি, চিত্রা’দি তখন গানের ক্লাসে গান শেখান –‘ হিমের রাতের ওই গগনের দীপ গুলিরে’… আমরা গাইতে গাইতে তন্ময় হয়ে ভাবি, আমাদের দীপাবলির প্রদীপ কেমন করে আকাশের তারা হয়ে ওঠে হেমন্তের আশ্চর্য সন্ধ্যায়। এইসব ভাবতে ভাবতে উত্তুরে হাওয়া ক্রমে বাড়ে।

আমাদের হোস্টেলের ব্যালকনিতে রোদ্দুর এসে এলিয়ে পড়ে। আমরা সেই নরম রোদে বসে আমলকি খাই। গৌরী’দি কোনো কোনো দিন ওনার গাছের একঝুড়ি আমলকি পাঠিয়ে দেন আমাদের জন্য। আমলকী খেতে আমরা বড় ভালোবাসি। তিরতিরে হাওয়ায় যখন আমলকী গাছের পাতারা কাঁপে তখন যেন কৈশোরের গোপন সুখের মতো হেমন্ত লক্ষ্মীর চেহারাখানি আমরা প্রত্যক্ষ করি।
বুধবারের উপাসনায় যখন যাই, তখন দেখি মন্দিরের দু’পাশে আনত ন্যাস্টাসিয়ামের ফুল হেমন্তের হাওয়ায় কাঁপছে। সেই কাঁপন আমাদের অন্তরে এসেও লাগে! তখন টের পাই কার্তিকের নবান্নের দেশের ভিতর আরও একটা দেশ আছে যেখানে হেমন্তের আসন পাতা আছে সঙ্গোপনে। সেখানে শীতের আরম্ভ বলে নয়, হেমন্তের আন্তরিক মহিমাটি প্রতিষ্ঠিত সযত্নে। কিশোর-কিশোরীরা সেখানে মঙ্গলবারের সাহিত্যসভায় হেমন্তের গান গায়। সাদা শাড়ি পরে, আকাশি নীল উত্তরীয় উড়িয়ে নাচে। সেই নাচের তাল ঢিমে লয়ের। হেমন্তের নিজের ছন্দটির মতো। যে বালিকা কবিতা পড়ে, প্রবন্ধ পড়ে সে যেন নিজের মতো করেই হেমন্তকে আবাহন করে।

ঋতুগুলিকে এমন করে চিনিয়ে দিয়েছিলো আমাদের কৈশোরের দিনগুলি। আজও তাই কার্তিকের রোদে আমি একটা বিশেষ গন্ধ পাই। সেই গন্ধ কুয়াশার, ছাতিম ফুলের আর সাদা শাড়ি পরা কিশোরীবেলার সাহিত্য সভার। পরে, বেশ কিছুটা বড় হয়েছি যখন তখন জীবনানন্দ আর মণীন্দ্র গুপ্ত বড় যত্ন করে হেমন্তকে চিনিয়েছেন। আমাদের ছেলেবেলায় সেই ভার নিয়েছিলো প্রকৃতি নিজেই। ঝরে পড়া ছাতিম আর হিমঝুরির গন্ধে আমি টের পাই কেমন নিঃসাড়ে হেমন্তের সন্ধ্যা নামে ছাতিমতলায়। ওই উঁচু শালগাছের মাথায় তখন কুয়াশার চাদর মেখে তারা জাগে। তারা সারারাত জাগবে, আলো জ্বালবে। আমাদের কাছে সেই ছিলো দীপাবলি। যার মধ্যে উন্মাদনা নেই, উত্তেজনা নেই। এখনও চোখ বুজলে আমি কুয়াশার গন্ধ পাই, হিমঝুরির গন্ধ পাই, হেমন্তের গন্ধ পাই।

ছবি: কনকলতা সাহা

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]